নির্মাণের কাজে প্রায় পঞ্চাশ কোটি মার্কিন ডলারের সমান অর্থ খরচ করে তৈরী করা এই নতুন বন্দরের সুবিধা স্পষ্টই দেখতে পাওয়া যাচ্ছে. এর গভীরতা ১৮ মিটার, যা দক্ষিণ ভারতের বন্দর কোচী ও তুতিকোরিনের গভীরতার চেয়ে অনেকটাই বেশী. এই বন্দরের ক্ষমতা রয়েছে এমন সমস্ত জাহাজ ঢুকতে দেওয়ার, যাতে একসাথে ১৮ হাজার পর্যন্ত কন্টেনার থাকতে পারে, আর ২০২০ সালে তৈরীর কাজ শেষ হওয়ার পরে এই বন্দর হয়ে যত মাল যাওয়া আসা করতে পারবে, তার সম্মিলিত পরিমাণ হতে চলেছে বছরে ১ কোটি কন্টেনার পর্যন্ত.

তাছাড়া, কলম্বো বন্দর শুধু আফ্রিকা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মাঝামাঝিই নয়, বরং এই বন্দর দিয়ে সিঙ্গাপুর অথবা কেপ টাউন থেকে ছাড়া জাহাজ চলাচলের সময়ে অনায়াসে দুবাই বন্দরকে এড়িয়ে যেতে পারবে, আর তার মানে হল যে, জলদস্যূ অধ্যুষিত আফ্রিকার শৃঙ্গ এলাকাকে এড়িয়ে যাওয়া আসা করা যাবে.

কোন সন্দেহই নেই যে, এই সব কিছুই শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য উদ্দীপক হতে পারে, যে দেশ প্রায় পঁচিশ বছর ধরে একটানা গৃহযুদ্ধ চলার পরে চেষ্টা করছে নিজেদের অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করার জন্যে.

কিন্তু সমস্যা সেই বিষয়ে যে, কলম্বো বন্দরের প্রসার ও আধুনিকীকরণে শুধু অর্থনীতি নিয়েই প্রশ্নের উদ্রেক হচ্ছে না, এই রকম মনে করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“এই বিষয়ে মোদ্দা কথা হল যে, নতুন এই টার্মিনাল (এই বন্দরে তৈরী হওয়া অন্যান্যগুলোর ক্ষেত্রেও তা বলা চলে) চিনের সাহায্য নিয়ে করা হয়েছে. শতকরা ৮৫ ভাগ শেয়ার রয়েছে চিনের রাষ্ট্রীয় কোম্পানী চায়না মার্চেন্ট হোল্ডিংস ইন্টারন্যাশনাল কোম্পানীর হাতে. আর এই পরিস্থিতি, বিগত বছর গুলিতে হতে থাকা অন্যান্য সমস্ত ঘটনার সঙ্গে একসাথে, যেমন, পাকিস্তানের গোয়াদার বন্দরের পরিচালনার ভার বেশ কয়েকটি চিনের কোম্পানীর হাতে ছেড়ে দেওয়া, যাদের মধ্যে সেই চায়না মার্চেন্ট রয়েছে, শ্রীলঙ্কাতেই চিনের সহায়তা নিয়ে খামবানতোতা বন্দরের চালু হওয়া, নেপালে লার্চা “শুকনো বন্দরের” তৈরী হওয়া ও আরও অন্যান্য ঘটনা, ভারতকে এমন রকমের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে যে, তা একেবারেই লুকিয়ে রাখা যেতে পারে না. ভারত চিনের পক্ষ থেকে এই সব কাজের মধ্যে বেজিংয়ের ভারত মহাসাগরীয় এলাকায় নিজেদের স্ট্র্যাটেজিক পথ ধরেই চলাকে দেখতে পেয়েছে – এই স্ট্র্যাটেজি ইংরাজী ভাষার লেখালেখি থেকে নাম দেওয়া হয়েছে “মুক্তামালা” বলে”.

শ্রীলঙ্কার সরকারি লোকরা, অবশ্য সত্য যে, চেষ্টা করছিলেন নিজেদের উত্তরে প্রতিবেশীদের আশঙ্কাকে কম করার জন্যই. শ্রীলঙ্কার বন্দর নিয়ন্ত্রণ সংস্থার প্রধান প্রিয়থ বন্দু উইক্রামা যেমন বলেছেন যে, দেশের একটি বন্দরও কোনদিন সামরিক উদ্দেশ্য নিয়ে ব্যবহার করা হবে না. তিনি এরই সঙ্গে যোগ করেছেন যে, ভারতের এত কাছে এই ধরনের একটি গভীর সমুদ্র বন্দর থাকলে তা ভারতের লোকদের জন্যই লাভজনক হবে: বড় দৈত্যাকার জাহাজে করে কন্টেনার পাঠানোর জন্য এবারে আর ভারত থেকে দুবাই অথবা সিঙ্গাপুরে পাঠাতে হবে না. এই প্রসঙ্গে ভলখোনস্কি তাই বলেছেন:

“প্রসঙ্গতঃ, জানাই রয়েছে যে, আধুনিক বিশ্বে অর্থনীতিকে বৃহত্ রাজনীতির সঙ্গে আলাদা করে দেখা যেতে পারে না. আর যদিও চিনের পক্ষ থেকে নেওয়া এই “মুক্তামালা” নীতি বাইরের থেকে দেখলে প্রাথমিকভাবে নিজেদের অর্থনৈতিক বিকাশের জন্যই নেওয়া হয়েছে বলে মনে হতে পারে – সামুদ্রিক পরিবহনে নিরাপত্তার জন্যই, তার জন্য বন্দরের পরিকাঠামো তৈরী করার কারণে ইত্যাদি – তবুও তাদের সুদূর প্রসারিত পরিকল্পনা একই রকম ভাবে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে. এটা হল নিজেদের ভূ-রাজনৈতিক প্রভাবকে প্রশান্ত মহাসাগর থেকে আফ্রিকা অবধি বিশাল এলাকা জুড়েই বিস্তার করা”.

দেখাই যাচ্ছে যে, কলম্বো বন্দরের নতুন টার্মিনাল, চিনা স্ট্র্যাটেজি নির্মাতাদের কল্পনা অনুযায়ী এই শৃঙ্খলেরই এক গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হতে চলেছে.