মিখাইল গ্রোমভ কি ধরনের মানুষ ছিলেন?

মিখাইল গ্রোমভের জীবনের মন্ত্র ছিল শুধু সোজা পথে সামনের দিকে এগিয়ে যাও! কিন্তু তাঁর বিমান বাহিনীর জীবনের রাস্তাকে কখনই সোজা বলা যেতে পারে না.

তিনি জন্মেছিলেন উনবিংশ শতকের শেষে – ১৮৯৯ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে – মস্কোর থেকে ১৭০ কিলোমিটার দূরের প্রাদেশিক তভের শহরে, এক সামরিক বাহিনীর চিকিত্সকের পরিবারে. তাঁর হবি ছিল বিমানের মডেল তৈরী করা আর তারই সঙ্গে – ভারোত্তলন নিয়ে: ১৭ বছর বয়সে হাল্কা হেভিওয়েট গ্রুপে ৯০ কিলোর বেশী বেঞ্চ প্রেসে তুলে মস্কো শহরের রেকর্ড করেছিলেন.

মিখাইল গ্রোমভের মধ্যে নবীন সোভিয়েত বিমান শিল্প এক বিখ্যাত টেস্ট পাইলটকে দেখেছিল. তিরিশ বছর ধরে তাঁর নাম সারা দেশের মতো বিদেশেও প্রতিধ্বনি তুলেছিল, গেন্নাদি আমেরিয়ানত্স এই প্রসঙ্গে বলেছেন:

“তিনিই প্রথম আকাশে তুলেছিলেন ২০টি পরীক্ষামূলক বিমান. এই রকমের ফল দ্বিতীয়বার করতে পারা সম্ভব নয়: এই রকমের কাজ আগেও করা হয় নি আর পরেও মনে হয়না যে করা সম্ভব হবে. প্রথম বিমান, যেটাকে তিনি আকাশে তুলেছিলেন, ছিল একটা ছোট্ট ইউ-২, আর শেষেরটি ছিল - এক দৈত্যাকার বিমান, একটা উড়ন্ত দুর্গ. ইনিই প্রথম মানুষ, যিনি বিংশ শতকের কুড়ির দশকে চিনে, জাপানে ও ইউরোপের সমস্ত শহরগুলিতে দূর পাল্লায় বিমান ভ্রমণের পরীক্ষা করেছিলেন. এরপরে ইউরোপের লোকরা তাঁর নাম দিয়েছিল বিশ্বের পাইলট নাম্বার ওয়ান বলে. ১৯৩৪ সালে গ্রোমভ প্রথম আএনতে – ২৫ বিমান পরীক্ষা করে বিশ্বে দূর পাল্লার বিমান উড়ানের একটা বেসরকারি রেকর্ড করেছিলেন – তিনি উড়ে গিয়েছিলেন ৭৫ ঘন্টা সময়ে ১২ হাজার ৪১১ কিলোমিটার দূরত্ব. একেবারেই বিরল ফলাফল!”

১৯৩৭ সালে বিশ্ব সোভিয়েত পাইলটের নাম জানতে পেরেছিল: ১২ থেকে ১৪ই জুলাই তিনি দুজন সঙ্গী পাইলটকে নিয়ে মস্কো থেকে উত্তর মেরু হয়ে সান জ্যাসিন্টো (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র) পর্যন্ত উড়ে গিয়েছিলেন একটানা, সোজা রাস্তায় ১০ হাজার কিলোমিটারের বেশী পথ অতিক্রম করা হয়েছিল ৬২ ঘন্টা ১৭ মিনিট সময়ে.

উড়ানের সময়ে বিপদ না হয়ে যায় নি, নোভায়া জেমলিয়া নামের জায়গার উপরে ইঞ্জিনের ভিতরে জলের উষ্ণতা দেখানোর থার্মোমিটার বিকল হয়ে গিয়েছিল. তারপরে বিমান ঘন মেঘের মধ্যে ঢুকে গিয়েছিল, আর তাতে বরফ জমে যাওয়া শুরু হয়েছিল. উঁচুতে ওঠা যাচ্ছিল না, কারণ তাহলে এই যন্ত্রের ক্ষমতার চেয়ে বেশী ভারী কাজ করা হয়ে যেত. গ্রোমভ এই বিমানকে তখন শুধু যন্ত্রপাতির দিকে চোখ রেখে চালিয়েছিলেন, আর ডানার কোনার অবস্থা বরফে ঢেকে যাওয়া কেবিনের কাঁচের ছোট জানলা খুলে নজর রেখেছিলেন, রাশিয়ার সম্মানিত টেস্ট-পাইলট ও রাশিয়ার বীর পাভেল ভ্লাসভ বলেছেন:

“৬২ ঘন্টা, তিনজন মানুষ একটা এয়ার টাইট নয় এমন কেবিনে বসে থাকা. এখন এমনকি ধারণা করাও কঠিন, কি করে তাঁরা এই পরিস্থিতিতে কাজ করেছিলেন: সেই বিমানের সীট এমনকি বর্তমানের গাড়ীর সঙ্গেও তুলনা করার মতো নয়, আর উত্তর মেরু হয়ে ৬২ ঘন্টা ধরে সেই ভাবে ওড়া! উত্তর মেরু- এটা একটা বিরল জায়গা, যেখানে থেকে যে কোন জায়গারই একটাই যাওয়ার পথ – ১৮০ ডিগ্রী, তা সে লন্ডনই হোক আর নিউইয়র্ক বা আলাস্কাই হোক. আজ রয়েছে উপগ্রহ মারফত দিক নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা, আর ৩৭ সালে তার বদলে ছিল মানুষের বুদ্ধি, পুরুষকার আর নিজের কাজ নিয়ে খুবই খুঁটিয়ে প্রস্তুতি. আমি এই উড়ানের দলিল পড়েছি. যাতে বিমানে বাড়তি ৫০০ লিটার জ্বালানী নেওয়া যেতে পারে, তাই এই পাইলটরা জলে ফুলিয়ে ভেসে থাকার মতো নৌকাও নিতে চান নি (এটা মহাসমুদ্রে বিমান পড়ে গেলে আত্মরক্ষার উপায়) অস্ত্র নেন নি, গরম জামাকাপড় না এমনকি খাবার ও অন্যান্য জিনিষও না. বলা যেতে পারে হঠকারিতা. কিন্তু তা নয়, বরং উল্টো – সমস্ত খুঁটিনাটি নিয়েই গভীর ভাবে ভেবে রাখার ক্ষমতা. পাইলটরা তাঁদের যন্ত্র নিয়ে ছিলেন একেবারেই গভীর ভাবে বিশ্বাসী, আর তাই তাঁরা গিয়েছিলেন একেবারেই হিসাবের মধ্যে রাখা ঝুঁকি নিতে. শুধু সেই কারণেই এই ঝুঁকি, যাতে আমাদের দেশের নামে লোকে বলে বিশ্বের বিমান নির্মাণের বিষয়ে প্রথম দেশ!”

জ্বালানী গ্রোমভের যথেষ্ট হত, এমনকি পানামা অবধি উড়ে গেলেও, কিন্তু মেক্সিকোর সীমান্ত পার হতে তাঁকে অনুমতি দেওয়া হয় নি. তাই নেমে পড়তে হয়েছিল, সমস্ত জ্বালানীকে খরচ করেই. তারপরে সেই চারণভূমি, যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গ্রোমভ তাঁর বিমান নামিয়েছিলেন, তার ব্যবসা বুদ্ধি সম্পন্ন মালিক গ্রোমভের বিমানের বাকী জ্বালানী টেস্ট টিউবে ঢেলে উপস্থিত লোকদের মধ্যে স্যুভেনির হিসাবে বিক্রী করেছিল. মিখাইল গ্রোমভের বিধবা স্ত্রী নিনা গল্প করে বলেছেন:

“ওরা মেক্সিকোর সীমান্ত অবধি উড়ে গিয়েছিল. কিন্তু সেখানে কুয়াশা ছিল, আর তাই তাদের একটা চারণভূমি দেখে নামতে হয়েছিল, আর তা মাঠে কেন, কারণ তাদের দরকার ছিল নরম জমিতে নামার, যাতে বিমান আলতো করেই থামানো যায়, কারণ তাদের বিমানের চাকায় কোন ব্রেক ছিল না. আর এই উড়ানের অর্থ তখন খুব ভাল করেই বলেছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্র সচিব. যখন সোভিয়েত পাইলটদের হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ করা হয়েছিল, তখন তিনি বলেছিলেন: কূটনীতিবিদদের কোন কাজই রাশিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্কের উন্নতি করার জন্য এত উন্নতি করতে পারত না, যা এই পাইলটরা নিজেদের উড়ান দিয়ে করেছেন”.

১৯৪১ সালে যখন সোভিয়েত সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিমান – পরীক্ষার জন্য ইনস্টিটিউট তৈরী করা হয়েছিল, তখন তার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বিখ্যাত পাইলট মিখাইল গ্রোমভ, তাই পাভেল ভ্লাসভ বলেছেন:

“বহু দিন ধরেই তিনি দেশের সমস্ত টেস্ট- পাইলটদের নেতৃত্ব দিয়েছেন. খুবই উচ্চ স্তরের ইঞ্জিনিয়ারিং বুদ্ধি, যে কোন কাজের জন্যই গভীর প্রস্তুতি আর দারুণ উড়ান করার ক্ষমতা – এই সব নিয়েই মিখাইল গ্রোমভ ছিলেন বিরল মানুষ”.

আজ ভ্লাসভ এই ইনস্টিটিউটের প্রধান, এখানে রয়েছে এক বিরল বৈজ্ঞানিক কেন্দ্র, যার কোন তুলনার মতো জায়গা বিশ্বে নেই. এখানে বিমান ও মহাকাশ বিজ্ঞানের বাস্তব সমস্যাগুলোকে সমাধান করা হয়ে থাকে, আর এখানে তারাই কাজ করেন, যারা আজ মিখাইল গ্রোমভের ঐতিহ্যকেই বজায় রেখে চলেছেন.