মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে আফগানিস্তানে সামরিক অপারেশনের সমর্থন দেশের লোকের সমর্থন হারিয়েছে রেকর্ড হওয়া নীচু স্তরে. “ওয়াশিংটন পোস্ট” আর টেলিভিশন চ্যানেল “এবিসি” সম্মিলিত ভাবে সামাজিক মতামত নিয়ে শেষ পাওয়া ফলে দেখতে পেয়েছে যে, শতকরা ২৮ ভাগ আমেরিকার লোকই মনে করেন যে, আফগানিস্তানে অপারেশন এতটাই গুরুত্বপূর্ণ, যে তা চালিয়ে যাওয়ার মানে হয়, আর ঠিক উল্টো রকমের ভাবছেন শতকরা ৬৭ ভাগ নাগরিক. বিষয় নিয়ে বিশদ করে বলেছেন আমাদের সমীক্ষক পিওতর গনচারভ.

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের করদাতাদের আফগান অপারেশন নিয়ে এই রকমের সন্দিহান হওয়া বোঝার জন্য কোন অসুবিধা হয় না. এই মিশনের খরচ প্রকাণ্ড আর পরিণতির দিকে তাকালে আপাততঃ কিছু নিয়েই তেমন গর্ব করার মতো নেই. এমন একটা ভাব তৈরী হয়েছে যে, যেন বারাক ওবামার প্রশাসন নিজেদের আফগানিস্তানের জন্য “নতুন স্ট্র্যাটেজি” ধরে রাখার পথ নির্দেশক সূত্রই হারিয়েছে. এখান থেকেই নানা রকমের পরস্পর বিরোধী ঘোষণা আর কাজ করা হচ্ছে, যা যেমন হয়েছে তালিবদের সঙ্গে আলোচনা করা নিয়ে, তেমনই শান্তি প্রশ্ন নিয়েও. খুব একটা হঠাত্ করেই বিগত সময়ে আফগান লোকদের একটা বড় অংশ আর ইউরোপের বিশেষজ্ঞরা বলছেন না যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আফগানিস্তানের রাজনীতি এবারে কানাগলিতে পৌঁছেছে. কিন্তু অন্য ধারণাও রয়েছে.

কাবুল বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক আইনের প্রফেসর ও রাজনীতিবিদ নাসরুল্লা স্তানাকজাই এই প্রসঙ্গে বলেছেন:

“মনে করি যে, এটা কোন কানাগলিতে পড়া নয়, আমেরিকা স্রেফ নিজেদের কৌশল পাল্টাচ্ছে. ওদের সঙ্গে এটা মেলে, তারা এই এলাকা ও বিশেষ করে আফগানিস্তানে আসার দিন থেকেই এই কাণ্ড করে চলেছে. এমন একটা সময় ছিল, যখন ওদের কাবুলের কারজাই প্রশাসনের সঙ্গে দহরম মহরম ছিল স্রেফ ভরসা করার মতো সম্পর্কের চেয়ে অনেক বেশী মাখামাখি করা. তারপরে এই সম্পর্ক কিছুটা ঠাণ্ডা হয়েছিল. পাকিস্তানের সঙ্গেও একই রকম করেছে বলা যেতে পারে. এই বারো বছর ধরে এই সব সম্পর্ক হঠাত্ করেই খুব উষ্ণ, তারপরে আবার ঠাণ্ডা আর পরে একেবারেই নির্বিকার হয়েছে. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্রেফ কোন আগে থেকে ঠিক করা পথ নেই. যদি এটাকে “কানাগলি” মনে করা হয়, তবে তার সঙ্গেই মেনে নিতে হবে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি এখানে হার মেনেছে”.

অন্য কথায় বলতে হলে, খুবই নির্বোধের মত সেই সমস্ত লোকদের কোন একটা নির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই বলে অভিযোগ করা হয়ে যাবে, যাদের নীতিই হল দায়িত্ব নিয়ে করতে হবে এমন কোন একটা নির্দিষ্ট পরিকল্পনাকেই সব সময়ে এড়িয়ে যাওয়া. সেই রকমই এক সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সম্ভাবনা ছিল, ইচ্ছা থাকলে বন- ১ সম্মেলনে তালিবদের ডেকে আনার, যার ফলে সশস্ত্র বিরোধীদের সঙ্গে আলোচনা করা সহজ হত. কিন্তু তারা এটা করে নি. এবারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের সঙ্গে জুটে ইউরোপ চেষ্টা করছে বেশী করেই তালিবদের দিকে ঘুরে বসতে আর অন্যান্য সশস্ত্র বিরোধীদেরও কাছে টানতে. কেমন যেন একটা সেই কনফুশিয়সের নীতির মতই: কানাগলিতে আটকে গিয়েছ – পথের শুরুতে আবার করে ফিরে এসো. এটা ঠিক সেই ধরনের কৌশল কি? এই প্রশ্নই করা হয়েছিল প্রফেসর স্তানাকজাইকে, উত্তরে তিনি বলেছেন:

“হ্যাঁ, এটা সেই কৌশলই. যদি বন-১ সম্মেলনে তালিব ও গোলবেদ্দীন হেকমতিয়ারকে আমন্ত্রণ করা হত, আর আফগানিস্তানে শান্তি ফিরে আসত, তবে আন্তর্জাতিক জোট আর তার সম্বন্ধে সমগ্র আন্তর্জাতিক সমর্থনের ব্যাপারটা হত একটা স্বল্প সময়ের মিশন মাত্র. কিন্তু পশ্চিম, আর তাতে প্রাথমিক ভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, তখন চায় নি তালিবদের বন সম্মেলনে থাকাকে, যাতে তাদের ক্ষমতার লড়াইতে পাশে সরিয়ে রাখা সম্ভব হয়. কিন্তু তাদের পরিকল্পনা বেশী দূর যেতে পারে নি. তাই কাতার রাষ্ট্রে তালিবদের পতাকা দিয়ে প্রতিনিধি দপ্তর খোলা, আবার সেটাকে হঠিয়ে দেওয়া, এটা সেই নীতিরই - একটা প্রমাণ. যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তালিবদের পোষ মানাতে পারত, আর তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারত, পাকিস্তানের উপরে চাপ সৃষ্টি করতে পারত – তবে আফগানিস্তানে তালিবদের উপস্থিতি দেখবার মতো করেই কমে থাকত. কিন্তু এটা হয়ও নি আর হচ্ছেও না”.

তালিবরা ইতিমধ্যেই দেখিয়ে দিয়েছে যে, দোহাতে, তাদের দেওয়া জায়গায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা তারা করতে তৈরী আছে শুধু একমাত্র নিজেদের “ঐস্লামিক আমীরশাহী আফগানিস্তানের” পতাকার নীচে বসেই. এই “ঐস্লামিক আমীরশাহী” সরকারি ভাবে কাবুলের জন্য কতটা বিপজ্জনক অথবা আফগানিস্তানের বর্তমানের রাষ্ট্র ব্যবস্থার জন্য, আর পশ্চিমের সাহায্য ছাড়া আফগানিস্তানের সামরিক বাহিনী ও পুলিশ বাহিনী একা তৈরী আছে কি না বর্তমানের প্রশাসনকে রক্ষা করার জন্য, সেই প্রশ্নের উত্তরে প্রফেসর স্তানাকজাই বলেছেন:

“আমি যতদূর জানি, আফগানিস্তানের জনগন, দেশের নেতৃত্ব ও আন্তর্জাতিক সমাজ সেই জন্যই কাজ করছে, যাতে বর্তমানের প্রশাসনের উদ্যোগেই এই সব আলোচনা সম্ভবপর হয়, যাতে বর্তমানের সংবিধানকে স্বীকার করা হয়, যেখানে দেশের আইন সঙ্গত থাকা নিয়ে লেখা রয়েছে, যার সরকারি ভাবে স্বীকৃত নাম “ঐস্লামিক প্রজাতন্ত্র আফগানিস্তান”. এই প্রশ্নের দ্বিতীয় অংশ নিয়ে যা বলা যেতে পারে, তা হল যে, যদি পাকিস্তান, ইরান ও অন্যান্য প্রতিবেশী দেশ আমাদের বিষয়ে নাক না গলায়, তবে আমাদের সামরিক বাহিনী ও আমাদের পুলিশ বাহিনী এই বারো বছর ধরে অর্জিত সমস্ত রকমের সম্পদকেই রক্ষা করতে সক্ষম হবে”.

আগে থেকেই বলে দেওয়া যেতে পারে যে, প্রতিবেশীরা হস্তক্ষেপ করবেই – তা কোন না কোন একটা মাত্রা পর্যন্ত. তাই সম্ভাব্য ঘটনা পরম্পরা একেবারেই নানারকমের হতে পারে. দোহা শহরে “কাবুল – তালিবদের” আলোচনা, যা সম্ভবপর হয় নি, তা থেকে খালি নানা রকমের চক্রান্তই জমা হয়েছে এই পরিস্থিতিতে. এখন আবার করে বলা হচ্ছে কাতারের রাজধানীতে প্রতিনিধি দপ্তর খোলার কথা. এবারে তাহলে তালিবরা কি অবস্থান নেবে? আর যদি – আগের বারের মতই হয় – তবে কাবুল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই প্রসঙ্গে কি উত্তর দেবে?