মস্কোর রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর আলেকজান্ডার ভাভিলভ গল্প করে বলেছেন:

“মোসাদ্দীক ছিলেন একেবারেই কট্টর জাতীয়তাবাদী, যিনি জাতীয়- স্বাধীনতা সংগ্রামের আন্দোলনের ঢেউয়ে ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছেছিলেন, যা শুরু হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সোভিয়েত দেশের বিজয়ের পরে সমগ্র এশিয়া ও আফ্রিকা মহাদেশ জুড়েই. জাতীয় আন্দোলনের নেতা হিসাবে তাঁর মুখ্য অবদান ছিল এই যে, তিনি প্রথম বিদেশী কোম্পানীগুলোকে প্রস্তাব করেছিলেন যে, খনিজ তেল নিষ্কাশণ ও বিক্রয়ের থেকে লভ্যাংশের ভাগ আধাআধি করতে হবে. এর আগে পর্যন্ত ইরানের প্রাকৃতিক সম্পদের মালিকরা পেত শতকরা কুড়ি শতাংশের বেশী নয়. এই ঘটনা খুবই বড় আঘাত হতে পারত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের খনিজ তেলের মূলধনের জন্য, যারা অ্যাংলো ইরানিয়ান অয়েল কোম্পানীর সরবরাহের উপরে নির্ভর করত”.

অ্যাংলো ইরানিয়ান কোম্পানীর ক্ষতির মানে হতে পারত গ্রেট ব্রিটেনের নিকটপ্রাচ্যে প্রভাব হারানো. সেই ১৯৫১ সালেই গ্রেট ব্রিটেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী এমানুয়েল শিনুয়েল্ল ঘোষণা করেছিলেন যে, - “যদি পারস্যের এটা করে পার পাওয়া সম্ভব হয়, তবে ইজিপ্ট আর অন্যান্য নিকটপ্রাচ্যের দেশ গুলোও ঠিক করবে যে, তাদেরও মোসাদ্দীকের সময়ের ইরানের পথ ধরাই ন্যায্য হবে. পরবর্তী পদক্ষেপ হতে পারে সুয়েজ খালের জাতীয়করণ”.

ইরানের সঙ্গে গ্রেট ব্রিটেনের নতুন চুক্তি করার বেশ কয়েকটি নিষ্ফল প্রয়াসের পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তত্কালীন পররাষ্ট্র সচিব অ্যালেন ডালাস যে প্রস্তাব করেছিলেন, সেটা অনুযায়ী পরিকল্পনা তৈরী করা হয়েছিল মোসাদ্দীককে সরকার থেকে সরিয়ে দেওয়ার. প্রসঙ্গতঃ “আয়াক্স” নামের এই পরিকল্পনার শুরুটা তার আয়োজকদের জন্য অসফল হয়েছিল. ব্রিটেন ও মার্কিন গুপ্তচর বাহিনীদের ধান্ধা অনুযায়ী এই অপারেশনে ধরা হয়েছিল যে, শাহ যখন মোসাদ্দীককে বরখাস্ত করবেন, তখন অপারেশন করা হবে, কিন্তু সেই নির্দেশ তিনদিন দেরী করে পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল, আর মোসাদ্দীক আগে থেকেই সাবধান হওয়ার জন্য খবর পেয়ে গিয়েছিলেন. তিনি সেই অফিসারকে গ্রেপ্তার করেছিলেন, যে নির্দেশ তৈরী করেছিল আর এই সঙ্গে শাহকে পদচ্যুত করার কাজকর্মকে সক্রিয় করেছিলেন. মোসাদ্দীকের পক্ষের লোকরা রাস্তাঘাট ভরিয়ে ফেলেছিল. তারা তেহরানের স্কোয়ারে শাহের পিতার মূর্তি ধ্বংস করে দিয়েছিল. শাহ মহম্মদ রেজা পেহলভি তেহরান থেকে পালাতে বাধ্য হয়েছিলেন.

১৮ই আগষ্ট, মার্কিন পররাষ্ট্র সচিবের ডেপুটি ওয়াল্টার ব্যাডেল্ল স্মিথ মার্কিন রাষ্ট্রপতি আইসেনহাওয়ারকে জানিয়েছিলেন যে, “আয়াক্স” অপারেশন নিষ্ফল হয়েছে, আর তারই সঙ্গে খুব নিরাশ ভাবে যোগ করেছিলেন: “আমাদের ইরানের পরিস্থিতির দিকে নতুন করে নজর করে দেখতে হবে আর মোসাদ্দীকের ডানার তলাতেই জায়গা করে নিতে হবে, যদি আমরা সেখানে কিছু একটা নিজেদের জন্যে বাঁচিয়ে রাখতে চাই. আমি সাহস করে বলবো যে, এটা গ্রেট ব্রিটেনের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক কিছুটা জটিল করতে পারে”. কিন্তু তার পরের দিন সকালেই তেহরানে পাল্টা অভ্যুত্থান হয়েছিল. শাহের পক্ষের জেনারেল জাহেদী এক সাংবাদিক সম্মেলন করেছিলেন, যাতে তিনি মোসাদ্দীককে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া নিয়ে শাহের নির্দেশের ফোটোকপি উপস্থিত করেছিলেন. শাহের সমর্থনে করা ছোট একটা মিছিল, হঠাত্ করেই এক বিশাল ক্রমবর্ধমান মানব প্রবাহে পরিণত হয়েছিল. মোসাদ্দীকের বরখাস্ত হওয়া ও তার জায়গায় জাহেদী নিযুক্ত হওয়ার খবর লোকের কাছে ছড়িয়ে পড়েছিল. বেশীর ভাগ অফিসাররা শাহের চারপাশেই জড়ো হয়েছিল আর তাদের সঙ্গে সেনাবাহিনী ও পুলিশ বাহিনীও যোগ দিয়েছিল, যাদের মিছিল ভঙ্গ করতেই পাঠানো হয়েছিল.

১৯৫৩ সালের আগষ্ট মাসের শেষে শাহ তাঁর সিংহাসনে ফিরেছিলেন, সরকারে ছিলেন নতুন প্রধানমন্ত্রী, যাঁকে বাস্তবে পশ্চিমের বৃহত্ রাষ্ট্ররা বসিয়েছিল, আর মোসাদ্দীক ছিলেন গ্রেপ্তার অবস্থায়. পরবর্তী বছরগুলোতে অনেক তর্ক হয়েছে এই আমেরিকা-ব্রিটেনের অপারেশন নিয়ে – আর তার দাম নিয়েও. তার দাম কি হাজার ডলারেরও কম ছিল নাকি তার পেছনে বহু মিলিয়ন খরচ হয়েছে? পশ্চিমের দেশগুলো এই অভ্যুত্থান আয়োজন করেছিল নাকি তা শুধু করার সহায়তাই করেছিল?

তা সে যাই হোক না কেন আজকের ইরানে মোসাদ্দীককে হঠিয়ে দেওয়া মনে করা হয় দেশের সার্বভৌমত্বের উপরেই আঘাত বলে. এই বিষয়ে “রেডিও রাশিয়ার” প্রতিনিধি সাংবাদিক ইভান জাখারভকে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে ঐস্লামিক রাষ্ট্র ইরানের মেঝলিসের সদস্য রেজা খোজাত-শামামি বলেছেন:

“ইরানের জনগনের স্মৃতিতে ডক্টর মহম্মদ মোসাদ্দীক সব সময়ের জন্যেই থাকবেন এক সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনীতিবিদ হিসাবেই. যদি গবেষকদের নিয়ে বলার দরকার থাকে – যেমন ঐতিহাসিক, তেমনই অর্থনীতিবিদদের নিয়েও, তবে অবশ্যই নানারকমের মত রয়েছে শাহ মহম্মদ রেজা পেহলভির দরবারে প্রধানমন্ত্রী ডক্টর মহম্মদ মোসাদ্দীকের প্রধানমন্ত্রীত্বের সময় নিয়ে. কিন্তু সব মিলিয়ে সেই বিষয়ে সামাজিক মতামত যে মোসাদ্দীক – এক রাজনীতিবিদ, যিনি ইরানের জাতীয় স্বার্থ নিয়ে একেবারেই নীতিগত ভাবে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছেন, আর তাই তাঁকে জাতীয় বীরদের মধ্যেই রাখা যেতে পারে, এটা বহাল রয়েছে.

অনেক দেশেই অনেক রাজনৈতিক নেতার জীবন ও তা নিয়ে গবেষণা প্রায়ই একটা ধাঁধা হয়ে থেকে যায়, এমনকি কয়েক দশক পার হয়ে গেলেও, এমনকি বর্তমানের প্রশাসনের স্বচ্ছতার পথ ধরে চলার পরেও, ইরানের ও পশ্চিমের বিজ্ঞানীরা মোসাদ্দীকের সময়কালকে যথেষ্ট সম্পূর্ণ ভাবেই অনুসন্ধান করে দেখেছেন, তবুও তাতে রয়ে গিয়েছে অনেক না জানা অধ্যায়, একেবারে সাদা পাতার মতই. খুবই বিরল ব্যাপার, কিন্তু এই সময়ের প্রধান তথ্যের উত্স রয়ে গিয়েছে বিদেশী দলিলগুলো – সিআইএ সংস্থার দলিল, যার অনেকগুলোই মোসাদ্দীকের ইতিহাসের উপরে আলোকপাত করতে সমর্থ হয়েছে. যদিও স্পষ্টই দেখতে পাওয়া যাচ্ছে যে, আরও অনেক এই রকমেরই মূল্যবান দলিলই হয় নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে, নয়তো আগের মতই গোপনীয় রয়ে গিয়েছে”.

আর তাও বহু দেশের ঐতিহাসিকরা মনে করতে চান যে, অপারেশন “আয়াক্স” সফল হয়েছিল. কারণ – শাহের প্রশাসনের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা ও মোসাদ্দীকের উপরে লোকের হতাশা, যিনি এই প্রশাসনকেই বদলাতে চেয়েছিলেন, আর শাহের জায়গায় একাধিপতি হতে চেয়েছিলেন. এই ধরনের প্রশাসন সোভিয়েত দেশের নিয়ন্ত্রণে পড়তে পারত আর “ঠাণ্ডা যুদ্ধের” বেড়ে ওঠার সময়ে আরও একটা উত্তেজনার কেন্দ্র হতে পারত. এই পরিকল্পনার এক রচয়িতার কথামতো, “তা তেহরানে এমন পরিস্থিতি ও আবহাওয়া তৈরী করে দিয়েছিল যে, জনতা সেই দেশের ঐতিহ্য মেনে চলে আসা রাজতন্ত্রকেই মোসাদ্দীকের প্রস্তাবিত অনির্দিষ্ট ভবিষ্যতের বদলে বেছে নিয়েছিল”.

যদি তাই হয়ও, তবুও এই অপারেশনের সাফল্য আগে থেকে মোটেও নির্দিষ্ট ছিল না. ওয়াশিংটনে ফিরে এসে এই অপারেশনের নেতা কের্মিট রুজভেল্ট ব্যক্তিগত ভাবেই ফলাফল আইসেনহাওয়ারের কাছে রিপোর্ট করেছিলেন, যিনি এই বিষয়ে সহর্ষে নিজের ডায়েরীতে লিখেছিলেন যে, “অপারেশন “আয়াক্স” ঐতিহাসিক কোন বাস্তব ঘটনার চেয়ে বেশী করেই একটা সস্তা উপন্যাসের মতো”.