কিন্তু এই আদালতের রায়ের ফলে পরিণাম হতে পারে পূর্বাভাসের অযোগ্য এবং তা শুধু উল্টো দিকে ঠিকরে এসে বর্তমানের সরকারকেই শুধু নয়, বরং বাংলাদেশের সমগ্র সাংবিধানিক কাঠামোর উপরেই আঘাত হানতে পারে, এই রকম মনে করেছেন রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি.

২০০৮ সালের নির্বাচনে অংশ নিতে গিয়েই আওয়ামী লীগের নেত্রী ও বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি মুজিবর রহমানের কন্যা শেখ হাসিনা আশ্বাস দিয়েছিলেন যে, তিনি ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ের সমস্ত গণহত্যাকারী, ধর্ষক ও লুন্ঠনকারীদের আদালতে তোলার ব্যবস্থা করবেন. ২০১০ সালে তৈরী হয়েছিল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল, আর এই বছরের শুরু থেকে বেশ কয়েকজন লোককে মৃত্যুদণ্ড ও দীর্ঘ সময়ের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে ৪০ বছরেরও আগে করা অপরাধের জন্য.

এখানে হঠাত্ বলে সেই কারণকে মনে করা যায় না যে, এই সমস্ত লোক, যাদের রায় হয়েছে, তাদের মধ্যে মুখ্যতঃ ছিল জামাত দলের সদস্যরা – এই দলই স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ে পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছিল, তারা চেয়েছিল পূর্ব পাকিস্তান থাকুক, সেই সময়ে বাংলাদেশকে এই নামেই ডাকা হতো, আর তা ছিল পাকিস্তানের অংশ মাত্র.

বোঝাই যাচ্ছে যে, সেই ধরনের কঠিন অপরাধ – যেমন গণহত্যা, জাতি হনন ও ধর্ষণের জন্য কোন রকমের মেয়াদ থাকতে পারে না. তাই শুধু আইনের চোখ থেকে দেখলে এই ট্রাইব্যুনাল তৈরী করার সম্বন্ধে কোন রকমের সন্দেহ থাকতে পারে না. কিন্তু অন্য ধরনের অনেক প্রশ্ন উদ্ভব হয়, এই রকম মনে করে বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“যেমন, ধরা যাক এই ট্রাইব্যুনাল তৈরী করে বাংলাদেশের সরকার একে “আন্তর্জাতিক” নাম দিয়ে সমস্ত বিশ্ব সমাজের এর কাজ কর্ম যাতে স্বচ্ছ হয়, তা নিয়ে করা সমস্ত আহ্বানকেই তুচ্ছ করেছে, আর এটা সঙ্গে সঙ্গেই বর্তমানের সমস্ত রায়ের আইন সম্মত হওয়ার উপরেই প্রশ্নের উদ্রেক করে”.

তার সঙ্গে ট্রাইব্যুনালের কাজকর্ম একেবারে শুরু থেকেই স্পষ্টই বর্তমানের সরকারের বিরোধীদের দিকে করা হয়েছে বলে দেখা গিয়েছিল. আদালতের রায়, যা বৃহস্পতিবারে দেওয়া হয়েছে, তা শুধু এই ধারণার ন্যায্য মনে করাকেই সমর্থন করে.

শেষে একটা প্রশ্নের উদয় হয়: কেন বাংলাদেশের সরকারের সক্রিয়তা এখনই এত বেড়ে গিয়েছে? জামাত দল স্বাধীনতা পাওয়ার কয়েক বছর পরেই নিষিদ্ধ হয়ে গিয়েছিল, যা তখন খুবই স্বাভাবিক ছিল. কিন্তু সত্তরের দশকের শেষ থেকেই এই দল আবার করে সক্রিয় রাজনীতিতে ফিরে এসেছিল, আর তাদের ঐক্যবদ্ধ পাকিস্তানের স্লোগান তখন একেবারেই বাস্তবতা হারিয়ে ফেলেছিল. এই প্রসঙ্গে ভলখোনস্কি বলেছেন:

“এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা দরকার বাংলাদেশের রাজনৈতিক জীবনের মধ্যেই. ২০১৪ সালের জানুয়ারী মাসে ঠিক হয়েছে সর্বজনীন নির্বাচন হবে, আর জুন- জুলাই মাসে স্থানীয় নির্বাচনে দেখতে পাওয়া গিয়েছে যে, ক্ষমতাসীন দলের সরকারে টিকে থাকাই কঠিন হবে. স্থানীয় নির্বাচনে বিরোধী পক্ষ জিতেছে, যাদের প্রধান দল হল বিএনপি, যাদের সঙ্গে জোটে এই জামাত দল ছিল. শেষ দলের নিষিদ্ধ হওয়া – এটা আরও একটা আঘাত সেই বিএনপি দলের উপরেই”.

মনে হতে পারে যে, সরকারের লক্ষ্য পূরণ হয়েছে – “রাজা তৈরী করার” এক প্রধান স্রষ্টাকে ক্ষেত্র থেকেই হঠিয়ে দেওয়া গিয়েছে. প্রসঙ্গতঃ, এই সাফল্য বর্তমানের সরকারের বিরুদ্ধেই ঘুরে আসতে পারে আঘাত হয়েই, এই রকম মনে করেন রুশ বিশেষজ্ঞ.

কারণ আদালতের রায় শেষ কথা নয়: জামাত এবারে, প্রথমতঃ এই রায়ের বিরুদ্ধে দেশের সুপ্রীম কোর্টে যেতে পারে (যা মনে হয় না যে, কিছু পাল্টে দেবে), আর দ্বিতীয়তঃ, এই দলের সনদের কিছু অংশ বদল করে এরা আবার রেজিস্ট্রেশন করে নিতে পারে. তবে এই কথা ঠিক যে, এই ক্ষেত্রে নির্বাচনের আগে এই প্রক্রিয়া শেষ করে ওঠা হয়তো সম্ভব হয়ে উঠবে না, তাই ভলখোনস্কি আবার বলেছেন:

“কিন্তু তার চেয়েও অনেক বিপজ্জনক হল এই ঘটনার অন্যান্য সম্ভাব্য বদলগুলি. যদিও বিগত নির্বাচনে জামাত দলের পক্ষে শতকরা চার ভাগের সামান্য বেশী ভোটই মাত্র পাওয়া সম্ভব হয়েছিল, তবুও এই দল আগের মতই গ্রামাঞ্চলে অনেক প্রভাব ফেলে রেখেছে ও প্রায় সময়েই দেশের রাজধানীতে ও অন্যান্য বড় শহরগুলিতে বহু সহস্র লোকের মিছিল ও জমায়েত আয়োজন করতে পেরেছে. এই ধরনের ঘটনা আদালতে বিচার শুরু হওয়ার পরে থেকেই দেখতে পাওয়া গিয়েছে, আর তার থেকে সন্দেহের অবকাশ থাকে না যে, এই দলের নিষিদ্ধ করে দেওয়া নিয়ে সদ্য দেওয়া রায়ের পরে তাদের রাস্তার সক্রিয়তা খালি বেড়েই যাবে”.

এটাই পূর্বাভাসের অযোগ্য পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে, হয় এই ঘটনা আরব বসন্তের পথেই যাবে, আর রাস্তার ঝড়ে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলি উড়ে যাবে. অথবা সরকার নিজেই বিক্ষোভের ভয়ে নির্বাচন বন্ধ রেখে স্বৈরাচারী শাসন শুরু করবে.

যাই হোক না কেন দেশের প্রশাসনের আইনের চোখে বৈধ হওয়া নিয়েই প্রশ্নের উদয় হতে পারে.