পাকিস্তানের নির্বাচনী মণ্ডল ৩০শে জুলাই নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে চলেছে, যা বর্তমানের রাষ্ট্র অধিনায়ক আসিফ আলি জারদারির জায়গায় নতুন ব্যক্তি বসাবে. এই পদের জন্য কুড়ি জনেরও বেশী ব্যক্তি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, তবে কেউই সন্দেহ প্রকাশ করছেন না যে, মুসলিম লীগ (ন) থেকে প্রার্থী মামনুন হুসেইন এবারে জিতে যাবেন. তাঁর নির্বাচনই হবে নতুন প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফের হাতে দেশের শাসনের সমস্ত ক্ষমতা একজোট হওয়ার শেষ পদক্ষেপ. এই বিষয়ে সমীক্ষক সের্গেই তোমিন বলেছেন:

“পাকিস্তানে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন, পার্লামেন্ট নির্বাচনের আড়াই মাস পরে হতে চলেছে – যা দেশের ইতিহাসে প্রথম এক নির্বাচন হবে, যা একটি অসামরিক প্রশাসনের হাত থেকে শাসনভার, অন্য একটি অসামরিক প্রশাসনের হাতে তুলে দিচ্ছে. মে মাসের নির্বাচনে বিরোধী মুসলিম লীগ দলের (ন) খুবই আত্মবিশ্বাসী ভাবে জয়ের সঙ্গে তাঁর, দেশের প্রধানের পদে জয়ী হয়ে ফেরার রাস্তা খুলে দিয়েছে. একই সময়ে, নতুন করে নির্বাচন হওয়া পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি হিসাবে রয়ে গিয়েছিলেন বর্তমানে পাকিস্তানের বিরোধী পিপলস্ পার্টির নেতা আসিফ আলি জারদারি”.

পাকিস্তানে রাষ্ট্রপতি সাধারণতঃ আনুষ্ঠানিক কাজকর্ম করলেও, তিনিই একজন মুখ্য ক্রীড়নক থেকে যান, যিনি অসামরিক প্রশাসন ও দেশের অতি শক্তিমান সামরিক বাহিনীর মধ্যে খুবই জটিল আটকে রাখা ও উল্টো ভরের কাজ করে থাকেন, যারা এই দেশে কয়েক দশক ধরেই শাসন করেছিল.

আট বছর ধরে দেশের ক্ষমতা সামরিক বাহিনীর হাতে থাকার পরে প্রথম অসামরিক প্রশাসন, পাকিস্তানের জন্যই নতুন এক ঘোলা সময়ে পরিণত হয়েছে – যখন রাজনৈতিক অচলাবস্থা, ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সমস্যা, সর্বব্যাপী দুর্নীতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা জটিল হয়ে যাওয়া দিয়ে চিহ্নিত হয়েছে, যখন দেশের বেশ কয়েকটি এলাকাই বাস্তবে তালিবদের নিয়ন্ত্রণে চলে গিয়েছে. বর্তমানে বিদায়ী রাষ্ট্রপতির পক্ষেও সম্ভব হয় নি তাঁর নামের সঙ্গে শক্ত হয়ে জড়িয়ে যাওয়া দুর্নাম, “জারদারি - মিস্টার টেন পার্সেন্ট” এটার ইতি করার, সেটাও স্রেফ তাঁর দুর্নীতির জালে জড়িয়ে থাকার জন্যই, এই প্রসঙ্গে তোমিন বলেছেন:

“তারই মধ্যে সেই উত্তেজনা যে, নওয়াজ শরীফ কি রাষ্ট্রপতির পদে নব নিযুক্ত ব্যক্তিকে তাঁর বিপক্ষের দল পিপলস্ পার্টি থেকে কাউকে দেওয়ার জন্য সহমত হবেন, সেটাও দীর্ঘস্থায়ী হয় নি. রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সামান্য আগেই পিপলস্ পার্টির পক্ষ থেকে প্রার্থী রাজা রাব্বানি নিজের প্রার্থী পদ প্রত্যাহার করেছেন. দেশের প্রধান বিরোধী পক্ষ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন বয়কট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ঠিক তার পরেই, যখন দেশের সুপ্রীম কোর্ট গত সপ্তাহে সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের দিন থেকে ৬ই আগষ্ট এগিয়ে ৩০শে জুলাই করা হবে”.

প্রশাসন এই দিন পাল্টানোর সম্বন্ধে এই রকমের ব্যাখ্যা দিয়েছে যে, তাদের প্রাথমিক যে দিন ঠিক করা হয়েছিল, তা মুসলমানদের জন্য পবিত্র রমজান মাসের শেষের দিনটির সঙ্গে একই দিনে পড়ছে, যখন নির্বাচক মণ্ডলী ব্যস্ত থাকবেন স্বাভাবিক ভাবেই ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানে. পাকিস্তান পিপলস্ পার্টির তরফ থেকে তাঁদের সিদ্ধান্তের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সাবেক প্রার্থী রাজা রাব্বানি বলেছেন, “আমরা এই নির্বাচন থেকে অংশগ্রহণ বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছি. সুপ্রীম কোর্ট একতরফা সিদ্ধান্ত নিয়েছে, আমাদের আগে থেকে বদলী তারিখের কথা কিছু না জানিয়েই ও আমাদের সঙ্গে সহমত না হয়েই. আমরা এই সিদ্ধান্তকে দেখছি একটি পদক্ষেপ হিসাবেই, যা কেন্দ্রের সরকারের চাপিয়ে দেওয়া কাজের মধ্যে পড়ে”.

যদিও দেশের রাষ্ট্রপতি পদের প্রার্থীদের মধ্যে ২১জনের নাম রয়েছে, তাও মুখ্য বিরোধী দল পিপলস্ পার্টির পক্ষ থেকে নির্বাচন বয়কটের সিদ্ধান্ত, গ্যারান্টি দিয়েছে মুসলিম লীগের প্রার্থী ও দক্ষিণের সিন্ধ প্রদেশের প্রাক্তন রাজ্যপাল মামনুন হুসেইনের জয়ের. তাঁর পূর্বসূরি আসিফ আলি জারদারির, যিনি পাকিস্তানের রাজনীতিতে একটা স্বয়ং সম্পূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন, তাঁর ব্যতিক্রম হিসাবেই এই মামনুন হুসেইন, সব দেখে শুনে মনে হয়েছে যে, প্রধানমন্ত্রী শরীফের দেওয়া লক্ষ্যই সম্পূর্ণ করার জন্য থাকবেন. মামনুন হুসেইনের রাষ্ট্রপতি হিসাবে নির্বাচনের সঙ্গেই নওয়াজ শরীফ নতুন শক্তিশালী হাতের ভূমিকা নিতে পারবেন, যা সমস্ত কিছুই এই দেশে নিয়ন্ত্রণ করবে.

এরই মধ্যে, নওয়াজ শরীফের হাতে সমস্ত ক্ষমতা এক হওয়া শুধু সুযোগই করে দেবে না, বরং নির্দিষ্ট অসুবিধাও করে দেবে. একদিকে, রাজনৈতিক ভাবে সর্ব্বোচ্চ ক্ষমতা যাবে একটি দলের প্রতিনিধিদের হাতেই ও তাদের কাছে থাকবে একেবারে বাজীর তাস, এই দেশের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় সংস্কার সাধনের জন্যে. আবার অন্য দিকে পাকিস্তানে একই দলের প্রতিনিধিদের পক্ষ থেকে ক্ষমতার ট্যান্ডেম তৈরী হওয়াতে দেশের সমাজ ও রাজনৈতিক উচ্চ মহলে একটা ফাটল ধরারই সম্ভাবনা রয়েছে. এই বিষয়ে আবার নওয়াজ শরীফ নিজেও নতুন করে স্বৈরাচার করা হচ্ছে ইত্যাদি অভিযোগ এড়াতে পারবেন না, যা দীর্ঘস্থায়ী ভবিষ্যতে তাঁরই বিরুদ্ধে যেতে পারে, যদি না তিনি নির্বাচকদের পক্ষ থেকে পাকিস্তানের মুসলিম লীগ (ন) দলকে দেওয়া ভরসার ঋণ শোধ করতে সমর্থ হন.