লক্ষ্য খুবই ভাল, কিন্তু তা বাস্তবায়ন করা বোধহয় হয়ে উঠবে না, অন্তত যতক্ষণ না পারমাণবিক অস্ত্র ঘিরে রাজনৈতিক খেলা সাঙ্গ হচ্ছে. তার মধ্যে মানব সমাজকে হিরোশিমা ও নাগাসাকি শহরের উপরে পারমাণবিক বোমা বর্ষণের কারণ নিয়েও সত্ভাবে বোঝাপড়া করতে হবে বলে মনে করেছেন, মস্কোর আন্তর্জাতিক সম্পর্ক সংক্রান্ত রাষ্ট্রীয় উচ্চশিক্ষায়তনের অন্তর্গত আন্তর্জাতিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ আন্দ্রেই ইভানভ:

“সকলেই স্বীকার করেছে যে, হিরোশিমা ও নাগাসাকির উপরে আমেরিকার লোকদের পরমাণু বোমা ফেলা জাপানের জনগনের জন্য এক ভয়ঙ্কর ট্র্যাজেডিতে পরিণত হয়েছে. তার পরিণাম থেকে আজও সেই দেশে মানুষ অসুস্থ হয়ে অকালে মারা যাচ্ছেন. আর তর্ক চলছে সেই বিষয় নিয়ে যে, জাপানের বিরুদ্ধে পরমাণু বোমা ব্যবহার কি যুক্তিসঙ্গত হয়েছিল. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এই রকমের একটা ধারণা প্রচলিত আছে যে, জাপানের যুদ্ধের বিষয়ে উদ্যোগকেই ধ্বংস করেছিল হিরোশিমা ও নাগাসাকির উপরে বোমা ফেলা, তাদের আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করেছিল আর তারই মধ্যে দিয়ে বহু সহস্র মার্কিন, ব্রিটিশ, চিনের, সোভিয়েত দেশের, আর হ্যাঁ, এমনকি জাপানের সৈনিকদেরও জীবন রক্ষা করা সম্ভব হয়েছিল. ২০০৭ সালে এই ধরনের মন্তব্য করে এমনকি বক্তৃতা দিয়েছিলেন জাপানেরই প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ফুমিও ক্যুমা. পারমাণবিক বোমা হিরোশিমা ও নাগাসাকির উপরে ফেলা ছিল খারাপ কাজ, কিন্তু তা অনিবার্যই ছিল, বলেছিলেন তিনি. সুতরাং বাধ্য হয়ে জাপানের দুই শহরের উপরে পারমাণবিক বোমা ফেলা নিয়ে ধারণাই, যা বাস্তবে এই কাজকে স্বীকৃতী দিয়েছে, তাই পশ্চিমে বর্তমানে চালু রয়েছে”.

এরই মধ্যে, সেই গ্রেট ব্রিটেনেরই প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল বলেছিলেন, জাপানকে আত্মসমর্পণে যা বাধ্য করেছে, তা আমেরিকার পরমাণু বোমা নয়, বরং সোভিয়েত দেশের পক্ষ থেকে যুদ্ধে যোগদান, এই কথাই মনে করিয়ে দিয়েছেন ইভানভ. এই দৃষ্টিকোণ, যা রাশিয়ার যে কোন স্কুল পড়ুয়া ছাত্রেরই জানা রয়েছে, তা পশ্চিমে ভুলে যাওয়া হয়েছে. তাই বহু পশ্চিমের পাঠকের জন্যই একবারে আবিষ্কার হয়ে দাঁড়িয়েছে যেমন ব্রিটিশ ঐতিহাসিক ওয়ার্ড উইলসনের লেখা “পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে পাঁচটি রূপকথা” নামের বইয়ে সেই প্রবন্ধ যে, “স্তালিন চারদিনে সেটাই করে দেখিয়েছিলেন, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চার বছরেও করতে পারে নি”. তিনি প্রমাণ সাপেক্ষ ভাবেই সেই ধারণাকে নস্যাত করেছেন যে, প্রশান্ত মহাসাগরে যুদ্ধের ইতি করেছিল পারমাণবিক বোমা ফেলা. এই কাজ করার আগেই সেই আমেরিকার “উড়ন্ত দুর্গ” নামের বোমারু বিমান গুলি সাধারণ বোমা দিয়েই ভূপৃষ্ঠ থেকে বেশ কয়েক ডজন জাপানের শহরকে একেবারে প্রায় মুছে দিয়েছিল. সেখানে মৃত্যু হয়েছিল বহু লক্ষ মানুষেরই. কিন্তু জাপানের সামরিক নেতৃত্ব মনে করেছিল যে, এই ধরনের কষ্ট শুধু জাতিকেই আরও জোটবদ্ধ করবে আর তাদের বাধা দেওয়ার ইচ্ছাকেই দৃঢ় করবে. এই পটভূমিতে ১৯৪৫ সালের ৬ই আগষ্ট হিরোশিমা ধ্বংস করে দেওয়া শুরুতে জাপানের নেতৃত্বের উপরে কোন প্রভাবই ফেলে নি. এই মনোভাব এমনকি ৯ই আগষ্ট মধ্যদিনে নাগাসাকির উপরে পরমাণু বোমা বর্ষণের খবরের পরেও পাল্টায় নি. তাঁদের মানসিকতায় একটা পরিবর্তন শুধু সেই দিনই যুদ্ধ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সর্ব্বোচ্চ সভার এক জরুরী বৈঠকে যখন তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী কান্তারো সুজুকি ঘোষণা করেছিলেন: “আজ সকালে সোভিয়েত দেশ আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করাতে আমাদের একেবারেই শেষ অবধি কোন পথ হীন অবস্থায় দাঁড় করিয়েছে ও পরে এই যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়াকে অসম্ভব করেই দিয়েছে”, তা জানার পরেই হয়েছিল.

সোভিয়েত সেনাবাহিনীর মাঞ্চুরিয়াতে খুবই দ্রুত আক্রমণ বাধ্য করেছিল জাপানের সম্রাট হীরোহিতোকে ১৪ই আগষ্ট আত্মসমর্পণ নিয়ে রাজকীয় নির্দেশে স্বাক্ষর করতে. আর শুধু সোভিয়েত সেনা বাহিনীর খুবই জোর দিয়ে করা কাজকর্ম, যা জাপানের বাহিনীর কোরিয়া ও মাঞ্চুরিয়াতে খুবই দ্রুত ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কারণ হয়েছিল, তাই জাপানের সামরিক নেতৃত্বকে ১৯৪৫ সালের ১৯শে আগষ্ট নির্দেশ দিতে বাধ্য করেছিল এক নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের জন্য. তাই একমাত্র এটাই, কোন পারমাণবিক বোমা ফেলা নয়, যা শুধুমাত্র এক লক্ষেরও বেশী নিরীহ জাপানের নাগরিকের প্রাণ হরণের কারণ হয়েছিল, যা বাস্তবে যুদ্ধের অন্তকে এগিয়ে নিয়ে আসতে পেরেছিল. এখানে সন্দেহ না করলেও চলবে যে, হিরোশিমা ও নাগাসাকি ছাড়াই ফলাফল একই রকমের হতে পারত. কিন্তু আমেরিকার লোকদের, তাদের নিজেদেরই স্বীকারোক্তি অনুযায়ী সোভিয়েত দেশের উপরে চাপ তৈরী করার জন্য প্রয়োজন ছিল “পারমাণবিক লাঠি” দেখানোর.

সব সময়ে পারমাণবিক বিপর্যয়ের হুমকি থাকলে বেঁচে থাকা সোজা কাজ নয়. কিন্তু, যাতে পরমাণু অস্ত্র বিহীণ বিশ্বের স্বপ্ন সফল হতে পারে, তার জন্য যথেষ্ট হতে পারে না শুধু হিরোশিমা ও নাগাসাকির ট্র্যাজেডিক উপরেই শুধু দাঁড়ি টানায়. এই কথা উল্লেখ করে আন্দ্রেই ইভানভ বলেছেন:

“এখানে অকপটে স্বীকার করা দরকার যে, বহু দেশের জন্যই আজ দুঃখের হলেও পারমাণবিক অস্ত্রই হচ্ছে তাদের টিকে থাকার একমাত্র ভরসাযোগ্য গ্যারান্টি. তাদের মধ্যে রয়েছে যেমন, ইজরায়েলও. কিন্তু এখানে লক্ষ্য করার মতো হল যে, যদি ইজরায়েলের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র থাকাটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কোন আপত্তির কারণ নাও হয়ে থাকে, তবু পিয়ংইয়ংয়ের তরফ থেকে এটাই হাতে পাওয়ার ইচ্ছা তাদের দিক থেকেই বিরক্তির ঝড় তোলে. উত্তর কোরিয়ার জন্য রকেট পারমাণবিক অস্ত্রই কিন্তু একমাত্র দেশকে টিকিয়ে রাখার গ্যারান্টি. কারণ ওয়াশিংটন, যারা অন্য সার্বভৌম দেশের এক প্রশাসনকে অন্য প্রশাসন দিয়ে পছন্দ মতোই বদলে নিয়ে থাকে, তারাই সেই পিয়ংইয়ংকে কোন একটা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকার গ্যারান্টি দিতে তৈরী নয়. একই পরিস্থিতিতে রয়েছে ইরানও”.

এক কথায়, যদি একসারি দেশের বাইরের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বাধা দেওয়ার জন্য অন্য কিছুর উদ্ভব না হয়, তবে পারমাণবিক অস্ত্র বিহীণ বিশ্বের স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে.