পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী ঐতিহ্য অনুযায়ী ছিল শুধু স্থিতিশীলতার গ্যারান্টিই নয়, যারা ঐতিহাসিক ভাবে সঙ্কট মুহূর্তে আড়াল ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিল, বরং একটা বনেদী সংগঠন, যার উপরে দেশের সংবিধান ও আইন কানুনের নিয়মাবলী কখনও প্রসারিত হয় নি.

আর আজ পাকিস্তানে এক সাহসী ও ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে একটা উদাহরণ সৃষ্টির জন্যই. একেবারে সংজ্ঞাতেই পাকিস্তানের এই স্বৈরাচারীর উপরে বিচারের পরীক্ষা, যা অভিযোগকারীদের ধারণা অনুযায়ী বেনজির ভুট্টোর হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে পিছনে থাকা অপরাধীর বিচারের জন্য করা হয়েছে, এই ৭০ বছরের অবসরপ্রাপ্ত জেনারেলকে নিয়ে, যিনি নিজে থেকেই এই বছরের বসন্তকালে বেশ কয়েক বছর লন্ডনে অভিবাসিত ব্যক্তির জীবন কাটিয়ে দেশে ফিরেছেন, তা নিয়ে আমাদের সমীক্ষক সের্গেই তোমিন বলেছেন:

“লন্ডনের শান্ত বন্দর ছেড়ে পাকিস্তানের রাজনীতির ঘূর্ণিতে ডোবার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়ে, যাতে এই বছরে পাকিস্তানের লোকসভা নির্বাচনে অংশ নেওয়া যেতে পারে, পারভেজ মুশারফ না জেনে পারেন নি যে, তাঁর জন্য সমস্ত অর্থেই এই পদক্ষেপ কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে চলেছে. কারণ বহু বছর ধরেই প্রাক্তন রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে হিসাব মেটাতে শুধু ঐস্লামিকরাই চায় নি, বরং পাকিস্তানের অসামরিক প্রশাসনও চেয়েছে, যারা ২০০৮ সালে তার বদলে এসে জায়গা নিয়েছিল. কিন্তু, সেই ২০১১ সালে তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারী পরোয়ানার তোয়াক্কা না করেই তিনি এসেছেন, আর পাকিস্তানের প্রশাসনও সঙ্গে সঙ্গেই ঝুঁকি নেয় নি তাঁকে দেশে ফেরার পর মুহূর্তেই গ্রেপ্তারের জন্য. শুধু মে মাসের নির্বাচনে জেনারেল পারভেজ মুশারফের বহুদিনের বিরোধী নওয়াজ শরীফের মুসলিম লীগ (ন) দল জয় লাভের পরেই পাকিস্তানের ন্যায় বিচারের যন্ত্রের চাকা সম্পূর্ণ ভাবে আবর্তিত হতে শুরু করেছে”.

জেনারেল মুশারফের দেশে ফিরে আসা, যা এই বছরের বসন্তে হয়েছে, তা লক্ষ্যণীয় ভাবেই পাকিস্তানের রাজনীতিতে উত্তেজনা বৃদ্ধি করেছে. কারণ তাঁর নেতৃত্বে সারা পাকিস্তান মুসলিম লীগ দল আশা করেছিল পার্লামেন্টে নিজেদের একটা ভাগ তৈরী করতে পারবে আর তা দিয়েই পারভেজ মুশারফকে লন্ডনে নির্বাসিত ব্যক্তি থেকে পাকিস্তানের রাজনীতিতে এক মূল ক্রীড়নকে পরিণত করতে পারবে. কিন্তু যখন পারভেজ মুশারফকে পার্লামেন্টের চেয়ারের জায়গায় আসামীর কাঠগড়া দেওয়া হয়েছে, তখনই ঠিক সময় এসেছে এই প্রশ্নের – এই মামলা, দেশের সামরিক বাহিনী ও অসামরিক প্রশাসনের মধ্যে সম্পর্ক এবারে দেশের জন্যেই কিভাবে ঠিক করে দেবে? এই বিষয়েই সের্গেই তোমিন বলেছেন:

“স্বাধীন পাকিস্তানের এই নাতিদীর্ঘ ইতিহাসে বাস্তবে, সেই বিতর্কই হয়েছে যে, দেশের জন্য গণতন্ত্র খারাপ কি না, আর তার রাজনীতিতে শক্তিধর বাহিনী কি ভূমিকা পালন করবে – সামরিক বাহিনীর উচ্চ কোটির লোকরা আর গুপ্তচর বাহিনীর মাথারা. আবারও একটি অসফল অসামরিক প্রশাসনের দেশ চালানোর চেষ্টার পরে প্রশাসনে বারে বারেই এসেছে উর্দি পরিহিত লোকরা – যাতে জাতীয় স্বার্থের বিশ্বাসঘাতক তথাকথিত “গণতান্ত্রিক” লোকদের, দুর্নীতিপরায়ণদের, বাজেটের অর্থ বরাদ্দ যারা লুঠ করেছে তাদের, হয় ধ্বংস অথবা জেলে ভরা যায়. কিন্তু এই টাইট দেওয়াও তার অসঙ্গতি দেখিয়ে দিয়েছে – গণতান্ত্রিক দুর্নীতিপরায়ণদের জায়গা নিয়েছে সামরিক বাহিনীর থেকে বাজেট লুঠেরারা, যারা খালি তাদের পরম শক্তিমান প্রথম ব্যক্তির প্রতিই অনুগত”.

মুশারফ চেষ্টা করেছিলেন এই দুষ্চক্র ধ্বংস করতে আর নিজের তৈরী বিকাশের মডেল ব্যবহার করতে, যাকে বলা যেতে পারে এক “মখমল নরম স্বৈরাচার” বলেই. ১৯৯৯ সালে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে, তিনি রক্তক্ষয় করেন নি, বিরোধীদের উপরে দমনের নীতি ছাড়াই কাজ করেছেন আর চেষ্টা করেছেন সেটাই করার, যা তাঁর আগে তুরস্কে করেছেন কামাল আতাতুর্ক - দ্রুত আধুনিকীকরণ. কিন্তু তাঁর ভাবা অনেক কাজই বাস্তবায়ন করা যায় নি. ফলে প্রশাসন বিরোধী ঢেউয়ে তিনি যে কোন মূল্যে নিজের হাতে ক্ষমতাকে ধরে রাখতে চান নি ও স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছিলেন.

এই ভাবেই, তার প্রতি যে রকমই মনোভাব রাখা হোক না কেন, পারভেজ মুশারফ সাধারণ কোন স্বৈরাচারীর সঙ্গে মোটেও একই রকমের নন. তিনি এক জটিল ঐস্লামিক দেশে সাহসী ভাবে শাসনের একটা চেষ্টা করেছিলেন. এই চেষ্টার ভিত্তিতে ছিল প্রায় সম্ভব নয় এমন সব জিনিষকে একসাথে করার চেষ্টা – স্বৈরাচার ও গণতন্ত্র, ঐতিহ্য ও আধুনিকীকরণ. আর এখন জেনারেল মুশারফ আবার নতুন এক পরীক্ষার অংশীদার হয়েছেন – পাকিস্তানের প্রাক্তন “শক্ত হস্তের” উপরে মামলা. তার ফলাফল থেকেই দেশে ভবিষ্যতে অসামরিক প্রশাসন ও সামরিক বাহিনীর সম্পর্ক সম্বন্ধে বুঝতে পারা যাবে, যে দেশে চেষ্টা করা হচ্ছে সামরিক প্রশাসনের কূপরিণতিকে দূর করার.