এরকমই একটি মস্তিষ্কপ্রসূত বৃত্তান্ত তথাকথিত ‘দে-৬’ নামবাহী ‘বিশেষ প্রয়োজনের মেট্রো’ সম্পর্কে.

এই উপাখ্যান শুরু হয়েছিল ১৯৯১ সালে, যখন আমেরিকার প্রতিরক্ষা দপ্তরের বার্ষিক মুখপত্র ‘দে-৬’- এর তিনটি লাইনের নীলনক্সা ছাপিয়েছিল. সবকটি লাইনই শুরু হয়েছিল ক্রেমলিন থেকে এবং মাটির নীচে ২০০ থেকে ৩০০ মিটার গভীরে ছিল তাদের তূগর্ভস্থ নেটওয়ার্ক. ক্রেমলিন থেকে নাকি পারমানবিক যুদ্ধ বাধলে রাজনৈতিক ও সামরিক শিখন্ডীকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য তিনটি সুড়ঙ্গ খোঁড়া ছিল, যেগুলির মাধ্যমে ক্রেমলিনের সাথে সরকারী ভূগর্ভস্থ শিবিরগুলির সরাসরি যোগাযোগ ছিল. প্রথম লাইনটি নাকি প্রলম্বিত ছিল মস্কোর দক্ষিণে ৬০ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত সামরিক বাহিনীর হেড কোয়ার্টার পর্যন্ত - শীর্ষ সামরিক পদাধিকারী ও মন্ত্রীদের জন্য নির্মিত ভূগর্ভস্থ শিবির পর্যন্ত. দ্বিতীয় লাইনটি নাকি ছিল মস্কোর দক্ষিণে ২৫ কি.মি. দূরত্বে অবস্থিত রকেট প্রতিরোধী ব্যবস্থার সদর দপ্তর পর্যন্ত. তৃতীয় লাইনটি নাকি মস্কোর দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত ভ্নুকোভা বিমানবন্দরের টার্মিনাস পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল. আমেরিকানদের তথ্য তত্ক্ষণাত রাশিয়ার সংবাদ মাধ্যমগুলি আত্মসাত্ করেছিল. খবরের কাগজের হেডলাইনে নিয়মিত প্রকাশিত হতে শুরু করলো অবসরপ্রাপ্ত কেজিবি’র, সেনাবাহিনীর প্রাক্তন শীর্ষ পদাধিকারীদের, এমনকি নেহাত্ অর্বাচীন লোকেদের স্মৃতিচারণা. তদুপরি ওদের মধ্যে অনেকেই নিজের আসল নাম ফাঁস করতে চায়নি, যে কারণে তাদের বৃত্তান্তের সত্যনিষ্ঠতা সম্পর্কে সন্দেহ থেকেই গেছিল. যাই হোক না কেন, ঐ সব গল্পগাথা মানুষের কল্পনাপ্রবণতাকে উদ্বুদ্ধ করে তুলে ছিল. জনশ্রুতি ছিল, যে মস্কোর সীমানার ঠিক বাইরেই নাকি আছে গোটা একটা ভূগর্ভস্থ শহর, যেখানে আবাসন ছাড়াও আছে খাদ্যসামগ্রীর বিশাল গুদাম, এমনকি সিনেমা হল পর্যন্ত. সেখানে নাকি মস্কোর উপর পারমানবিক বোমা বিস্ফোরণের পরে ‘বাছাই করা’ ১৫ হাজার মানুষ কয়েক দশক ধরে নির্বিঘ্নে জীবনযাপন করতে পারতো. যতই এগোচ্ছিল এই সব লোমহর্ষক বিবরণী, ততই বুঝে ওঠা দুস্কর হয়ে উঠছিল যে, কোথায় সত্য আর কোথায় কল্পনাপ্রসূত কাহিনী.

তারপরে বহুবছর কেটে গেছে, ‘দে-৬’ নিয়ে উত্তেজনা বহু দিন আগেই স্থিমিত হয়ে গেছে, কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে. কোথায় অবস্থিত সেই ভূগর্ভস্থ শহর? রহস্যময় সেই গোপন মেট্রোর অস্তিত্ব আদৌ আছে কি? ভূগর্ভস্থ নির্মানকাজে রাশিয়ার সবচেয়ে দক্ষ বিশেষজ্ঞ খানান আব্রামসনের দৃঢ় বিশ্বাস এই, যে মস্কোর ভূগর্ভে কোনো শহরের অস্তিত্ব নেই, কোনোদিনও ছিল না. আছে শুধুমাত্র কয়েকটি ভূগর্ভস্থ আশ্রয় শিবির, যেগুলি সেন্টারের একেবারে মাটির তলায়. সেগুলি নির্মান করা হয়েছিল গত শতাব্দীর ত্রিশের দশকে এবং এখনো সেগুলিকে কার্যক্ষম অবস্থায় রাখা হয়েছে. সেরকমই একটা ভূগর্ভস্থ আশ্রয় শিবির – সেনাবাহিনীর হেড কোয়ার্টার. সেটা মাটির তলায় কয়েক তলা পর্যন্ত প্রলম্বিত. তার দৈর্ঘ্য ১৮০ মিটার, প্রস্থ ১৫ মিটার. আব্রামসনের মতে, কোনো গোপন মেট্রোরও অস্তিত্ব নেই, আছে সরকারী দপ্তরগুলির মধ্যে কিছু ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ, কিন্তু প্রযুক্তিগত দিক থেকে তাদের মেট্রোপলিটানের মতো অবিচ্ছিন্ন নেটওয়ার্কে যুক্ত করা সম্ভব নয়.

মস্কোর ভূগর্ভস্থ ভিআইপি যোগাযোগ ব্যবস্থা নজীরবিহীন নয়. ওয়াশিংটনেও ভূগর্ভে তিনটি লাইন প্রশাসনিক ভবনগুলিকে যুক্ত করে. সেখানে কোনো গোপনীয়তা নেই. ইচ্ছুক যে কেউ সরকারি লাইন ধরে মেট্রো ট্রেনে চড়তে পারে, তবে তার সাথে অবশ্যই দেহরক্ষক থাকবে. তবে অন্যদিকে, উত্তর কোরিয়ায় সরকারী মেট্রো সম্পর্কে তথ্যাবলী সাত সীলমোহরের ওপারে. উত্তর কোরিয়া থেকে পালিয়ে আসা একজন পেশাদার গল্প করেছেন যে পিয়ং-ইয়ং থেকে মাটির ৩০০ মিটার নীচু দিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরকারি মেট্রো লাইন নাকি স্থাপন করা আছে. এই বিজ্ঞপ্তির সত্যাসত্যের প্রমাণ পাওয়া যে অসম্ভব, সে তো আপনারা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন.