ইরান ও লেবাননের “হেজবোল্লা” সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্যালেস্টাইনের “হামাস” গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক পুনরুদ্ধার করার, আর তারই সঙ্গে তাদের অর্থনৈতিক সহায়তা দেওয়া. এর কারণ কি? কি বদল হয়েছে – অথবা কি বদলে যাওয়া উচিত্?

ভ্লাদিমির সাঝিনের মন্তব্য দেওয়া হল.

নিকটপ্রাচ্যে সমস্ত কিছুই ঘুলিয়ে গিয়েছে. প্রত্যেক দিনই পরিস্থিতি বদল হচ্ছে. ইজিপ্টে এখন প্রশাসনে আর “মুসলমান ভাইয়েরা” নেই, রয়েছে সামরিক বাহিনীর লোকরা. সিরিয়াতে – সরকারি ফৌজের সাফল্য কাতার ও সৌদী আরবের সঙ্গে ইউরোপীয় সঙ্ঘ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকেও সম্পূর্ণ রকমের বিব্রত অবস্থার মধ্যেই ফেলে রেখেছে. সিরিয়ার জঙ্গীদের মধ্যেও কট্টরপন্থী ঐস্লামিকদের গোষ্ঠী ধীরেধীরে নিজেদের বেশী মর্যাদাময় সহযোগী “সিরিয়ার মুক্তি বাহিনীর” হাত থেকে উদ্যোগ কেড়ে নিচ্ছে – এটাও পশ্চিমের পক্ষে খুবই বিব্রত হওয়ার কারণ হয়েছে. তুরস্কের প্রশাসন সিরিয়ার সমস্যা, কুর্দ গোষ্ঠীর সমস্যা (তা যেমন নিজেদের দেশে, তেমনই ইরাকে ও সিরিয়াতেও) আবার নিজেদের দেশের ভিতরেই প্রশাসন বিরোধী বিক্ষোভের মধ্যে পড়ে দিগভ্রান্ত হয়ে যাচ্ছে. সুন্নী যোদ্ধাদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ও তাদের মধ্যে আবার “মুসলমান ভাইদের” আর “হামাস” গোষ্ঠীর জন্যেও যিনি ছিলেন, সেই কাতারের আমীর শেখ হামাদ নিজের জায়গা ছেলে শেখ তামিমের হাতে ছেড়ে দিয়েছেন, যিনি দেশের আভ্যন্তরীণ সমস্যা ও অর্থনৈতিক সমস্যার দিকেই বেশী করে মন দিচ্ছেন.

এই রকমের একটা পরিস্থিতিতে “হামাস” গোষ্ঠীকে আবার করে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে তেহরান, যারা গত বছরে সিরিয়ার কারণেই তাদের সঙ্গে ঝগড়া করেছিল, কিন্তু কেন?

বর্তমানের এই "সকলের বিরুদ্ধেই সকলের" যুদ্ধে ইরানের ভরসা করার মতো সহযোগীর সংখ্যা কম. তাদের মধ্যে প্রথম – বাশার আসাদ – যিনি নিজেই বর্তমানে দেশে গৃহযুদ্ধে ডুবে রয়েছেন ও ইরানের লোকদের জন্য তিনি এখন কোন রকমের সহায়ক নন. আসাদের প্রশাসন নিজেই সহায়তার প্রয়োজন বোধ করছে. তেহরানের আরও এক বহুদিনের সহযোগী – লেবাননের “হেজবোল্লা” গোষ্ঠী - নিজেরাও এখন সিরিয়াতে নিজেদের হাত বাঁধা রেখেছে: তারা সক্রিয়ভাবে সিরিয়ার বিরোধে জড়িয়ে পড়েছে, আর এরই সঙ্গে লেবাননে তাদের উপরে খুবই গুরুতর চাপ দেওয়া হচ্ছে.

তেহরানের আবার করে “হামাস” গোষ্ঠীর দিকে ফেরার দরকার পড়েছে – যারা আগে প্যালেস্টাইনে ইরানের রাজনীতি করেছে ও ইজরায়েলকে চাপে রাখার প্রধান অস্ত্র হয়েছে. তার ওপরে, এই অস্ত্র বর্তমানে কাতারে যা ঘটেছে, তার জন্য কর্তৃপক্ষকেই হারিয়েছে. ঐস্লামিক প্রজাতন্ত্র ইরানের পররাষ্ট্র দপ্তরের তথ্য সচিব আব্বাস আরাকচি কয়েকদিন আগে ঘোষণা করেছেন যে, তেহরান “হামাস” গোষ্ঠীর সঙ্গে বিরোধ মিটিয়ে ফেলতে ইচ্ছা প্রকাশ করেছে. “হামাস” গোষ্ঠীর গাজা সেক্টরের নেতৃত্বের প্রতিনিধি সালাখ আল-বার্দাভিল উত্তর দিয়েছেন যে, গোষ্ঠী ইরানের সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়েছে. আল-বার্দাভিল বলেছেন যে, “হামাস” তৈরী রয়েছে যে কোন আরব ও ঐস্লামিক দেশের সঙ্গে ভাল সম্পর্ক রাখার জন্য, যারা প্যালেস্টাইনের লোকদের প্রতিরক্ষার স্বপক্ষে.

“আশ-শার্ক আল-আউসাত” নামের পত্রিকা জোর দিয়ে বলেছে যে, গত মাসেই “হামাস” গোষ্ঠীর দুই প্রতিনিধি বেইরুটে ইরানের দূতাবাসে “হেজবোল্লা” গোষ্ঠীর সদস্যদের সঙ্গে দেখা করেছে. এই সাক্ষাত্কারে নাকি “হামাস” গোষ্ঠীর এক নেতা মুসা আবু-মারজুক উপস্থিত ছিলেন. এখানে কথা হয়েছে প্যালেস্টাইনের গোষ্ঠীর জন্য ইরানের পক্ষ থেকে সাহায্য বাড়ানোর.

“হামাস” গোষ্ঠীর এক স্থপতি আখমাদ ইউসুফ সেই “আশ-শার্ক আল-আউসাত” কাগজেই ঘোষণা করেছেন যে, ইরানের সঙ্গে বিরোধ শীঘ্রই সমাধান হয়ে যাবে, আর ইরানের পক্ষ থেকে প্যালেস্টাইনের লোকদের সহায়তা সম্পূর্ণ পরিমানেই আবার দেওয়া শুরু হবে. মনে করিয়ে দিই যে, বিশ্বের সংবাদ মাধ্যমে যে তথ্য দেওয়া হয়েছিল, তাতে ইরান প্রতি মাসে “হামাস” গোষ্ঠীকে ২কোটি ডলার সাহায্য দিত ও অস্ত্র সরবরাহ করত.

অর্থাত্ তেহরান ও “হামাসের” মূল যুক্ত হওয়ার বিন্দু – এটা সকলেরই ইজরায়েলকে মেনে নেওয়ার অক্ষমতা. আর এটা যেমন ইরানের, তেমনই “হামাসের” জন্যও এখন গুরুত্বপূর্ণ, যখন ইজরায়েল ও প্যালেস্টাইনের মধ্যে যোগাযোগ আবার করে বহাল হয়েছে, যার বিরুদ্ধে খুবই জোর দিয়ে যেমন ইরান তেমনই “হামাস” গোষ্ঠী সব সময়ে বলেছে. “হামাস” গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগ দিয়ে ইরানের লোকদের মনে আশা জেগেছে যে, এবারে সিরিয়ার কট্টরপন্থী সুন্নী মুসলমান জঙ্গীদের মনোযোগ সিরিয়া থেকে ঘুরিয়ে ইজরায়েলের দিকে করা সম্ভব হবে (তার মানে হল ইরানের দিক থেকেও ঘুরিয়ে দিয়ে). এই প্রসঙ্গে রাশিয়ার সামাজিক-রাজনৈতিক গবেষণা কেন্দ্রের ডিরেক্টর ভ্লাদিমির ইভসেয়েভ বলেছেন:

“এই বিষয়ে আবার “হামাস” গোষ্ঠীর ভিতরেই অবস্থা খুবই জটিল. ইজিপ্টে রাষ্ট্রপতি মুর্সির প্রশাসনের পতন ও কাতারের নতুন আমীরের “হামাস” গোষ্ঠীর উপরে কোন আগ্রহ না থাকা এই সংগঠনের উপরে খুবই কড়া আঘাত করেছে. আর ইজিপ্টের সামরিক বাহিনীর লোকরা “হামাস” গোষ্ঠীকে বলেছে সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠী, তাই সিনাই উপদ্বীপ এলাকায় শতকরা ৮০ ভাগ টানেল ধ্বংস করে দিয়েছে – যা দিয়ে মূলতঃ বেআইনি ভাবে মাল যাতায়াত করত. যা দিয়ে ইজরায়েলের তরফ থেকে অবরোধের সময়ে গাজা এলাকার প্যালেস্টাইনের লোকরা নিজেদের সমস্ত কাজ চালাত”.

এখানে যোগ করব যে, গাজার অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী কয়েকদিন আগে এই টানেল ধ্বংস করে দেওয়াতে গাজার অর্থনীতি ৩২ কোটি ডলারের ক্ষতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে. “হামাস” গোষ্ঠীর প্রতিনিধি সামি আবু জোহরি খুবই দুঃখের সঙ্গে উল্লেখ করেছেন যে, মুবারকের সময়ে পরিস্থিতি ভাল ছিল. এখন ইরানের সঙ্গে জোট – একমাত্র উপায়, যাতে সংগঠনকে বাঁচানো যায়, যে সংগঠন নিজেদের উপরে গাজা সেক্টরে থাকা পনেরো লক্ষ প্যালেস্তিনীয় লোকদের দায়িত্ব নিয়ে আছে.

ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ আবার করে হলে, তার ফলে “হামাসের” কি ধরনের পরিণতি হবে, তা আসন্ন ভবিষ্যতই বলে দেবে. কিভাবে পরিস্থিতি বদলাবে, আপাততঃ বিচার করা কঠিন – অনেক রকমের একে অপরের উপরে চাপিয়ে দেওয়া কারণ আছে, অনেক বেশী রকমের অনিশ্চয়তা ও পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব নয়, এমন ঘটনা পরম্পরা ও ক্রীড়নকদের কাজ হতেই পারে. কিন্তু একটা বিষয়ে সন্দেহ নেই যে, এই পরিস্থিতির বদল হবেই, আর তা হবে একেবারে অনেকটাই.