দিল্লী ও বেজিংয়ের সম্পর্কের মধ্যে আবার একটি নতুন সীমান্ত সংক্রান্ত ঘটনা ঘটে গেল: চিনের সামরিক বাহিনীর লোকরা ইতিহাসে এই প্রথম ভারতে উত্তরাখণ্ড রাজ্যে প্রবেশ করেছিল. এর আগে চিনের সামরিক বাহিনীর লোকদের অনুপ্রবেশ ঘটেছিল ভারতের অন্যান্য রাজ্যে. ভারতের সীমান্ত লঙ্ঘনের বিষয়টি আবার একই সঙ্গে চিনের জাপান ও অন্যান্য দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশের সঙ্গে একই ধরনের ঘটনার সময়ে মিলেছে.

চিনের সামরিক বাহিনীর লোকরা আরও একবার ভারত – চিন সীমান্ত এলাকায় বাস্তব নিয়ন্ত্রণ রেখার স্বচ্ছতা সম্বন্ধে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে আর তারই সঙ্গে ভারতের সর্ব্বোচ্চ নেতৃত্বের স্নায়ু বৈকল্যের কারণ হয়েছে. এক দল চিনে সেনাবাহিনীর লোক কোন রকমের বাধা না পেয়েই নিয়ন্ত্রণ রেখা পার হয়ে এসে ভারতের সীমান্তবর্তী উত্তরাখণ্ড রাজ্যে ঢুকে পড়েছিল, প্রতিবেশী দেশের এলাকায় এক ঘন্টার বেশী সময় ধরেই তারা রয়ে গিয়েছিল.

এই ধরনের ঘটনা বিগত সময়ে প্রায়ই ঘটছে. ১৬ই জুলাই ৫০ জনেরও বেশী সেনা ভারতের জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের লাদাখ এলাকায় সীমান্ত পার হয়ে চলে এসেছিল, আর তার কয়েকদিন আগেই ভারতীয় আকাশ সীমা লঙ্ঘন করেছিল চিনের হেলিকপ্টার বাহিনী. সবচেয়ে প্রতিধ্বনি তোলা ঘটনা ঘটেছিল এই বছরের এপ্রিল মাসে, যখন চিনের সামরিক বাহিনীর লোকরা হেলিকপ্টারের সহায়তা নিয়ে ভারতের এলাকায় ১৯ কিলোমিটার গভীরে লাদাখ এলাকায় চলে এসেছিল ও সেখানে কয়েক সপ্তাহ শিবির গেড়ে রয়ে গিয়েছিল.

উত্তরাখণ্ড রাজ্যে হওয়া শেষ ঘটনাটি এর আগে হওয়া সমস্ত ঘটনার সঙ্গে দুটি বিষয়ে খুবই অন্য রকমের. প্রথমতঃ, এই ভারতীয় রাজ্যে চিনের সেনারা আগে কোন দিনও অনুপ্রবেশ করে নি – এর আগের ঘটনা গুলি হয়েছে জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যে আর অরুণাচল প্রদেশে. দ্বিতীয়তঃ, উত্তরাখণ্ড রাজ্যে রাষ্ট্রীয় সীমা লঙ্ঘণ নতুন এক রাউণ্ড ভারত-চিন সীমান্তে নিয়ন্ত্রণ রেখা বরাবর ভরসা বৃদ্ধি করার উদ্দেশ্য নিয়ে আলোচনা পর্বের অব্যবহিত পরেই হয়েছে. এই ভাবে বেজিং বুঝিয়ে দিয়েছে যে, আলোচনা স্বত্ত্বেও, তাদের প্রতিবেশীদের নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী উদ্দেশ্য কেউই আপাততঃ বাতিল করে দেয় নি.

আর এই প্রসঙ্গে ভারতের সামরিক বিশ্লেষক, সমীক্ষক উদয় ভাস্কর বলেছেন:

“শেষ ঘটনা – চিনের সামরিক বাহিনীর সেনাদের পক্ষ থেকে উত্তরাখণ্ড রাজ্যে অনুপ্রবেশ খুবই উদ্বেগ ও আশঙ্কার সৃষ্টি করেছে. দুই দেশের সম্পর্কের ইতিহাসের দিকে তাকিয়ে না বলে পারা যায় না যে, এই ধরনের অনুপ্রবেশ একাধিকবার আগেও ঘটেছে. কিন্তু বর্তমানের ঘটনার পার্থক্য হল এই যে, এই বারে সীমান্ত এলাকায় নিয়ন্ত্রণ রেখা লঙ্ঘণ করা হয় নি, বরং দুই দেশের মধ্যে রাষ্ট্রীয় সীমান্ত লঙ্ঘণ করা হয়েছে. লাদাখ সীমান্ত এলাকায় অনুপ্রবেশ, যা এপ্রিলে হয়েছে, তা উচ্চ পর্যায়ে মিটিয়ে ফেলা হয়েছিল, যখন ভারতে এসেছিলেন চিনের প্রধানমন্ত্রী. কিন্তু তার পরেও অনুপ্রবেশ ঘটেছে. আর তাই এই নিয়ে প্রশ্নের উদয় হয়: এই ধরনের মিল না হওয়া কিসের সঙ্গে জড়িত? হয় চিনের সেনাবাহিনী সেই দেশের নেতৃত্বের থেকে স্বাধীন ভাবে কাজকর্ম করছে অথবা একটা দ্বিমুখী খেলা হচ্ছে, যাতে চিনের প্রশাসন দেশের সামরিক বাহিনীকে এই ভাবে কাজ করতে দিচ্ছে? দুটি ধারণাই খুবই গভীর উদ্বেগ ও আশঙ্কার সৃষ্টি করে. এখানে দেখাই যাচ্ছে যে, একেবারে সর্ব্বোচ্চ স্তরে এই সমস্যা সমাধানের জন্য সমস্ত রকমের শক্তি প্রয়োগ করে দেখা দরকার...”

চিন্তা করার জন্য নতুন উপকরণ হয়েছে যে, বেজিংয়ের উচ্চাকাঙ্ক্ষা বর্তমানের স্তরে কি রকমের, তা বুঝতে দিয়েছে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া সুদূর প্রাচ্য তাদের নিয়ে ঘটনা গুলি. চিনের তার এই এলাকার প্রতিবেশী দেশ গুলির সঙ্গে এলাকা সংক্রান্ত বিরোধ প্রায় সেই চিত্রনাট্য অনুযায়ীই হচ্ছে, যা ভারতের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের ক্ষেত্রে হয়েছে. এই বুধবারে চিনের সামুদ্রিক পুলিশের জাহাজগুলি সেনকাকু বা দিয়াদাও দ্বীপের কাছের জলসীমাতে প্রবেশ করেছিল, যে দ্বীপ গুলি রয়েছে জাপানের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে ও যা নিয়ে চিনের সঙ্গে জাপানের বিতর্ক চলছে. সব মিলিয়ে বছরের শুরু থেকে এই সমস্ত দ্বীপের ১২ মাইলের মধ্যে ৫০ বারেরও বেশী চিনের জাহাজের অনুপ্রবেশ ঘটেছে. তাছাড়া, সেই বুধবারেই চিনের বিমান বাহিনীর বিমান জাপানের দ্বীপ ওকিনাওয়া ও মিয়াকোজিমার মধ্য দিয়ে উড়ে গিয়েছে আর ইতিহাসে প্রথমবার তারা প্রশান্ত মহাসাগরে গিয়ে পৌঁছেছে, পূর্ব চিন সাগরের সীমানা পার হয়ে.

এখানে প্রশ্ন উঠতেই পারে – কি দরকার? স্পষ্টই দেখা যাচ্ছে যে, তার পরেই, কেন চিনের সামরিক বাহিনীর লোকরা বারবার ভারতের সঙ্গে সীমান্ত এলাকায় নিয়ন্ত্রণ রেখা পার হয়ে যাচ্ছে: চিনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গেই তাদের বেড়ে যাওয়া আন্তর্জাতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা প্রদর্শন করার জন্যই.

প্রবণতা একেবারে স্পষ্ট: সীমান্ত লঙ্ঘণ না করা, অন্য দেশের সার্বভৌমত্ব সম্মান করা, যা যুদ্ধ পরবর্তী বিশ্বের প্রধান নীতি হয়েছিল, তা এবারে চিনের নতুন সম্ভাবনার সঙ্গে একটা বিরোধ সৃষ্টি করেছে.

আজকের দিনে বেজিং প্রতিবেশীদের সঙ্গে এলাকা সংক্রান্ত বিরোধে প্রথম স্থানে থাকা বিজয়ীর পত্র মুকুট শিরোপা করে রেখেছে. গণ প্রজাতন্ত্রী চিনের আন্তর্জাতিক তালিকা সামুদ্রিক ও স্থল পথের বিতর্কে জর্জরিত হয়ে রয়েছে. বেজিংয়ে শুধু কড়া ঘোষণাই দেওয়া হচ্ছে না, বরং তারা বাস্তব পদক্ষেপও নিচ্ছে বর্তমানে থাকা এলাকা সংক্রান্ত স্ট্যাটাস- কো পাল্টে দেওয়ার জন্যেই.

এই অঞ্চলের দেশ গুলির পক্ষ থেকে বেজিংকে উত্তর হিসাবে যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা বৃদ্ধি দেখানো হচ্ছে, তেমনই তাদের নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধিও চলে আসছে.

এলাকা সংক্রান্ত বিরোধ, যে গুলির ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বেজিংয়ের বিরুদ্ধে যে সব দেশ তাদের সঙ্গে রয়েছে, তাদের এবারে নিজেদের নিরাপত্তার ছত্রের তলায় সমবেত হতে আহ্বান করছে, আরও বেশী করে এই বিষয়ই এই এলাকায় চিন – মার্কিন প্রতিদ্বন্দ্বিতার উত্তেজনায় ঘৃতাহুতি করেছে. এই সব কিছুই এশিয়াকে একবিংশ শতকে এক বারুদের স্তূপে পরিণত করছে.