মোহম্মদ মুর্সিকে ক্ষমতাচ্যুত করার পরেই শুরু হওয়া বিশৃঙ্খলার অগ্নিশিখা লেলিহান হয়ে উঠেছে এই সপ্তাহে. এটা হল পুলিশ ও সামরিক বাহিনীর সম্মিলিত অভিযানে কায়রোর স্কোয়ারগুলো থেকে তাঁবু-শিবিরগুলো ছত্রভঙ্গ করার আশু প্রতিক্রিয়া. প্রথম শিবিরটি পুলিশ করায়ত্ত করেছিল দ্রুত, কিন্তু দ্বিতীয় শিবিরটি দেখা গেল মোকাবিলা করার জন্য উত্তম প্রস্তুতি নিয়েছে. সেখানে আস্তানাগারিরা টায়ার ও বালির বস্তা দিয়ে চারদিক ঘিরে ব্যারিকেড তৈরি করেছিল. ফলশ্রুতিতে, উভয়পক্ষের তরফ থেকে ছড়বেছড় আগ্নেয়াস্ত্র প্রয়োগে সেখানে রক্তগঙ্গা বয়েছে. তবে মিশরের সুবিদিত লেখক ও সমালোচক, এককালে মুসলিম ব্রাদারহুডের অন্যতম শীর্ষনেতা সারওয়াত আল-হেরওয়াভি মনে করেন, যে শাসক কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে বলপ্রয়োগ করাকে ভুল বলে মেনে নেওয়া ঠিক হবে না. –

যদি মুসলিম ব্রাদারহুডের আভ্যন্তরীন কাঠামো, পশ্চিমী গুপ্তচর বিভাগগুলির সাথে তাদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের দিকে মনোযোগ দিয়ে দেখা যায়, তাহলে পরিষ্কার হয়ে যাবে, যে ওটা একটা গুপ্ত সৈন্যবাহিনী, যারা যে কোনো মুহুর্তে যুদ্ধ শুরু করতে তৈরি. এক্ষেত্রে তারা মিশরের স্কোয়ারগুলোকে যুদ্ধের ফ্রন্টে পরিণত করেছিল, যেখানে তারা শিফটিং করে কাজ করছিল. যখন একদল ঘুমাতে যেতো, তখন অন্যদল ডিউটি দিচ্ছিল. ওখানে এমন সব শ্লোগান দেওয়া হচ্ছিল, যা যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে প্ররোচিত করে মানুষকে. আস্তানাগারীরা নির্ঘাত্ একটা বড়সড় কিছু ঘটার প্রতীক্ষা করছিল. মুর্সির সমর্থকরা প্রকাশ্যে তলোয়ার নিয়ে ঘুরছিল তোয়াক্কা না করেই. তাদের অস্ত্রশস্ত্রেরও অভাব ছিল না. এই উন্মত্ততা আপনাআপনিই থেমে যেতো না, উল্টে, বরং আরও ছড়িয়ে পড়তো. তাই সরকারের কাছে ঐ কুচক্র ছত্রভঙ্গ করা ছাড়া অন্য কোনো উপায় ছিল না, যারা মিশরীয় সমাজকে অনর্গল ঠেলে দিচ্ছিল হিংসার পথে.

কায়রো থেকে মিশরের অন্যান্য শহরে ছড়িয়ে পড়েছে হিংসাত্মক কার্যকলাপ. এক দিনের মধ্যেই নিরাপত্তা বাহিনী ও উগ্রপন্থী ইসলামিদের সংঘর্ষে কমপক্ষে ৭০০ জন প্রাণ হারিয়েছে. মুসলিম ব্রাদারহুডের তথ্য অনুযায়ী, দুই হাজারেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছে, আর দশ হাজারেরও বেশি লোক জখম. তবে সেইসঙ্গেই ভাঙচুরের শিকার হয়েছে মিশরের সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলো. এই সুযোগ নিয়ে ইসলামিরা খ্রীশ্চান গীর্জাগুলো লুটপাট করতে শুরু করেছে ও সেগুলিতে আগুন লাগাচ্ছে. আর হাতাতে চাওয়া ক্রিমিন্যালরা আলেকসান্দ্রিয়ার জাতীয় গ্রন্থাগার ও মিউজিয়াম আক্রমণ করে ঢোকার চেষ্টা করেছিল. এর ফলে মিশরের জাতীয় গ্রন্থাগার অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করা হয়েছে, বাধ্য হয়ে দেশে জরুরী অবস্থা জারি করা হয়েছে, কোনো কোনো এলাকায় কার্ফিউ বলবত্ করা হয়েছে. শনিবার মিলিটারি ও পুলিশ কায়রোর প্রধান জুম্মা মসজিদ থেকে দুস্কৃতীদের তাড়িয়েছে, যে ভবনটি ক্ষমতাচ্যুত মোহম্মদ মুর্সির অনুগামীদের মুখ্য যুদ্ধ শিবিরে পরিণত হয়েছিল.

একইসাথে বিশ্ব জনসমাজ প্রায় সমস্বরে মিশরের শাসকদের নিষ্ঠুর হাতে বিরোধীদের দমন করার সমালোচনায় মুখর. এই ব্যাপারে তুরস্কের রাষ্ট্রপতি রেজেপ এর্দোগান এতদূর গিয়েছেন, যে একে ‘জাতিহন্তা’ বলে অভিহিত করেছেন. অন্যান্য বিশ্বনেতারা অবশ্য সংযম রক্ষা করছেন. যেমন ফরাসি রাষ্ট্রপতি ফ্রাঁসুয়া ওলাঁদ বলেছেন – “এখন সবচেয়ে জরুরী, যাতে মিশরে গৃহযুদ্ধ এড়ানো সম্ভব হয়”. আর মার্কিনী রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামা বলেছেন – “যত তাড়াতাড়ি সম্ভব, হিংসার এই চক্র থেকে বেরিয়ে আসা এবং জরুরী অবস্থা প্রত্যাবর্তণ করা আবশ্যক”. তবে ওবামা মুর্সির অপসারনকে অভ্যুত্থাণ আখ্যা দেওয়ার ঝুঁকি নেন নি. ব্যাপারটা হচ্ছে এই, যে সেক্ষেত্রে আমেরিকাকে বন্ধ করতে হতো মিশরকে অর্থনৈতিক সাহায্যদান, যে দেশ পৃথিবীর ঐ অঞ্চলে বরাবর ছিল আমেরিকার সবচেয়ে বিশ্বস্ত দোসর এবং নিরাপদ ঘাঁটি.