সিরিয়া সংকটের ময়দানে পুরো সপ্তাহজুড়ে সামরিক ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টার সক্রিয়তা লক্ষ্য করা গেছে। রুশ ও মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী সেরগেই ল্যাভরোভ এবং জন কেরি সিরিয়া সংক্রান্ত শান্তি সম্মেলনের আয়োজনের প্রস্তুতি নিয়ে বেশ কয়েকবার টেলিফোন আলাপ করেছেন। গত ২৬ জুলাই নিউইয়র্কে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যদের সাথে সিরিয়ার বিরোধী জোটের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক এক বৈঠকের পরই জেনেভা সম্মেলন আবারও আলোচনায় চলে এসেছে। সিরিয়ার বিরোধী জোটের ন্যাশন্যাল কোয়ালিশন পার্টির মূখপাত্র আহমেত জারবা প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন।

জাতিসংঘে নিযুক্ত রাশিয়ার স্থায়ী প্রতিনিধি ভিতালি চুরকিন বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের জানান, বিরোধী জোট জানিয়েছে, সিরিয়া সংকট সমাধান নিয়ে জেনেভা-২ সম্মেলনে অংশ নিতে তাঁরা তৈরী আছে। তবে আবারও এক্ষেত্রে শর্ত বেঁধে দেওয়া হয়েছে। সিরিয়ায় যে অস্থায়ী সরকার গঠন করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে তাতে বর্তমান রাষ্ট্রপতি বাশার আসাদকে না রাখার দাবী জানিয়েছে। আসাদ যখনই সরে দাড়াবেন ঠিক তখনই ন্যাশন্যাল কোয়ালিশন পার্টি জেনেভা শান্তি সম্মেলনে যোগ দিবে।

যদিও বিরোধী জোটের জেনেভা সম্মেলনে অংশগ্রহণের ইচ্ছা থাকলেও কোথাও সুনির্দিষ্ট করে উল্লেখ নেই। এমন কথাই চলতি সপ্তাহে মস্কোতে এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সেরেগই ল্যাভরোভ। তিনি বলেছেন, "সিরিয়ার ন্যাশন্যাল কোয়ালিশন জোট আবারও জানিয়েছে যে, তাঁরা জেনেভা সম্মেলনে অংশ নিবে না। আর তাদের পক্ষ থেকে যে প্রাথমিক শর্ত দেয়া হয়েছে তা অনেক অংশেই গুরুতর এবং জেনেভা কমিউনিক ও মার্কিনীদের সাথে আমারা যে উদ্যোগ নিয়েছি তার বিপক্ষে অবস্থান নেয়ার সমতূল্য।" এসব সত্বেও ল্যাভরোভ আশা করছেন যে, খুব শীঘ্রই সম্মেলন আয়োজন করা সম্ভব হবে।

এদিকে জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন জেনেভা-২ সম্মেলন আয়োজনকে প্রধান গূরুত্ব দিচ্ছেন এবং সিরিয়া পরিস্থিতিকে তিনি ‘ভয়াবহ’ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, "সিরিয়ায় ১ লাখেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন এবং কয়েক কোটি মানুষ আহত কিংবা শরনার্থী হয়েছেন। রুশ ও মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী সেরগেই ল্যাভরোভ ও জন কেরি সিরিয়া সংক্রান্ত যে শান্তি সম্মেলনের আহবান করেছেন তা দ্রুত আয়োজন করা প্রয়োজন।"

গত সপ্তাহে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা মন্ত্রনালয় সিরিয়া সংক্রান্ত নতুন কিছু পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে সামরিক অভিযান পরিচালনার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত করা হয়। মার্কিন সেনাবাহিনীর জয়েন্ট কমান্ডিং অফিসার মার্টিন ডেম্পসেই এ সংক্রান্ত নথিপত্র সিনেটে উথাপন করেছেন। তিনি জানান, সব ধরনের সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা ইতিমধ্যে রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামার কাছে পাঠানো হয়েছে। সূত্র জানায়, এ সব পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে সিরিয়ায় সামরিক গোয়েন্দা অভিযান, বিরোধীদের অস্ত্র ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দেয়া, সিরিয়াকে নোফ্লাই জোন ঘোষণা এবং রাসায়নিক অস্ত্রের মজুদ ধ্বংস করতে বিশেষ মার্কিন গোয়েন্দা বাহিনী ব্যবহার। ডেম্পসেই আরো জানান, সিনেটের অনেক রিপাবলিকানই সিরিয়ায় মার্কিন সামরিক অভিযান শুরু করা নিয়ে বিরোধীতা করতে পারে। তিনি আরো বলেন, সিরিয়ায় সামরিক অভিযান পরিচলনা করা হলে তা স্বাভাবিক গতিতেই দ্বিতীয় আফগানিস্তান বা ইরাকে পরিণত হবে। পেন্টাগন জানায়, সিরিয়ায় যে কোন সামরিক অভিযান পরিচালনা করার যে পরিকল্পনা করা হয়েছে তাতে যুক্তরাষ্ট্রের বছরে ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় করতে হবে। সামগ্রিক বাজেট যেখানে কমিয়ে আনা হয়েছে তাই হোয়াইট হাউসের স্বভাবতই এতো বিপুল পরিমান অর্থ খরচের ইচ্ছা নেই।

এদিকে সিরিয়ার সরকার বিরোধী জোট কুর্দি সম্প্রদায়ের সাথে সংঘাতে জড়ানোর চেষ্টা করছে। এখন পর্যন্ত সিরিয়ার কুর্দিরা নিরপেক্ষ অবস্থানে ছিলেন। কিন্তু চলতি সপ্তাহে দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলে উগ্রবাদীদের সাথে কুর্দি মিলিশিয়াদের সংঘর্ষ বাঁধে। আল-কায়দার সাথে সম্পৃক্ত জঙ্গি দলটি ২০০ জনেরও বেশি কুর্দিকে অপহরণ করে। এদের মধ্যে নারী, শিশু ও বৃদ্ধ রয়েছে। কুর্দি অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের মত ঘটনা ঘটেছে।

কুর্দির বেসামরিক লোকজনের ওপর সিরিয়ার অস্ত্রধারী বিরোধী জোটের এই আচরণকে ‘রক্তাক্ত উসকানিমূলক’ ঘটনা বলে অভিহিত করেছে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রনালয়। সিরিয়ার কুর্দি এলাকাগুলোতে নৃশংসতার পিছনে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর হাত রয়েছে বলে মস্কো দৃড়তার সাথে জানিয়েছে। এদের একমাত্র লক্ষ্য দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্পর্ক নষ্ট করা এবং দেশের পরিস্থিতি খারাপের দিকে নিয়ে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের ঘাঁটি হিসেবে তৈরী করা।