ঠিক পঁচিশ বছর আগে যুদ্ধ প্রহরায় নিযুক্ত করা হয়েছিল সোভিয়েত আন্তর্মহাদেশীয় ব্যালিস্টিক রকেট “আর-৩৬এম২” – “ছত্রপতি”. নিজের ধ্বংসের ক্ষমতায় সবচেয়ে শক্তিশালী ও যে কোন ধরনের রকেট প্রতিরোধ ব্যবস্থা পার হয়ে যাওয়ার বিরল সম্ভাবনা সমেত এই রকেট ছিল ঠাণ্ডা যুদ্ধের সময়ের এক প্রখ্যাত অস্ত্র. এই রকেট কমপ্লেক্স, পারমাণবিক প্রতিরোধ ব্যবস্থায় কি ভূমিকা পালন করেছিল আর তার জায়গা নিতে এখন কি রাখা হতে চলেছে, তা নিয়ে “রেডিও রাশিয়াকে” বলেছেন বিশেষজ্ঞরা.

“আর-৩৬এম২” রকেট ন্যাটো শ্রেনী বিভাগ অনুযায়ী খুবই ভয় দেখানোর মত নাম পেয়েছিল – “শয়তান”. অস্ত্র প্রতিযোগিতা, সোভিয়েত দেশ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরস্পর বিরোধীতার সমস্ত সময় ধরেই খুব কম ভয়ঙ্কর অস্ত্রের উদ্ভব করে নি, এমনকি বিশ্বের মহাসমুদ্রের গভীরেও খুবই জায়গার অভাব দেখা গিয়েছিল পারমাণবিক ডুবোজাহাজের চলাচলের জন্য, যেগুলি একেবারে আক্ষরিক অর্থেই প্রচুর পারমাণবিক রকেট নিয়ে চলাফেরা করেছিল, আর বলা যেতে পারে একেবারে রকেটের “কাঠগড়া” তৈরী করে দিয়েছিল অতলান্তিকের দুই পাশেই. ধীরে হলেও এই অস্ত্র প্রতিযোগিতা শেষ অবধি মহাকাশেও পৌঁছেছিল.

“রেডিও রাশিয়াকে” স্ট্র্যাটেজিক সংজ্ঞাবহ রকেট বাহিনীর সদর দপ্তরের প্রাক্তন প্রধান ভিক্টর এসিন যেমন বলেছেন যে, আমেরিকার “স্টার ওয়ার্সের” ধারণা, যদিও একটা মিথ্যা প্ররোচনা ছিল, তবুও তার জন্য একেবারেই বাস্তব প্রত্যুত্তর পেতে বাধ্য করেছিল, তিনি বলেছেন:

““ছত্রপতি” রকেট কমপ্লেক্স তৈরীর সিদ্ধান্ত সেই সময়েই নেওয়া হয়েছিল, যখন মার্কিন রাষ্ট্রপতি রোনাল্ড রেগান ঘোষণা করেছিলেন “স্ট্র্যাটেজিক প্রতিরক্ষা উদ্যোগ” গঠনের কথা, (যেটাকে তখন কথ্য ভাষায় বলা হয়েছিল “স্টার ওয়ার্স” বলে). এই বহু প্রসারিত ও গভীর অবধি সারি দিয়ে সাজানো রকেট প্রতিরোধ ব্যবস্থা, যার আঘাত হানার ব্যবস্থা করা হবে বলা হয়েছিল মহাকাশ থেকেই. সেই ধরনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে সম্ভাব্য উপায়ে ভেদ করার জন্যই দরকার পড়েছিল এমন এক রকেট কমপ্লেক্সের, যা বিশাল ওজনের ব্যবহার যোগ্য অস্ত্রকে কক্ষপথে পৌঁছে দিতে সক্ষম”.

“ছত্রপতি” কমপ্লেক্সের প্রধান সুবিধা ছিল, তার ওজন নেওয়ার ক্ষমতা. সম্ভাব্য প্রতিপক্ষের এলাকায় এক সঙ্গে বেশ কয়েকটি যুদ্ধাস্ত্র পৌঁছে দেওয়ার ক্ষমতা সমেত এই কমপ্লেক্স কোন রকমের রকেট প্রতিরোধ ব্যবস্থার জন্যই কোন রকমের আটকানোর সুযোগ রাখে নি, এই কথা উল্লেখ করে ভিক্টর এসিন বলেছেন:

“এর প্রধান সুবিধা ছিল যে, এই কমপ্লেক্সের প্রায় নয় টন ওজন নেওয়ার ক্ষমতা ছিল. এই রকমের ওজন নেওয়ার ক্ষমতা, সেই সময়ে আমেরিকার সর্বাধুনিক রকেট কমপ্লেক্স “এমএক্স” এর চেয়ে দ্বিগুণ ছিল. এই রকমের ওজন নিতে পারতো বলে, তার মধ্যে অনেক সংখ্যায় যুদ্ধাস্ত্র ও খুবই শক্তিশালী রকেট প্রতিরোধ ব্যবস্থা এড়ানোর যন্ত্রপাতি ভর্তি করে দেওয়া যেত. তার ওপরে, এই রকেটের বাইরের খোলও শক্ত করে দেওয়ার ব্যবস্থা হয়েছিল, যার ফলে রকেট প্রতিরোধ ব্যবস্থার আঘাত করার অস্ত্রের ক্ষমতাও হ্রাস করা সম্ভব হয়েছিল”.

তার মধ্যে আবার এই ছত্রপতি রকেটের একটা খুঁত রয়েছে. এই রকেট কোন স্থায়ী জায়গা থেকেই উড়ান করানো সম্ভব. এই তথ্য রকেট কমপ্লেক্সের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া সম্ভাবনাকেই বৃদ্ধি করে. আর এই ধরনের বিপর্যয় ঘটানোর মতো শক্তি সমেত প্রতিরোধের অস্ত্রেরও বর্তমানে আর প্রয়োজন নেই, এই রকম একটা বিশ্বাস নিয়েই সামাজিক-রাজনৈতিক গবেষণা কেন্দ্রের ডিরেক্টর ভ্লাদিমির ইভসেয়েভ বলেছেন:

“সেই সময়, যখন এই ধরনের ভারী রকেটের প্রয়োজন পড়ত, তা চলে গিয়েছে. এখন প্রয়োজন নতুন ধরনের রকেট, যে গুলি উড়ান শুরুর সময়ে কম ওজনের হবে, আর তাই, তাতে যুদ্ধাস্ত্রের সংখ্যাও থাকবে কম, কিন্তু সেই গুলিকে পারমাণবিক অস্ত্র কম করার বর্তমানের ধারণার সঙ্গেও সম্পূর্ণ ভাবে মিলতে হবে”.

এখন “ছত্রপতি” কমপ্লেক্সের রকেট ধীরেধীরে যুদ্ধ প্রহরা থেকে কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে. তারই মধ্যে রাশিয়া ভারী আন্তর্মহাদেশীয় ব্যালিস্টিক রকেট আয়ত্ত্বে রাখা থেকে সরে যায় নি. ভ্লাদিমির ইভসেয়েভ এই প্রসঙ্গে যেমন উল্লেখ করেছেন যে, আগামী দশকে এই “ছত্রপতি” রকেট কমপ্লেক্সের যুদ্ধ প্রহরার জায়গা দখল করবে নতুন কমপ্লেক্স “সারমাত”.