ইরানের শাহ বিরোধী বিপ্লবে বিজয়ের পরে নাজাফের এক অত্যন্ত বিখ্যাত শিয়া মুসলিম ধর্মীয় নেতা মোহাম্মেদ বাগির সাদর, আয়াতোল্লা খোমেইনিকে এক সম্বর্ধনা পত্র পাঠিয়েছিলেন. তিনি শাহের প্রতি নির্দেশ করে উল্লেখ করেছিলেন যে, তার উদাহরণে “অন্যান্য স্বৈরতান্ত্রিক লোকরাও নিজেদের মূল্য চুকানোর দিনকে দেখতে পারবে”. এই ক্ষেত্রে লেখক বাগদাদের নেতাদেরই মনে করেছিলেন. এই বিষয়ে কোন সন্দেহই নেই. তার পরে এক বছরও কাটে নি, আর ইরানের রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন সাদ্দাম হুসেইন, যিনি তার অব্যবহিত পরেই শিয়া মুসলিম গোষ্ঠীর নেতা ও সক্রিয় কর্মীদের সঙ্গে পরিকল্পিত ভাবেই দমনের নীতি নিয়েছিলেন. ইরান এই বিষয়ে আলাদা হয়ে দেখতে পারে নি, দুই দেশের সম্পর্কের মধ্যে মনে হওয়া উষ্ণতা পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছিল খোলাখুলি শত্রুতায়.

যুদ্ধে নামার আগে ইরান ও ইরাকের নেতারা কি লক্ষ্য সামনে রেখেছিলেন? স্বাভাবিক ভাবেই প্রত্যেক রাষ্ট্রই অন্যকে ধ্বংস করে দিতে চেয়েছিল. নিজেদের কাজ ও তা করার সম্ভাবনা নিয়ে তারা খোলাখুলি ভাবেই ঘোষণা করেছিলেন. কিন্তু গভীর ভাবে চিন্তা করলে দুই দেশের নেতারাই সেই সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারতেন যে, বিশ্ব সমাজ বৃহত্ রাষ্ট্রগুলোর পক্ষ থেকে কোন ভাবেই একটি রাষ্ট্রকে অন্যকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিতে দেবে না, সামরিক বিজয় এই বাক্যের আক্ষরিক অর্থে বিচার করা হলে. কোন বৃহত্ রাষ্ট্র, কোনও সামরিক জোটই এটা হতে দিত না. কোন একটি অথবা অন্য দেশের বিজয়ের অর্থ হতে পারত এই দুই দেশের যে কোন একটির পারস্য উপসাগরীয় এলাকার বিপুল পরিমান খনিজ তেল ও গ্যাসের উপরে নিয়ন্ত্রণ. শুধু এই বাস্তবের অর্থই হতে পারত পশ্চিমের বৃহত্ রাষ্ট্রগুলোর তরফ থেকে বিশ্বের জ্বালানী বাজারের উপরে প্রভাব ও অবস্থান হারানো. তার ওপরে আবার ঐস্লামিক রাষ্ট্র ইরান ঘোষণা করেছিল যেমন নিজেদের পশ্চিমের প্রতি নেতিবাচক সম্পর্ক নিয়ে, তেমনই পূর্বের সমাজতান্ত্রিক জোটের প্রতিও, আর এটা করেই তারা বৃহত্ রাষ্ট্রের ভূমিকা নিতে চেয়েছিল ও ঐস্লামিক বিশ্বে নেতার জায়গা দখল করতে চেয়েছিল. এই বিশ্লেষণের উপরে নির্ভর করে পরবর্তী সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায়: বৃহত্ রাষ্ট্রগুলো ইরাক ও ইরানকে নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ করতে দিয়েছিল, কিন্তু কোন এক পক্ষও নিজেদের প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করতে যাতে না পারে তার ব্যবস্থাও করেছিল. এই ধরনের ধারণা নিয়ে মস্কোর রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর আলেকজান্ডার ভাভিলভ বলেছেন:

“এই যুদ্ধে খুবই স্পষ্ট করে ওয়াশিংটনের ও তাদের জোটের পক্ষ থেকে নিকট ও মধ্য প্রাচ্যের অঞ্চলে ভূ-রাজনৈতিক স্ট্র্যাটেজি দেখতে পাওয়া গিয়েছিল. আমেরিকার লোকরা মনে করেছিল যে, এই যুদ্ধের যে কোন রকমের পরিণামই তাদের জন্য উপযুক্ত আর নিজেদের মূল লক্ষ্য হিসাবে রেখেছিল এই দুই পক্ষের দুর্বল হয়ে যাওয়া. প্রথমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরাককে সমর্থন করেছিল, তাদের যুদ্ধ ক্ষেত্রের উপগ্রহ মারফত তোলা ছবি দিয়েছিল, রাসায়নিক অস্ত্র তৈরীর উপযুক্ত পদার্থ ও প্রযুক্তি দিয়েছিল. কিন্তু যেই বাগদাদ যুদ্ধে একটা নিজেদের পক্ষে ওজন বেশী বুঝতে পেরেছিল, তখনই জানা গিয়েছিল “ইরানগেট” কারবার সম্বন্ধে – মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের আলাদা ব্যক্তিদের তরফ থেকে ইরানে সমরাস্ত্র পাঠানোর কেলেঙ্কারির কথা”.

এই রকমই ছিল বিশ্বজোড়া ক্ষমতাধর ভূ-রাজনৈতিক ক্রীড়নকদের রায়. প্রসঙ্গতঃ, তথাকথিত “কার্টারের ডকট্রিনে” পারস্য উপসাগর এলাকাকে দেখা হয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমের তরফ থেকে জীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ সংশ্লিষ্ট এলাকা বলেই. এর স্পষ্ট অর্থ হয়েছিল যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই এলাকায় শক্তির ভারসাম্যে কোন রকমের দ্রুত পরিবর্তনকে হতে দেবে না. কিন্তু দুই রাষ্ট্রের নেতারাই বিশ্ব রাজনীতির এই ঘুঁটি সাজানোকে হিসাবের মধ্যে আনেন নি.

ইরান ও ইরাকের মধ্যে যুদ্ধ হওয়ার ক্ষেত্রে খুবই গুরুতর ভূমিকা নিয়েছিল খনিজ তেলের বিষয়টি. নিকটপ্রাচ্যের খনিজ তেল নিয়ে রাজনৈতিক সমস্যা সম্পর্কে বিখ্যাত গবেষক ফুয়াদ মুর্সি মনে করেন যে, এই যুদ্ধ অনেকটাই বৃহত্ রাষ্ট্রগুলোর উস্কানি দেওয়া রাজনীতির কারণে ও এই খনিজ তেলের বিষয়ে পশ্চিমের একচেটিয়া অধিকারের জন্যই. যদি ১৯৭৩ সালের ইজরায়েল- আরব যুদ্ধের পরে খনিজ তেল উত্পাদক দেশগুলোর নিজেদের সম্পদের উপরে নিয়ন্ত্রণ বেড়ে থাকে, তবে, মুর্সির কথামতো, ইরান- ইরাকের সংঘর্ষের ফলে ওপেক দেশ গুলোর প্রভাব খুবই দ্রুত কমে গিয়েছিল. অনেকটাই কমে গিয়েছিল দুই দেশ থেকে খনিজ তেলের উত্পাদন ও রপ্তানী. এর অর্থ হয়েছিল যে, বাস্তবে পশ্চিমের পক্ষে সম্ভব হয়েছিল বিশ্বের খনিজ তেলের বাজারে নিজেদের প্রভাব বৃদ্ধি করার.

অর্থনৈতিক ক্ষতির চেয়ে অনেকটাই বেশী হয়েছিল মানুষের ক্ষতি. বেসরকারি তথ্য অনুযায়ী, এই যুদ্ধে দশ লক্ষ মানুষ নিহত হয়েছিলেন. ভবিষ্যতে রক্তক্ষয় এড়ানোর জন্য - এটা মোটেও একমাত্র যুদ্ধের শিক্ষা নয়, যা তেহরানে আর বাগদাদে শিখে নেওয়া হয়েছিল, এই কথা উল্লেখ করে তেহরানের রাজনীতি বিশেষজ্ঞ হাসান হানিজাদে বলেছেন:

“কোন সন্দেহই নেই যে, আট বছর ধরে ইরান ও ইরাকের মধ্যে যুদ্ধের ফলে প্রত্যেক পক্ষই খুব একটা কম শিক্ষা পায় নি. তার প্রথম ও মূল্যবান শিক্ষা হয়েছিল মানুষের জীবনকে মূল্য দিতে শেখা. নিরীহ মানুষদের মধ্যে বহু লক্ষ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন. এখানে গুরুত্বপূর্ণ হবে অর্থনৈতিক ক্ষতির কথা মনে করলেও: বহু শহর ও গ্রাম ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল, যাদের পুনর্গঠনের জন্য প্রয়োজন হয়েছিল এক গগনচুম্বী পরিমাণ অর্থের যা গোনা হয়েছিল বহু শত কোটি ডলারে. এখন গুরুত্বপূর্ণ হয় যে, পঁচিশ বছর পার হয়ে এসে ইরান-ইরাক সীমান্তের দুই পারেই স্পষ্ট করে বোঝা হয়েছে যে, সামরিক কাজ কারবার করে রাজনৈতিক বিরোধের সমাধান করা সম্ভব নয়, শান্তি - যুদ্ধের চেয়ে দামী, আর বিভিন্ন ক্ষেত্রে সম্মিলিত ভাবে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমেই সহযোগিতা করলে তা বিরোধীতার চেয়ে বেশী লাভজনক হয়ে থাকে.

আনন্দের কথা হল যে, বর্তমানের বাগদাদের প্রশাসন ঐস্লামিক প্রজাতন্ত্র ইরানের সঙ্গে কোন রকমের গুরুতর বিরোধ রাখে না. ইরান- ইরাকের সম্পর্কের ভবিষ্যত ইতিবাচক ভাবে দেখার ভিত্তি রয়েছে. কারণ আজ আমাদের দেশগুলোকে আঞ্চলিক সহযোগী বলা যেতে পারে, যাদের আঞ্চলিক সমস্যাগুলো নিয়ে একই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গী রয়েছে. আজ এমনকি সমস্ত পরিস্থিতিও তৈরী হয়েছে যাতে নিকটপ্রাচ্যে আসন্ন ভবিষ্যতে ইরান ও ইরাকের অভিভাবকত্বে আঞ্চলিক জোট তৈরী করা সম্ভব হতে পারে, যা এই এলাকার নিরাপত্তা বজায় রাখার জন্যই ফলপ্রসূ ভাবে সহযোগিতার মাধ্যমে কাজ করতে পারে”.

এই দিকে প্রথম পদক্ষেপগুলো এখনই নেওয়া হচ্ছে, ইরানের ঐস্লামিক বিপ্লবের প্রতিরক্ষা বাহিনীর নৌবাহিনী ও ইরাকের নৌবাহিনী এই বছরে দুই দেশের নৌবহরের মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধি নিয়ে চুক্তি করেছে. তেহরান ও বাগদাদ আঞ্চলিক বিরোধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গুলির শান্তিপূর্ণ সমাধান নিয়ে আলোচনা করছে – তার মধ্যে সিরিয়ার বিরোধ ও ইজিপ্টের অভ্যুত্থান রয়েছে.

শুধু আলোচনাই ১৯৮০ থেকে ১৯৮৮ সালের ইরান- ইরাক যুদ্ধের শোক সন্তপ্ত পরিণামের পুনরাবৃত্তি হতে দেবে না, এই কথা উল্লেখ করে মস্কোর আন্তর্জাতিক সম্পর্ক সংক্রান্ত রাষ্ট্রীয় ইনস্টিটিউটের প্রফেসর ভেনিয়ামিন পাপোভ বলেছেন:

“ইরান ও ইরাকের যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে, সেই সময়ে সোভিয়েত দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রেই গ্রোমীকো উল্লেখ করেছিলেন: “এক দিনের যুদ্ধের চেয়ে দশ বছর ধরে আলোচনাও ভাল”. একবিংশ শতকে এই স্লোগান নিয়েই কাজ করা দরকার, যখন যে কোন রকমের সামরিক কাজ কারবার সারা বিশ্বের জন্যই বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে”.

রাশিয়া ঐস্লামিক বিশ্বে যে কোন ধরনের বিভাগের বিরুদ্ধে আহ্বান করেছে. বর্তমানে রুশ প্রজাতন্ত্রের পররাষ্ট্র বিভাগের প্রধান সের্গেই লাভরভ একাধিকবার ঘোষণা করেছেন যে, সমস্ত মুসলমানই – তাদের ধর্মীয় ধারা ব্যতিরেকেই শান্তি ও সহমতের মধ্যেই বেঁচে থাকতে বাধ্য. ইরান ও ইরাকের মুসলমানরা – এই ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম নয়.