১৯১৭ সালে রুশ বিপ্লবের পরে পৃথিবী জানতে পারলো প্রথম সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের 'সংগঠক-প্রতিষ্ঠাতাদের' নাম -  ভ্লাদিমির লেনিন ও লেভ ত্রোতস্কি. আজও বিশ্বের কমিউনিস্ট আন্দোলনে লেনিন সর্বজনগ্রাহ্য, কিন্তু ত্রোতস্কির ব্যক্তিত্ব নিয়ে তুমুল বিতর্ক এখনো চলছে.

     মার্কসবাদের তাত্বিক, অগ্নিগর্ভ বাগ্মী লেভ ত্রোতস্কি লেনিনের তিরোধান হওয়ার পরে যোসেফ স্তালিনের সাথে ক্ষমতার দখল নিয়ে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছিলেন এবং পর্যুদস্ত হন. ১৯২৯ সালে ত্রোতস্কিকে সোভিয়েত দেশ ছেড়ে যেতে বাধ্য করা হয়েছিল. জনগণের গতকালকের আরাধ্য নেতা ও বিপ্লবের পথপ্রদর্শকের গায়ে তকমা দেওয়া হল 'জনগণের শত্রু' ও 'বিপ্লবের বিশ্বাসঘাতক' বলে.  ইতিহাস লেখে বিজয়ীরা, আর তাই বিপ্লবের প্রসঙ্গে সর্বত্র উঠে এল স্তালিনের নাম, আর ত্রোতস্কির অবদান সম্পর্কে কোনোরকম উল্লেখ করা হলেই তাকে গণ্য করা হতো মারাত্মক অপরাধ হিসাবে. ত্রোতস্কির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সমর্থকদের নিপীড়ন করা শুরু হল. তার নামোচ্চারন করাই ছিল অপরাধ, আর ত্রোতস্কিবাদ বা ত্রোতস্কিবাদী শব্দগুলি গণ্য করা হতো 'রাজনৈতিকভাবে নড়বড়ে'র সমার্থক বলে.

     বিদেশে গিয়ে আশ্রয় নিয়েও ত্ ত্রোতস্কি তার লড়াই থামাননি. তিনি অবিরত স্তালিনের একনায়কতন্ত্রের মুখোশ খুলে দিতে মুখর ছিলেন এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে সমান্তরাল কমিউনিস্ট আন্দোলনের জন্ম দিয়েছিলেন - চতুর্থ ইন্টারন্যাশনাল. সোভিয়েত একনায়কের জন্য  ত্রোতস্কি রীতিমতো সমস্যা হয়ে দাঁড়ালেন আর তাই দেশের গুপ্তচর বিভাগকে আদেশ দেওয়া হল তাকে খতম করার. বিতাড়িত নেতা ও তার অনুগামীদের পেছনে শুরু হল শিকার. ত্রোতস্কির দুই সচিব - উলফ ও ক্লেমেন্ট অদ্ভূতভাবে মারা গেলেন. প্যারিসে সামান্য একটা শল্যপচারের সময় মৃত্যু ত্রোতস্কির পুত্র ও তার সহকারী লেভ সেদোভের. ত্রোতস্কির চারপাশে ব্যূহ ক্রমশঃই আঁটোসাটো হয়ে আসছিল. তিনি পালাচ্ছিলেন এক দেশ থেকে অন্য দেশে এবং অবশেষে আশ্রয় নেন মেক্সিকোয়.

    ত্রোতস্কির বন্ধুরা তার জন্য সুউচ্চ প্রাচীরের আড়ালে অবস্থিত একটি ভিলা কিনলেন. কিন্তু ঐ দূরাগম্য দূর্গেও রেহাই মিললো না. স্তালিনের অনুগামী একদল স্প্যানিশ কমিউনিস্ট ১৯৪০ সালের ২৪শে মে'র রাতে ঐ ভিলায় অনুপ্রবেশ করে ত্রোতস্কির বেডরুম লক্ষ্য করে এলোপাথাড়ি গুলি চালায় দীর্ঘক্ষণ ধরে. খাটের ওপর দুই শতাধিক বুলেটের চিহ্ন আবিষ্কার করা গেছিল, কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে লেভ  ত্রোতস্কি সেবার রক্ষা পেয়েছিলেন. তার গায়ে এমনকি একটা আঁচড় পর্যন্ত লাগেনি সেবার.

    ঐ ব্যর্থ প্রচেষ্টার পরে সোভিয়েত গুপ্তচর বিভাগ অন্য পথ ধরলো. তারা যুবক স্প্যানিশ কমিউনিস্ট রামোন মের্কেদেরকে ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নিল. কয়েক বছর ধরেই তাকে ত্রোতস্কির বিশ্বাসভাজনদের চক্রে ধীরেধীরে ঢোকানোর কাজ চলছিল. জ্যাঁক মরনার - এই বেলজিয়ান ছদ্মনামে সে যেন ঘটনাচক্রেই পরিচয় করেছিল প্যারিসে ত্রোতস্কির এক অধস্তন কর্মী সুন্দরী সিলভিয়া এ্যাজেলফের সাথে. শীঘ্রই তারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয় এবং মেক্সিকোয় গিয়ে ত্রোতস্কির বাসগৃহের কাছেই বাসা বাঁধে. কোনোরকম সন্দেহের উদ্রেক না করার জন্যই মের্কেদের বেশ কিছুদিন ত্রোতস্কির বাসভবনের কাছে ঘেঁষেনি. সে প্রত্যেক অপরাহ্নে পত্নী সিলভিয়াকে রিসিভ করতো ঐ বাড়ির ফটকের সামনে, ক্রমশঃ পরিচয় করলো সব প্রহরীদের সাথে, শীঘ্রই তারা সুদর্শন যুবকটিকে সন্দেহের চোখে দেখা থেকে বিরত হল. তারপর একদিন সিলভিয়া নিজেই উপযাজক হয়ে স্বামীকে ঐ দূর্গে আমন্ত্রণ জানিয়ে স্বয়ং লেভ ত্রোতস্কির সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়. বাক্যালাপ চলাকালে যুবকটি ত্রোতস্কির লেখা একটা প্রবন্ধের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে প্রবীন বিপ্লবীকে জিজ্ঞাসা করে, যে তাকে ঐ প্রবন্ধটি কি তিনি পড়ে শোনাতে পারবেন? ত্রোতস্কি সম্মত হন এবং সেখানেই ফাঁদে পা দেন.

     ১৯৪০ সালের ২০শে অগাস্ট প্রচন্ড গরম থাকা সত্বেও মের্কেদের টাইট কলারের রেইন কোট পরে ত্রোতস্কির কাছে যায়. তাকে তল্লাসী না করেই প্রহরীরা মের্কেদেরকে পৌঁছে দেয় গৃহকর্তার ক্যাবিনেটে. মের্কেদের ত্রোতস্কিকে প্রবন্ধটি দেয এবং ভদ্রলোক বুঁদ হয়ে সেটি উচ্চকন্ঠে পাঠ করতে থাকেন. সেই সময়েই 'স্তালিনের ভাড়াটে শিকারী' রেইন কোট থেকে পর্বতারোহীদের বরফ কাটার একটা ছেনি বের করে লেভ ত্রোতস্কির মাথায় সজোরে আঘাত করে. গৃহকর্তার তীক্ষ্ণ আর্তচিত্কার শুনে প্রহরীরা ছুটে এসে আততায়ীকে ধরাশায়ী করে বেধড়ক প্রহার করতে থাকে. জ্ঞান হারাবার পূর্ব মুহুর্তে  ত্রোতস্কি প্রহরীদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন - "ওকে প্রাণে মেরো না, ও যেন সব কথা ফাঁস করে."  তার পরদিন হাসপাতালে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ত্রোতস্কি.

    রামোন মের্কেদেরকে বিশ বছরের কারাদন্ড দেওয়া হয়েছিল. পুলিশের অজস্র জেরা ও শারিরীক নির্যাতন সহ্য করেও সে কিন্তু মেক্সিকোর প্রশাসনের কাছে তার আসল আত্মপরিচয় ফাঁস করেনি. তাদের কাছে সে জ্যাঁক মরনারই থেকে গিয়েছিল. কুড়ি বছর জেল খেটে মের্কেদের মুক্তি পায় ১৯৬০ সালে. স্তালিন তার বহু আগেই মারা গেছেন, কিন্তু তার ভাড়াটে শিকারীর কথা ভুলে যাওয়া হয়নি. গোপনে তাকে সোভিয়েত ইউনিয়নে পাচার করে নিয়ে আসা হয়েছিল. তাকে 'সোভিয়েত ইউনিয়নের বীর' খেতাব দেওয়া হয়েছিল. সে মারা যায় ১৯৭৮ সালে. মস্কোয় তার সমাধিক্ষেত্রের উপর গ্র্যানাইটের স্মৃতি ফলকে এখনো জ্বলজ্বল করে সোনালি অক্ষরে লিখিত - "এখানে শায়িত সোভিয়েত ইউনিয়নের বীর লোপেস রামোন ইভানোভিচ". সমাধিস্থ থেকেও মের্কেদেরকে তার আসল পরিচয়টা ফিরিয়ে দেওয়া হয়নি.