মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফোর্ট মিড সামরিক ঘাঁটিতে সামরিক ট্রাইব্যুনাল সৈনিক ব্র্যাডলি ম্যানিংকে নিয়ে মামলায় রায় দিয়েছে. উইকিলিক্স সাইটের মূল খবর দাতা, যে বহু লক্ষ গোপনীয় দলিল এই সাইটের লোকদের হাতে তুলে দিয়েছে, তাকে দোষী বলেই রায় দেওয়া হয়েছে, আর অভিযোগ প্রমাণিত বলে মেনে নেওয়া হয়েছে গুপ্তচর বৃত্তির জন্য, রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি চুরি করার জন্য, লোক ঠকানোর জন্য ও আদেশ না মানার জন্য. কিন্তু এখানে চাঞ্চল্যকর হয়েছে অন্য বিষয়: আদালত ম্যানিংকে তার বিরুদ্ধে প্রধান যে অভিযোগ করা হয়েছিল, অর্থাত্ শত্রুকে সহায়তা করা, সেই অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দিয়েছে. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে “রেডিও রাশিয়ার” সাংবাদিক রোমান মামোনভ এই সাড়া জাগানো প্রক্রিয়ার শেষের একটি অধ্যায়ের দিকে খেয়াল করছেন.

মেরিল্যান্ড রাজ্যের ফোর্ট মিড ঘাঁটির সামরিক ট্রাইব্যুনালের অধিবেশন অপেক্ষা করেছিলেন বহু শত সাংবাদিক, যারা এই সামরিক ঘাঁটির কাছে আসার রাস্তা গুলি প্রায় দখল করেই বসেছিলেন. তাদের সঙ্গেই ছিলেন আরও ডজন দুয়েক ম্যানিংয়ের সমর্থক, যারা হাতে “ম্যানিংয়ের মুক্তি চাই!”, “বাক্ স্বাধীনতাকে রক্ষা করবো!”, “ম্যানিং বিশ্বাসঘাতক নয়, বরং বীর!” ইত্যাদি লেখা প্ল্যাকার্ড নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন.

খুব কম লোকই সন্দেহ প্রকাশ করেছিল যে, এই রায় হবে দোষী সাব্যস্ত করেই. শুধু প্রশ্ন ছিল যে, রায় কতটা কঠোর হবে. আট সপ্তাহ ধরে বিচার চলার সময়ে সামরিক অভিশংসকরা চেষ্টা করেছিল বিচারককে বোঝানোর যে, ম্যানিং খুব ভাল করেই জানত: সেই সমস্ত গোপনীয় দলিল, যা সে উইকিলিক্স সাইটকে দিচ্ছে, তা সন্ত্রাসবাদীদের হাতে পড়তে পারে. আর তার মানে হল যে, প্রাইভেট ম্যানিং জেনেশুনেই শত্রুকে সহায়তা করেছে.

আর এখানেই মূল চমকপ্রদ ঘটনা ঘটেছে. বিচারপতি কর্নেল ডেনিস লিণ্ড (আর মনে করিয়ে দেবো যে, ম্যানিংয়ের অনুরোধ অনুযায়ী তার মামলা বিচার করেছেন একজন বিচারপতি, জ্যুরি বোর্ড নয়), ম্যানিংকে “শত্রুকে সহায়তা করা” প্রসঙ্গে বেকসুর খালাস করেছেন. এই অভিযোগ প্রমাণিত হলে, ম্যানিংকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগ করতে হত, কোন রকমের সময়ের আগেই ছাড়া পাওয়ার অধিকার না পেয়ে.

তাছাড়া, ম্যানিংয়ের উপর থেকে ২০০৭ সালে আমেরিকার অ্যাপাচে সামরিক হেলিকপ্টার থেকে ইরাকে গুলি চালনার ভিডিও প্রকাশ করার জন্য অভিযোগকেও মেনে নেওয়া হয়নি, এই গুলি চালনার ফলে রয়টার সংস্থার দুজন সাংবাদিক সমেত ১২ জন নিরীহ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল.

প্রসঙ্গতঃ, এটাই ম্যানিংয়ের অ্যাডভোকেটদের একমাত্র বিজয়, অন্যান্য কুড়িটির মতো অভিযোগের ক্ষেত্রে তার অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে বলে রায় দেওয়া হয়েছে. এই সব অভিযোগের ধারা গুলি গুরুতর: গোপনীয় দলিল চুরি, কম্পিউটার সংক্রান্ত লোক ঠকানো, আদেশ না মানা আর প্রধান, গুপ্তচর বৃত্তি. এই অভিযোগের সঙ্গে এক করা হয়েছে উইকিলিক্স সাইটকে গোপনীয় তথ্য দিয়ে দেওয়া. এই সাইটের স্রষ্টা – জুলিয়ান আসাঞ্জ – এই রায়কে ইতিমধ্যেই “গুপ্তচর সংস্থার তরফ থেকে চরমপন্থী কাজ ও সংবাদ মাধ্যমের উপরে আক্রমণ এবং বারাক ওবামার খ্যাতির অবসান” বলে ঘোষণা করেছেন. তিনি বলেছেন:

“মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এই প্রথম, যখন রাষ্ট্রীয় অপরাধ যে ধরিয়ে দিয়েছে, তাকে “গুপ্তচর বৃত্তির” অভিযোগে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে, কারণ সে সংবাদ মাধ্যমের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে. এটা খুবই গুরুতর ও বিপজ্জনক উদাহরণ. আর এটা শুধু ওবামার রাজনীতির একটা অংশ, যা খবর ফাঁস হয়ে যাওয়া ও যারা ধরিয়ে দিচ্ছে, তাদের সঙ্গে করা হচ্ছে. সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ওবামার লড়াইয়েরও এটা একটা অংশ. এর আগের সমস্ত রাষ্ট্রপতিদের একসাথে করা কাজের সঙ্গে তুলনা করলে, ওবামার প্রশাসন, যাঁরা দুর্নীতির কথা ফাঁস করে দিচ্ছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে গুপ্তচর বৃত্তির নামে সবচেয়ে বেশী সংখ্যক মামলা ও তদন্ত করেছে. এটা চরমপন্থার উদাহরণ, যা করা হচ্ছে রাষ্ট্রের নিরাপত্তার নামে”.

মনে করিয়ে দিই যে, ম্যানিং উইকিলিক্স সাইটকে সাত লক্ষের বেশী গোপনীয় দলিল দিয়েছিল. এই গুলি ইরাকে ও আফগানিস্তানে যুদ্ধের সময়ে বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে করা রিপোর্ট, কূটনৈতিক লেখালেখি ও গুয়ান্তানামো জেলে বন্দীদের বিবরণ. সৈনিক ম্যানিং জোর দিয়ে বলেছে যে, শুধু সেই বিষয় নিয়েই সত্য জানাতে চেয়েছিল যে, কি ভাবে সামরিক যুদ্ধের এলাকায় আমেরিকার লোকরা নিরীহ লোকদের জীবনকে তুচ্ছ করেই দেখে থাকে.