এর মানে কি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অবশেষ বেশী বাস্তববাদী ভাবে নিজেদের পুরনো নীতির পরিণাম মূল্যায়ণ করতে শুরু করেছে, যা ছিল, আসাদকে “যে কোন মূল্যে” পদচ্যুত করা? বিশেষজ্ঞরা এই বিষয়ে নিজেদের মতে কিন্তু দু’ভাগে ভাগ হয়ে গিয়েছেন.

সমীক্ষক ইভগেনি এরমোলায়েভ মনে করেন যে, ব্যাপারটা শুধু সিরিয়া নিয়েই নয়. আমেরিকার রাজনীতি এই এলাকায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধেই ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে, বিশেষ করে সেই সমস্ত দেশেই, যেগুলিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র “নিজেদের ডানার তলায় আশ্রয় দিয়েছিল”, এই সূত্রে তিনি বলেছেন:

“এই বছরের শুরু থেকে ইরাকে সন্ত্রাসবাদী আক্রমণে ও সশস্ত্র সংঘর্ষের ফলে চার হাজারেরও বেশী মানুষ নিহত হয়েছেন. দেশ আন্তর্ধর্মীয় ও আন্তর্প্রজাতি বিরোধে জীর্ণ হয়ে গিয়েছে. স্থানীয় সমীক্ষকদের মতে তারা এখন গৃহযুদ্ধের কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছে. লিবিয়াতেও পরিস্থিতি সুবিধার নয়, সেখানে চলছে একটা মন্থর গতিতে চলা গৃহযুদ্ধ, সেখানে সক্রিয় রয়েছে কারও অধীনেই নয়, এমন সমস্ত সশস্ত্র বাহিনী”.

কোন সন্দেহ নেই যে, যদি সিরিয়াতে বর্তমানের কেন্দ্রীয় প্রশাসনকে পদচ্যুত করা হয়, তবে সেই দেশের হয়তো আরও বাজে ভবিষ্যত হতে পারে. এই বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণ করে সেই ব্যাপার যে, এই তিনটি রাষ্ট্রের সবকটিতেই সশস্ত্র হস্তক্ষেপ শুরু হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের জোটসঙ্গীদের তরফ থেকে খুবই কঠোর চাপের মধ্যে. যদি একটি দেশে এক রকমের নির্দিষ্ট পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, তবে সেটাকে মনে করা যেতে পারে আচমকা বলে, কিন্তু তা যদি আরও একটি দেশে পুনরাবৃত্তি হয়, তবে বলা যেতে পারে মিল বলে, আর যদি একই ধরনের পরিস্থিতি তৃতীয় দেশেও জোর করিয়ে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়, তবে সেটাকে বলা যেতে পারে একটা প্রবণতা বলেই.

দেখাই যাচ্ছে যে, পশ্চিমের উচ্চ কোটির লোকদের ভেতরে নিকটপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার দেশগুলোর জন্য নতুন ধরনের রাষ্ট্র ব্যবস্থার মডেল তৈরী করা হয়েছিল. তা তৈরী করার মূল উদ্দেশ্য ছিল এই দেশগুলোতে একটা অকর্মণ্য, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অক্ষম প্রশাসনিক কাঠামো তৈরী করা, যা সবসময়ে পশ্চিমের দিকে তাকিয়ে থাকতে বাধ্য হবে. কিন্তু এই সবই পরিণামে সেই পশ্চিমের বিরুদ্ধেই ঘুরে দাঁড়িয়েছে: এলাকা সম্পূর্ণ ভাবেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে. সিআইএ সংস্থার ডেপুটি ডিরেক্টর বিপদ সঙ্কেত দিচ্ছেন – কিন্তু তার মানে এটা বাস্তব নয় যে, তাঁর মত শোনা হবে.

এই দৃষ্টিকোণ থেকে সম্পূর্ণ ভাবে একমত হতে পারেন নি ভিক্টর নাদেইন-রায়েভস্কি. তিনি বলেছেন:

“নিকটপ্রাচ্য আর উত্তর আফ্রিকার দেশগুলোতে পশ্চিমের রাষ্ট্র ব্যবস্থা ধ্বংস করার বিষয়ে অবদান স্পষ্টই দেখতে পাওয়া যাচ্ছে. কিন্তু সব কিছুরই একটা সীমা রয়েছে. তা নির্ভর করছে এই এলাকা থেকে পশ্চিমের জন্যই বিপদের আশঙ্কার মাত্রার উপরে. তাছাড়া, সিরিয়াতে পরিস্থিতি দেখিয়ে দিচ্ছে যে, বর্তমানে থাকা রাষ্ট্রীয় কাঠামো ধ্বংস করে দেওয়ার রাজনীতি সবসময়ে দেখতেও পাওয়া যাচ্ছে না যে, ততটা সফল, যতটা তা যারা করছে, তারা চেয়েছে”.

সিআইএ সংস্থার ডেপুটি ডিরেক্টরের ঘোষণা দেখিয়ে দিয়েছে যে, পশ্চিম খুব সম্ভবতঃ, নিকটপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকাতে মাত্সান্যায় সৃষ্টি করার প্রক্রিয়াকে কিছুটা থামিয়ে দেবে. তারা রাজী হয়েছে এই সব “সমস্যাপূর্ণ দেশগুলোতে” সাময়িক ভাবে সেই সমস্ত শক্তিদের ক্ষমতায় আসতে দেবে বা টিকে থাকতে দেবে, যারা অন্তত কিছুটা হলেও পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখতে পারে. তাদের নির্দিষ্ট পরিমাণে স্বাধীনতা দেওয়া হবে, কিন্তু শুধু সেই শর্তেই যে, তারা পশ্চিমের দিকে তাকিয়েই কাজ করতে বাধ্য হবে.

মনে করা হয়েছে যে, পশ্চিমের স্বার্থ নিকটপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার দিকে রয়েছে জ্বালানী সংক্রান্ত খনিজ পদার্থের উপরে নিয়ন্ত্রণের জন্যই, যার উপরে তারা নির্ভরশীল. কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ধারণা করেছে যে, তারা ২০২০ সালে আমদানীকারক দেশ থেকে পরিবর্তিত হয়ে রপ্তানী কারক দেশে পরিণত হবে. তাহলে, আমেরিকা নিকটপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার উপর থেকে আগ্রহ হারাবে কি?

ভিক্টর নাদেইন-রায়েভস্কি উল্লেখ করেছেন যে, আসলে এই এলাকার গুরুত্ব শুধু খনিজ তেল বা গ্যাস দিয়েই ফুরিয়ে যাচ্ছে না, তাই তিনি বলেছেন:

“পশ্চিমের চোখে এই এলাকা আরও বেশী করেই গুরুত্ব পাচ্ছে এই কারণে যে, তা ভূ-রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ. চিন নিয়মিত ভাবই এখানে নিজেদের অবস্থানকে মজবুত করছে. অনেক বিশেষজ্ঞই আগে থেকে বলে দিচ্ছেন যে, চিনের অর্থনীতি বিশ্বে খুব শীঘ্রই প্রথম অর্থনীতিতে পরিণত হবে. অর্থাত্ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের অর্থনৈতিক নেতৃত্ব হারাতে বসেছে. এর পরে খুবই যুক্তিসঙ্গত হতে পারত রাজনৈতিক নেতৃত্ব হারানো – আর তখন “আমেরিকার অস্ত” যাওয়ার প্রক্রিয়া একেবারেই আর ফিরিয়ে দেওয়ার যোগ্য থাকবে না. কিন্তু বোঝাই যাচ্ছে যে, এটা যেমন আমেরিকার, তেমনই অন্যান্য পশ্চিমের উচ্চ কোটির লোকদের পছন্দ হয় নি”.

আর তাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য পশ্চিমের দেশ গুলি এই স্ট্র্যাটেজিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ এলাকার উপরে নিজেদের সামরিক- রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে চাইবে – আর তা প্রাথমিক ভাবে নিকট প্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার উপরে হবে. আর যদিও আমেরিকা কিছু একটা সময় ধরে এই এলাকা থেকে খুবই কম খনিজ তেল ও গ্যাস পায়, তবুও চিন ও অন্যান্য এশিয়ার দেশ গুলি এই এলাকা থেকে পাবে আগের মতই আরও বেশী করেই. তাই এই এলাকার উপর থেকে পশ্চিমের আগ্রহ কমে যাওয়া নিয়ে পূর্বাভাস মোটেও কোন ভিত্তি রাখে না.