তেলেঙ্গানা আলাদা রাজ্য হিসাবে সৃষ্টির আন্দোলন শুর হয়েছিল বেশ কিছু দশক আগে আর তা চলছিল পরিবর্তন হতে থাকা সাফল্যের মধ্যেই, প্রায়ই অন্ধ্রের ঐক্য পক্ষের লোকদের সঙ্গে আলাদা হয়ে যেতে চাওয়া লোকদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী লড়াই বাঁধতো. আর শেষমেষ ভারত সরকার ২০০৯ সালে সহমত দিয়েছিল আলাদা এক রাজ্য সৃষ্টি করার জন্য, তবে তার জন্য শর্ত ছিল যে, বেশ কিছু বছর ধরেই অন্তর্বর্তী সময়ে হায়দ্রাবাদ তেলেঙ্গানা ও অন্ধ্রপ্রদেশ দুই রাজ্যের জন্যই রাজধানী হিসাবে থাকবে.

এখন এই উদ্যোগ সরকারের সিদ্ধান্তের চেহারা নিয়েছে, যা বাস্তবায়নের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা ধার্য করা হচ্ছে. অন্ধ্র প্রদেশ রাজ্যের বিধানসভা ও রাজ্যসভা নিজেদের এই প্রসঙ্গে মতামত এখনও জানাবে, কিন্তু বেশীর ভাগ রাজনীতিবিদরা সন্দেহ করছেন না যে, কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্তকেই সমর্থন জানানো হবে, এই কথা উল্লেখ করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“বেশীর ভাগ বিশ্লেষকদের মতে ঠিক এই সময়েই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এই জন্যে যে, ক্ষমতাসীন ইউপিএ জোট লোকসভা নির্বাচনের আগে এই রাজ্যের এলাকাকেই খণ্ডিত করতে চায়, যা আগামীর বছরের শুরুতে হওয়ার কথা রয়েছে. ঐক্যবদ্ধ অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্যে ক্ষমতাসীন জোট ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃত্বে খুব একটা কম ঝামেলার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে না, তাই তারা ঠিক করেছে আঞ্চলিক বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দিকে একটা ঘুষ ছুঁড়ে দেবে, আর এটা খুবই বোধগম্য পদক্ষেপ”.

কিন্তু এই সিদ্ধান্ত কংগ্রেসের বিরুদ্ধেই উল্টো এসে আঘাত করেছে – প্রতিবাদ হিসাবে অন্ধ্রের বেশ কয়েকজন দলের থেকে নির্বাচিত পার্লামেন্ট সদস্য পদত্যাগ করেছেন.

নেওয়া সিদ্ধান্তের সঙ্গে দলের ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি মোটেও শুধু জোড়া নেই, বরং এবারে ডোমিনো খেলার মতো একেএকে দেশের অন্যান্য রাজ্য গুলিতেও এই বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখতে পাওয়া যাবে, আর এটা দেশের ঐক্যবদ্ধ থাকার বিষয়েই একটা হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে.

রাজনীতিবিদরা হিসাব করে দেখেছেন যে, যদি সমস্ত আলাদা হতে চাওয়ার দাবী মেনে নেওয়া হয়, তবে ভারতে কম করে হলেও পঞ্চাশটি রাজ্য থাকবে, তাই ভলখোনস্কি বলেছেন:

“কিন্তু একটা মূল পার্থক্য থাকছে. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একটি রাজ্যও প্রজাতি বা ধর্ম ভিত্তিক ভাবে তৈরী হয় নি, আর ভারতে এটাই বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের জন্য প্রধান হয়েছে. এখানে বলা যেতে পারে যে, সাধারণতঃ অত্যাচারিত সংখ্যালঘুদের অনুভূতিকে ব্যবহার করে প্রায় কখনোই তা এই সংখ্যালঘুদের উপকারের জন্য কিছু করার জন্য হয় না, তা শুধু স্থানীয় উচ্চ কোটির লোকদের কাজেই লেগে থাকে. তারা এটাকে ব্যবহার করে নিজেরা হাতে ক্ষমতা ও আর্থিক প্রবাহকে ভাগ করার সুবিধা নিয়ে থাকে. আর সারা দেশের স্তরে এই রকম হতে থাকলে, সেই বহুত্ব, যা আপাততঃ ঐক্যের ভিত্তি হয়েছে, তা এতটাই বেড়ে যেতে পারে যে, রাষ্ট্রের এই সঙ্ঘবদ্ধ বুনোট ছিঁড়ে যেতে পারে.

আর সবচেয়ে বিপজ্জনক যা হল, তা এই সিদ্ধান্তের পরে যারা সবার আগে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, সেই পশ্চিমবঙ্গের ও আসানের গোর্খাল্যান্ড ও বোড়োল্যাণ্ড দাবী আন্দোলনের লোকরাই, আর তারা এখানে ভারতের উত্তর পূর্বের রাজ্য গুলির সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের যোগাযোগের সবচেয়ে সরু গলার মতো জায়গাটাকেই আলাদা করে নিজেদের করে নিতে চাইছে”.

এই এলাকার নীতিগত চরিত্রের কথা বিচারে আনলে, বিগত কয়েক বছর ধরে চিনের ঘাঁটিতে পরিণত হওয়া নেপালের নৈকট্য দেখলে এবং চিন যে এলাকার উপরে দাবী করে চলেছে, সেই অরুণাচল প্রদেশ রাজ্যের পাশেই থাকাকে খেয়াল করলে, বলা যেতে পারে যে, যা আজ ভারতের একটা আলাদা রাজ্যের জন্য সিদ্ধান্ত হিসাবে নেওয়া হল, তা এই রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতাবাদের যুগে সারা ভারতের জন্যেই বহু দূর যাওয়ার মতো পরিণাম নিয়ে আসতে পারে.