ধর্মীয় কট্টর পন্থার ঢেউ ঐস্লামিক বিশ্বে একটা নির্দিষ্ট সময় পরপরই উঠে থাকে – আর তার পরেই তা আবার কমে যায়. এখন স্পষ্টই দেখতে পাওয়া যাচ্ছে আরও একটি উত্থানের সময়, যাকে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে যেমন বাস্তব দিয়ে তেমনই তুলনা মূলক সমস্ত কারণ দিয়েও. কিন্তু এর পরেই আশা করা যেতে পারে একটা পতনের সময়. এই রকমই মনে করেছেন রাশিয়ার এক অন্যতম বড় ইসলাম বিশেষজ্ঞ, বহু আন্তর্জাতিক ও তার মধ্যে ঐস্লামিক পুরস্কারের প্রাপক, সেন্ট পিটার্সবার্গের প্রত্নতত্ত্ব ও নৃতাত্ত্বিক বিজ্ঞান জাদুঘরের (কুনত্সকামেরা – কিউরিওসিটি রুম) ডেপুটি ডিরেক্টর, ইতিহাসে ডক্টরেট এফিম রেজওয়ান.

এফিম রেজওয়ান সদ্যই আরও এক অভিযান সেরে ফিরে এসেছেন, যা “ইজমা” (সহমত) নামের প্রকল্পের কাঠামোর মধ্যে করা হচ্ছে. দিন পনেরো ধরে রাশিয়ার বিজ্ঞানীরা ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা দ্বীপে ছিলেন, যেখানে তাঁরা স্থানীয় জনগনের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্য নিয়ে চর্চা করেছিলেন – এঁরা শফি’ই মজহবের সুন্নী মুসলমান গোষ্ঠীর লোক, তাঁদের নিয়ে রেজওয়ান বলেছেন:

“আমি (ইজমা) প্রকল্পে মুসলমান বিশ্বের বহু ধরনের উপরে চর্চা করছি, অথচ আমি আগে কখনই আশা করি নি, যে এই ধরনের বহু রকমের ধরন এত প্রসারিত হতে পারে বলে. ইন্দোনেশিয়াতে আমি দেখলাম এক মুসলমান সমাজ, খুবই ভক্ত ধার্মিক লোক তাঁরা, সেখানে বহুল পরিমানে মসজিদও রয়েছে, কিন্তু সেখানে রাজত্ব করছে মাতৃতন্ত্র. এটা হয়েছে আদত নিয়মের জন্যে (সাধারণ আইনে): এখানের সমাজে মহিলারা প্রধান রাষ্ট্রীয় ভূমিকা পালন করছেন – বাড়ীতেও তাঁরাই মুখ্য, জমির মালিকানা মহিলাদের রয়েছে আর তা আবার উত্তরাধিকার হিসাবে মেয়েদেরই দেওয়া হয়ে থাকে. স্বামীরা সকাল বেলায় বাড়ী ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য, আর সন্ধ্যায় ফিরে আসতে. এই ভাবেই সুমাত্রায় মুসলমানেরা বেঁচে রয়েছেন. এটা আমাদের ইসলাম সম্পর্কে ধারণার একেবারেই বাইরে.

কিন্তু ইসলামের শক্তি এমনই যে, তা জাতীয় সংস্কৃতিকে নিজের মধ্যে সফল ভাবেই শুষে নিতে পারে. যদি এই ভাবে তা কাজ না করত, তবে এত বিশাল এলাকা জুড়ে কখনও তা ছড়িয়ে পড়তে পারতো না, আর তার বিশ্বাসী প্রায় দেড়শো কোটি মানুষ হত না. আমার মনে হয় যে, আগে হোক বা পরেই হোক সেই বোধ আসবে যে, অনেক রকমের হওয়ার মধ্যেই শক্তি রয়েছে, আর সেটাই ইসলামের ইতিহাসে একটা মোড় ঘোরার মত মুহূর্ত হবে”.

“ইজমা” প্রকল্প ২০০৮ সালে শুরু করা হয়েছিল. গত পাঁচ বছরে রাশিয়ার বৈজ্ঞানিক অভিযানের কর্মীরা, যার এফিম রেজওয়ান নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাঁরা ইজিপ্টে, ইয়েমেনে, ইথিওপিয়াতে, চিনের পূর্ব দিকে – সিনঝিয়ান প্রদেশে, ভারতে, শ্রীলঙ্কায়, মালদ্বীপে গিয়েছেন. সব জায়গাতেই উপাদান সংগ্রহ করা হয়েছে মুসলিম সমাজের গঠন নিয়ে, যা বহু প্রজাতি বিশিষ্ট ও বহু অন্য ধর্ম বিশিষ্ট দেশে রয়েছে ও যারা নানারকমের স্ট্র্যাটেজি সেখানে নিয়েছেন, হয় সহযোগিতা করে, নয়তো আলাদা হয়ে থেকে.

ঐস্লামিক বিশ্বের সঙ্গে পরিচয়ের সুযোগে ও তার একেবারে সব রকমের ধরনের মধ্যেই সুযোগ হয়েছে তার বিকাশের নিয়ম নীতি সম্পর্কে জানার, তাই রেজওয়ান বলেছেন:

“প্রাক্ তিব্বত এলাকায় গিয়ে, চিনের মুসলমানদের নিয়ে কাজ করার সময়ে, আমি নিজের জন্যেই একেবারে আশ্চর্যজনক ভাবে বুঝতে পেরেছিলাম যে, সেখানে বিংশ শতাব্দীর শুরুতে তথাকথিত ওয়াহাবি বাদ ও সালাফিত মতবাদের উত্থান হয়েছিল, একই সময়ে এই প্রক্রিয়া চলেছিল, আমাদের রাশিয়াতে, যখন ভলগা নদীর তীরে উদ্ভব হয়েছিল “খোদা বন্দ” বাগাউদ্দীন ভাইসভের বাহিনীর. একই সময়ে, সেই সমস্ত বছর গুলিতেই তৈরী হয়েছিল সৌদী আরব রাষ্ট্রের. দেখা যাচ্ছে যে, সমস্ত ইউরো-এশিয়া এলাকার জন্যই একটাই প্রবণতা লক্ষ্যণীয় ছিল, যা পরে স্বাভাবিক ভাবেই মিলিয়ে গিয়েছিল.

আমার দৃষ্টিকোণ থেকে, ঐস্লামিক বিশ্বের ইতিহাস একটা “সাইন কার্ভের” মতই বিকাশ হচ্ছে. এই ইতিহাসকে মনে করা যেতে পার যে, যেন কট্টরপন্থী সালাফিতদের সঙ্গে সুফীদেরই সংগ্রাম বলে. ইসলাম নতুন এলাকায় ঢুকে পড়ছে, সেখানে স্থানীয় সংস্কৃতির মৌলকে গ্রহণ করছে, এই সব এলাকায় বিকশিত হচ্ছে. আর তারপরে নতুন সব লোক আসছেন, তাঁরা বলছেন: “এটা সঠিক ইসলাম নয়”. আর তার পরেই যুদ্ধ শুরু হচ্ছে. এই প্রসঙ্গে সব সময়েই জিতে যাচ্ছে স্থানীয় জাতীয় সংস্কৃতি. কিন্তু তার মানে এটা নয় যে, আবার কিছু দিন বাদে এই ধরনের লোক আসছে না, অথবা তারা বলা বন্ধ করছে যে, আপনারা ঠিক ভাবে প্রার্থনাই করছেন না”.

“ইজমা” – সহমত, ধারণার ক্ষেত্রে মিল খোঁজা অথবা আলোচ্য প্রশ্নের বিষয়ে সেই শতকের মুসলমান প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সিদ্ধান্ত – এটা মুসলমান আইন “ফিকহ” এর একটি উত্স. এর উদ্ভব ধরা হয়ে থাকে সপ্তম শতকে.

আজ ১৪টি শতক পার হয়ে এসে, এই সহমত, সম্মতি সেই ঐস্লামিক বিশ্বেরই প্রয়োজন মতো জুটছে না. এরই উজ্জ্বল উদাহরণ – ইজিপ্ট, রেজওয়ান নিজের বিশ্বাস থেকে মন্তব্য করে বলেছেন:

“সেই পরিস্থিতি, যখন মুর্সি রাষ্ট্রপতি ছিলেন, তখন ইজিপ্টের উপরে বাইরে থেকে অনেক কিছুই চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছিল. কাতার ও কিছুটা কম করে সৌদী আরবের রাজতন্ত্রের অর্থে সেখানে এক ঐস্লামিক প্রকল্প রূপায়নের কাজ করা হচ্ছিল. তার অনেকটাই ইজিপ্টের শহরের মানুষদের ইচ্ছা ও চাহিদার সঙ্গে মেলে নি. দুঃখের কথা হল যে, এখন দেশ আধাআধি ভাবেই ভাগ হয়ে গিয়েছে. স্পষ্টই দেখতে পাওয়া যাচ্ছে যে, পরস্পর বিরোধী পক্ষ নিজেদের মধ্যে সহমতে আসতে পারছে না ও পরিস্থিতিকে স্থিতিশীল করতেও পারছে না, যদি একে অপরের স্বার্থের কথা না ভাবে তাহলে তা পারবেও না. দেশের জনগনের মধ্যে এই ধরনের বিভাজনের সময়ে অর্ধেক দেশকে ধ্বংস করে নখের ডগায় চেপে রাখা যায় না. আমি বিশ্বাস করি যে, এই দুই ভাগের গোষ্ঠীতেই বুদ্ধিমান লোক রয়েছেন, যাঁদের জন্য দেশের ভবিষ্যত কোন নৈর্ব্যক্তিক বিষয় নয়. আর তাঁরা ঠিকানা নেই এমন কারো জন্যেই, এই দেশকে বলি দিতে চাইবেন না, ইজিপ্টকে নতুন সিরিয়া হতে দেবেন না”.

২০০৫ সালের জানুয়ারী মাসে এফিম রেজওয়ানের লেখা বই “উসমানের কুরআন” বের হওয়ার পরে রাশিয়ার বিজ্ঞানীকে আল-আজহারের শেখ ডক্টর মুহম্মদ সৈদ তান-তাউই আমন্ত্রণ করেছিলেন. এখানে তান-তাউই যে বাণী দিয়েছেন তার একটি মনে না করিয়ে দিলে চলবে না: “সেই প্রকৃত মুসলমান – যে সৃষ্টি করে, ধ্বংস করে না, সমস্ত সাজিয়ে রাখে, খালি করে দেয় না, নতুন করে গড়ে দেয়, নষ্ট করে না, যে অন্যের সঙ্গে ভক্তি ও ধার্মিক ভাবেই সহযোগিতার পথে চলে”.

0তাহলে সেই সময়েই কি এই “ইজমা” প্রকল্পের শুরু হয় নি.