চিন বঙ্গোপসাগরে ঝাঁপ দিয়ে পড়েছে. মায়ানমারের পশ্চিম সমুদ্র উপকূলে চীনের সীমান্তের কাছে সমুদ্রতল থেকে ঝুইলি নামের জায়গায় গ্যাস উত্পাদন শুরু হয়েছে. প্রতীকী গ্যাস উত্পাদন শুরু হওয়ার বোতামে একসাথে চাপ দিয়ে এই কাজের উদ্বোধন করেছেন ২৮শে জুলাই মায়ানমারের উপরাষ্ট্রপতি উ ন্যান টন ও মায়ানমারে চিনের রাষ্ট্রদূত ইয়ান হৌলান. মান্দালয়ে এই অনুষ্ঠান হয়েছে স্থানীয় জনগনের জমি গ্যাস পাইপ লাইনের জন্য দখল করা নিয়ে বিক্ষোভের মধ্যে ও পশ্চিমের থেকে সক্রিয় হওয়া প্রচেষ্টা, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর জাপান মিলে এই এলাকায় করছে চিনের প্রভাব কমানোর জন্য তারই মধ্যে.

মায়ানমারের ভিতর দিয়ে এই গ্যাস পাইপ লাইনের দৈর্ঘ্য প্রায় ৮০০ কিলোমিটার. রবিবারে চিন প্রথম ঘোষণা করেছে এই প্রকল্পে দক্ষিণ কোরিয়া ও ভারতের থেকে বিনিয়োগ আকর্ষণ করার কথা. সব দেখে মনে হয়েছে যে, এটা মায়ানমারের পক্ষ থেকে দেওয়া শর্তই ছিল. চিন অবশ্যই নিজেরা একাই এই গ্যাস পরিবহনের খরচ দিতে পারত. তারই মধ্যে নেইপিডো স্পষ্টই দেখা যাচ্ছে যে, দেখিয়ে দিতে চায় না, বিশেষত নয়াদিল্লীর চোখের সামনে যে, চিনের প্রভাব খুবই বেশী করে বেড়ে গিয়েছে ও বাধ্য হয়েছে এই পাইপ লাইন নির্মাণ কাজ কে আন্তর্জাতিক করে দেওয়ার জন্য.

কিন্তু জানা রয়েছে যে, চিন বঙ্গোপসাগরের তলদেশে থাকা গ্যাসের সম্পূর্ণ অংশেরই পরিবহনের নিয়ন্ত্রণ পেয়ে গিয়েছে. তারা ৩০ বছর ধরে ১২ বিলিয়ন কিউবিক মিটার গ্যাস পেতে থাকবে ও তাদের অধিকার থাকবে এই চুক্তিকে দীর্ঘায়িত করার.

চিন এই গ্যাস পাইপ লাইনের সঙ্গে সমান্তরাল ভাবে মায়ানমারের সমুদ্র উপকূল থেকে খনিজ তেলের পাইপ লাইন পেতেছে নিজেদের সীমান্ত অবধি. এখানে আফ্রিকা ও নিকটপ্রাচ্য থেকে খনিজ তেল ট্যাঙ্কারে করে বয়ে নিয়ে এসে চিনে সরবরাহ করা হবে. এই খনিজ তেলের পাইপ লাইন ভর্তি করার কাজ শুরু হতে চলেছে হেমন্ত কাল থেকেই.

খনিজ তেল ও গ্যাসের প্রকল্প - চিন-মায়ানমার সম্পর্কের এক লাইট হাউস বা পথ নির্দেশক, এই রকম মনে করে রুশ বিজ্ঞান একাডেমীর সুদূর প্রাচ্য ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ ভালেরি কিস্তানভ বলেছেন:

“চিন খুবই সক্রিয়ভাবে মায়ানমারে ঢুকে পড়েছে, যখন এই দেশে প্রশাসন ছিল একঘরে হয়ে, আর এই দেশ বহু দিন ধরেই পশ্চিমের দেশ গুলির সঙ্গে কোন ভাবেই যোগাযোগ করতে পারে নি. চিন তাদের অর্থনৈতিক সহায়তা দিয়েছে, তাদের পরিকাঠামো বানিয়ে দিয়েছে. ফলে মায়ানমার দক্ষিণ পূর্ব এশিয়াতে চিনের অর্থনৈতিক কাজকর্মের বিষয়ে এক ভর কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে. তারা সেটাই করতে পেরেছে যে, তারা এরপর থেকে খনিজ তেল ও গ্যাস পাবে স্থল পথ দিয়েই, সমুদ্র পথে মালাক্কা প্রণালী দিয়ে নয়, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ করছে. মায়ানমারে চিন বানাচ্ছে গভীর সমুদ্র বন্দর, যা ভারত মহাসাগরে তাদের উপস্থিতির জন্য আর এক বৃহত্ সামুদ্রিক রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ”.

পশ্চিম বুঝতে পেরেছে যে, এক সময়ে তারা চিনের মায়ানমারে লাফ দেওয়াটা নজরের বাইরে করেছিল, আর তাদের ভারত মহাসাগরে ফুঁড়ে বেরিয়ে আসা, যা চিন এই দেশের মধ্যে দিয়ে করতে পেরেছে, তা তারা খেয়াল করে নি. আজ তারা যা ক্ষতি হয়েছে, তা ফেরত পেতে চাইছে. সেই কারণেই জাপানে ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সোত্সাহে মায়ানমারের রাষ্ট্রপতিকে স্বাগত জানানো হচ্ছে, কিছুদিন আগেই মায়ানমারের সর্ব্বোচ্চ নেতার লন্ডন ও প্যারিস সফর হয়েছে কয়েক দশকের মধ্যে প্রথম বার. “মায়ানমারের বসন্ত” পশ্চিমের জন্য ও জাপানের জন্য শুরু হয়েছে ওয়াশিংটন থেকে ইঙ্গিত করার পরেই. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মায়ানমার থেকেই চিনের বিরুদ্ধে খেলার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে, এই রকম মনে করে রুশ বিজ্ঞান একাডেমীর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা ইনস্টিটিউটের ডেপুটি ডিরেক্টর পাভেল জোলোতারিয়েভ বলেছেন:

“মায়ানমারে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থই দেখাতে চাওয়া হচ্ছে. তা চিনের সঙ্গে লড়াইয়ের সঙ্গেই জড়িত, তাদের ক্রমবর্ধমান শক্তিকে বেঁধে রাখার জন্য. এই অঞ্চলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চেষ্টা করছে অন্যান্য দেশ গুলির সঙ্গে এমন সম্পর্ক তৈরী করতে চাইছে, যাতে তাদের সমর্থন পেয়ে অথবা অন্তত তাদের পক্ষ থেকে আনুগত্য পেয়ে প্রয়োজনের সময়ে কাজ করা যায়. এই বোধ থেকেই তারা ভিয়েতনাম ও ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ এখন মজবুত করছে”.

চিনের বিরুদ্ধে খেলার জন্য এখন সেই মায়ানমারেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমের অন্যান্য দেশ গুলি স্থানীয় মানবাধিকার আন্দোলনের উপরে বাজী ধরেছে, এরা বাস্তবেই স্থানীয় প্রশাসনের বিরুদ্ধাচারী. হোয়াইট হাউস অথবা অন্যান্য রাষ্ট্রে রাজধানীতে এই সব আন্দোলনের নেতাদের আমন্ত্রণের ও খুবই উদাত্ত প্রশংসার প্রত্যুত্তরে এই সমস্ত নেতাদের মুখ থেকে কোন না কোন চিন বিরোধী মন্তব্য নিয়মিত ভাবেই শুনতে পাওয়া যাচ্ছে. এখানে বাদ দেওয়া যায় না যে, স্থানীয় জনগনের প্রতিবাদ, যা গ্যাস ও খনিজ তেলের পাইপ লাইন পাতার জায়গায় হচ্ছে, তা সরাসরি ভাবেই পশ্চিমের থেকে ব্যবস্থা করেই করানো হচ্ছে.

ব্যাপার হল যে, কৃষক ও খামারের মালিকরা তাদের জমির জন্য ন্যায্য দাম চাইছে, যা থেকে তাদের এই পাইপ লাইন বানানোর জন্য সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে. বর্মার লোকদের এটাই ক্ষুব্ধ করেছে যে, খনিজ তেল ও গ্যাস তাদের দেশ হয়ে চিনে যাচ্ছে, আর তারা এখনও সেই কাঠ কয়লা দিয়েই রান্না করছে. এর উত্তরে চিনের পক্ষ থেকে তৈরী করে দেওয়া হচ্ছে স্কুল ও হাসপাতাল, অন্যান্য দাতব্য কাজ কারবারও করা হচ্ছে. এই বিষয় কিছুটা উত্তেজনা কমালেও, সমস্যা কম করিয়ে দেয় নি.