৩৭-বছর বয়সী মস্কোবাসী আন্তন ক্রোতভ অন্য দৃষ্টি দিয়ে পৃথিবীটাকে দ্যাখেন. তিনি নিজের জন্য আবিষ্কার করেন পৃথিবীর পথঘাট. অন্যান্য সবাই যারা পর্যটন আয়োজক সংস্থাগুলির পরিষেবা গ্রহণ করে, তাদের বিপরীতে আন্তন সফর করেন ফকুটিয়ায় অপরিচিত গাড়িতে সওয়ারি হয়ে. আন্তন বলছেন – যদি দরকারী সময়ে দরকারী রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে হাত দেখানো হয়, তাহলে কোনো না কোনো গাড়ি থেমে আপনাকে ঠিক তুলে নেবে ও গন্তব্যে পৌঁছে দেবে. –

রাশিয়া সহ সিআইএসের দেশগুলিতে মোট ১৮২টি অঞ্চল, যার মধ্যে ১৭৮টি অঞ্চলে আমি গেছি. তাছাড়াও গর্ব করে বলতে পারি, যে আমি বিশ্বের ৭০টি দেশ সফর করেছি. পর্যটনের পথে বেরিয়ে ছিলাম সেই ১৯৯১ সালে. তখন আমার বয়স ছিল মাত্র ১৫ বছর, এখনো ভ্রমণ করেই চলেছি. দূরবর্তী বিদেশের পথ নিজের জন্য আবিষ্কার করা আন্তন শুরু করেছিলেন ইরান দিয়ে. –

ইরানে হাত দেখিয়ে গাড়ি থামিয়ে ফকুটিয়ায় ভ্রমণ করা – মামুলি ব্যাপার. ইরানিরা সানন্দে বিনা পয়সায় গাড়িতে লিফট দেয়, তারা অত্যন্ত অতিথিপরায়ন. রাস্তাঘাট উত্কৃষ্টমানের. পৃথিবীতে ইরান অন্যতম সবচেয়ে বন্ধুভাবাপন্ন দেশ. ঐ দেশে সফর খুবই সুখকর. উপরন্তু ইরান দিয়েই শুরু হয়েছিল আমার দূরবর্তী বিদেশ ভ্রমণ – বলছেন আন্তন. আমি চারবার ঐ দেশ সফর করেছি এবং ভবিষ্যতে আবার সেখানে যাওয়ার সংকল্প রয়েছে.

ইরান ভ্রমণের অভিভূতি আন্তন লিপিবদ্ধ করেছেন প্রকাশিত একটি চটি বইয়ে, যার নাম দিয়েছেন – ‘সাত সাগর পেরিয়ে ভ্রমণ’. বইটিতে সবিস্তারে বর্ণনা করা হয়েছে কিভাবে তিনি সেখানে গিয়ে পৌঁছালেন, কিভাবে ইরানের এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাতায়াত করেছিলেন, কিভাবে লোকজনের সাথে আলাপ করেছিলেন, কিভাবে বাজারে দরাদরি করতেন – সেইসবের.

সবমিলিয়ে আন্তন প্রায় ৪০টি বই লিখেছেন. তার মধ্যে একটি উত্সর্গীত সুদান ভ্রমণের উপর. তিন মাসব্যাপী সুদান সফর ও প্রত্যাবর্তনের পেছনে আন্তন মাত্র ৩৫০ ডলার খরচা করেছিলেন. লোকে ভুল করে এই ভেবে, যে বিশ্বভ্রমণের জন্য কাঁড়ি কাঁড়ি অর্থের প্রয়োজন. খরচের সিংহভাগটাই যায় বিমান ভাড়ার খাতে. যেমন, ঝাড়া হাত-পা পর্যটক সাড়ে সাত মাস ধরে গোটা আফ্রিকা চষে বেড়িয়েছেন বিনা পয়সায় গাড়িতে লিফট নিয়ে নিয়ে মাত্র ৮৫০ ডলারে. নিজের ভ্রমণ সম্বলিত বইপত্র বিক্রি থেকে আয় করা পয়সায় আন্তন ভ্রমণ করেন.

গত বছরে সবমিলিয়ে মাত্র ৫৮ দিন আন্তন মস্কোয় কাটিয়েছেন. বাকি গোটা সময়টা পথে, পর্যটনে. –

আমার এখনো বহু বিভিন্ন পরিকল্পনা আছেঃ এই বছরে পূর্ব আফ্রিকা, মাদাগাস্কার. আন্তন বলছেন – আল্লাহ্ কৃপা করুন, ২০১৫ সালে আবার যাব ইন্দোনেশিয়ায়. ‘সার্বজনীন গৃহ’ বলে আমার একটা প্রকল্প আছে. কোনো শহরে আমি মাস দুয়েকের জন্য বাড়ি ভাড়া করি. পৃথিবীর যে কেউ সেখানে এসে ঐ বাড়িতে ঠাঁই পেতে পারে. আমার সেরকম বাড়ি ছিল কায়রোয়, ইস্তাম্বুলে. সেরকম বাড়ি ভাড়া নেবো ইন্দোনেশিয়ার জাভা দ্বীপে. তাছাড়া আমি সৌদি আরবের ভিসার প্রতীক্ষায় রয়েছি. ভিসা পেয়ে গেলে যাব তীর্থযাত্রায়.

দীর্ঘকালীন সত্যের সন্ধানের শেষে আন্তন ২০০১ সালে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন. পবিত্র হজ যাত্রা সম্পন্ন করা শুধুমাত্র তার স্বপ্নই নয়, তার কর্তব্য.

আন্তনের দৃঢ় বিশ্বাস, যে কোনো খারাপ দেশ নেই, আর ভালো দেশ হচ্ছে সেই ভূমি, যেখানকার মানুষ অতিথিপরায়ন, সত্, উদার, পরদুঃখকাতর. আসল হচ্ছে মনুষ্যত্ব বজায় রাখা.

সফর করার পাশাপাশি আন্তন রাশিয়ার বিভিন্ন শহরে শ্রোতাদের লেকচার দেয়, ডজন ডজন অতিথিকে আপ্যায়ন করে, বইপত্র লেখে, তারই প্রতিষ্ঠিত ‘মুক্তকচ্ছ পর্যটকদের এ্যাকাডেমি’র কাজকর্মের তদারকি করে. এ্যাকাডেমির পরবর্তী সাক্ষাত্কারটি আয়োজিত হবে সেপ্টেম্বরে.

মুক্তকচ্ছ পর্যটকদের মূলমন্ত্র – বাস্তবিকই যা না হলেও চলে, তার পেছনে অযথা সময়ের অপচয় না করা. প্রাজ্ঞ নীতি – তাই না? তবে মারপ্যাঁচটা হচ্ছে এইখানেই, যে আপনাকে বুঝতে হবে বাস্তবে ঠিক কি আপনার প্রয়োজন. কারো কারো সেটা বুঝে উঠতেই সারা জীবন কেটে যায়. আন্তন এটা বুঝেছেন খুব তাড়াতাড়ি.