ইজিপ্টের ঘটনা ও প্যালেস্টাইন- ইজরায়েল গতিপথে কিছু অগ্রগতির পরিপ্রেক্ষিতে সিরিয়ার সঙ্কট দ্বিতীয় সারিতে সরে গিয়ে থাকলেও এবারে তা আবার করেই সংবাদ মাধ্যমের মনোযোগের কেন্দ্রে উঠে এসেছে. এবারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সামরিক কর্তৃপক্ষের দপ্তর গুলির সংযুক্ত পরিষদের প্রধান জেনারেল মার্টিন ডেম্পসির ঘোষণা উপলক্ষে, যাতে তিনি মার্কিন সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে সিরিয়াতে সম্ভাব্য পাঁচ রকমের কাজকর্মের উপায় নিয়ে বলেছেন. এই সমস্ত সম্ভাব্য ব্যবস্থার মধ্যে যেমন বলা হয়েছে জঙ্গীদের অস্ত্র সরবরাহ, তেমনই সিরিয়ার সামরিক লক্ষ্যের উপরে আঘাত করা ও বাফার জোন এবং উড়ান বিহীণ এলাকা তৈরী করে দেওয়া. একই সঙ্গে ডেম্পসি বিশেষ করে উল্লেখ করেছেন যে, সামরিক ভাবে হস্তক্ষেপের সিদ্ধান্ত নেবেন দেশের অসামরিক নেতৃত্ব.

সংবাদ মাধ্যমের চেয়ে আলাদা ভাবে বিশেষজ্ঞরা এই খবর অনেকটাই ধৈর্য ধরে নিয়েছেন. তাঁদের কথামতো, আমেরিকার সেনাবাহিনীর লোকরা সম্ভাব্য সামরিক কাজ কারবারের পরিকল্পনা বহু দেশের সম্বন্ধেই নিয়ে রেখেছেন. এখানে খবর শুধু এই টুকুই যে, সিরিয়ার সঙ্গে এই ধরনের কাজের কথা তাঁরা খোলাখুলি ভাবেই বলেছেন.

প্রসঙ্গতঃ, এই ধরনের অনুপ্রবেশ অবধি বাস্তবে হয়তো ব্যাপারটা অত দূর গড়াবে না, - এই রকম মনে করে ভূ-রাজনৈতিক সমস্যা অ্যাকাডেমীর উপসভাপতি কনস্তানতিন সিভকভ বলেছেন:

“সিরিয়া – এটা লিবিয়া নয়. এদের সামরিক বাহিনী অনেক সংখ্যায়, আর তাদের যুদ্ধের ক্ষমতা খুবই উচ্চ স্তরের. তাই সেখানে প্রয়োজন পড়বে অনেক বড় সংখ্যার ফৌজ পাঠানোর. তারই সঙ্গে ভুলে গেলে চলবে না যে, ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন খুবই গুরুতর অর্থনৈতিক সমস্যা নিয়ে ব্যতিব্যস্ত রয়েছে. আর শেষ অবধি, সিরিয়াতে অনুপ্রবেশ করতে হলে রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্ত পেতে হবে. কিন্তু রাশিয়া একেবারে কঠোর ভাবেই এই উপায়কে নিষেধ করেছে – আর তার মানে হল যে, যদি এই দেশে অনুপ্রবেশ করাও হয়, তবে তা হবে বেআইনি ভাবে.

ফলে এখন দুটি মাত্র সম্ভাব্য দিক রয়েছে, যা নিয়ে পশ্চিম ও তাদের আরবের সহযোগীরা কাজ করবে. এটা জঙ্গীদের সহায়তা বাড়িয়ে দেওয়া ও সিরিয়াকে নানা রকমের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দিয়ে শ্বাসরোধ করা”.

দেখাই যাচ্ছে যে, আমেরিকা ও তাদের আরব সহযোগীরা ঠিক এটাই করবে. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস এর আগে বারাক ওবামার নেওয়া সিরিয়ার জঙ্গীদের অস্ত্র সহায়তার উপরে নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে নিয়েছে. আর সিরিয়ার জাতীয় বিরোধীদের জোটে প্রধান আখমাদ ঝাবরা জানিয়েছে যে, পারস্য উপসাগরীয় দেশ গুলির রাজতন্ত্রগুলির পক্ষ থেকে জঙ্গীদের চল্লিশ কোটি ডলার সহায়তা দেওয়া হতে চলেছে.

এখানে পর্যবেক্ষকরা এই প্রভূত দাতব্য যুদ্ধ ক্ষেত্রের পরিস্থিতি দিয়েই ব্যাখ্যা করেছেন, যা মোটেও যোদ্ধাদের পক্ষে নেই. এটাও সত্যি যে, গতকালই খবর এসেছে যে, জঙ্গীরা আলেপ্পো প্রদেশে খান-এল-আসাদিয়া দখল করেছে. কিন্তু এটা সেই ধরনের খবর, যা সংবাদ মাধ্যম একেবারেই তুচ্ছ জিনিষ থেকে একটা চাঞ্চল্যকর ঘটনায় পরিণত করে – এই খবর দিয়ে সিরিয়ার জেনারেল মুহাম্মেদ ইসা বলেছেন:

“আমরা এখানে সবচেয়ে সাধারণ তথ্য যুদ্ধের মধ্যে রয়েছি. আসলে, সিরিয়াতে কয়েকটি জায়গা বাদ দিলে, খুবই কম এলাকা রয়েছে, যেখানে স্থায়ী ভাবে জঙ্গীদের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে. আর ব্যাপার হল যে, সরকারি ফৌজ একটি বা অন্য আরেকটি জনপদে জঙ্গী মুক্ত করার কাজ করে চলেছে. আর যেই, সেই এলাকা থেকে সরকারি ফৌজ সরে যাচ্ছে, সন্ত্রাসবাদীরা সেখানে ফিরে আসছে. এই প্রসঙ্গে তারা আবার সারা দুনিয়ার কাছে বলে বেড়াচ্ছে যে, তথাকথিত সিরিয়ার মুক্তি বাহিনী এই জায়গা দখল করে ফেলেছে.

যুদ্ধ ক্ষেত্রের পরিস্থিতি নিয়ে যা বলা যেতে পারে, তা হল যে, সরকারি ফৌজ দেশের নানা জায়গায় আক্রমণের বিষয়ে অগ্রগতি করেছে. এখন সামরিক বাহিনী দামাস্কাসের উপকণ্ঠ – কাবুন, বের্জে ও আল-গুটা আশ-শার্কিয়া জঙ্গী মুক্ত করছে. এখানেই মুখ্য সমস্যা রয়েছে – এখানে মাটির নীচে অনেক ছড়ানো সুড়ঙ্গ খোঁড়া হয়েছে, যা দিয়ে জঙ্গী পাঠানো হচ্ছে ও অস্ত্র দেওয়া হচ্ছে. তা তৈরী করার জন্য অনেক বছর লেগেছে. আমি এটা সেই বিষয় নিয়েই বলতে চাইছি যে, আমরা কি ধরনের “বিপ্লবের” সামনে পড়েছি, আর কখন তা তৈরী করা শুরু হয়েছে. তাছাড়া, হোমস শহরের কাছেও আক্রমণ করা হচ্ছে. এখানে সামরিক বাহিনীর অগ্রগতির পথ রোধ করে দিয়েছে সেই সুড়ঙ্গের নেটওয়ার্ক. সিরিয়ার উত্তর– পশ্চিমে সামরিক বাহিনী অপারেশন করেই চলেছে. এখানে কথা হচ্ছে ইডলিব শহরের উপকণ্ঠ ও লাতাকিয়া থেকে উত্তরের দিকের জায়গা নিয়ে. আর এখানে উল্লেখ করার দরকার হবে যে, সামরিক বাহিনী এখানেও খুব সফল ভাবেই কাজ করছে. শেষ অবধি, আলেপ্পো প্রদেশে এখন অবস্থান সংক্রান্ত লড়াই চলছে. কিছু এলাকা প্রায়ই হাত বদল হচ্ছে. সামরিক বাহিনী জঙ্গীদের অবস্থানের উপরে আঘাত হেনেই চলেছে”.

এখানে প্রশ্ন একটাই থেকে যাচ্ছে: কত দিন অবধি এই বিরোধ চলতে পারে? দামাস্কাসের প্রশাসন জঙ্গীদের ধ্বংস করা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কঠোর ভাবেই. তারাও, নিজেদের পক্ষ থেকে বাশার আসাদের প্রশাসনের পতন অবধি লড়াই চালিয়ে যেতে চায়. আর আমেরিকা ও আরব দেশ গুলির পক্ষ থেকে অস্ত্র দেওয়া জঙ্গীদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিয়েছে. কিছু পর্যবেক্ষক এই প্রসঙ্গে আলজিরিয়াতে গৃহযুদ্ধের কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন, যা দশ বছরের বেশী সময় ধরে চলেছিল. সিরিয়া এই পথ ধরেই কি যেতে চলেছে?

বহু বিশেষজ্ঞই এই সম্ভাবনাকে বাদ দেন নি. এই প্রসঙ্গে কনস্তানতিন সিভকভ কোফি আন্নানের কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন, যা তিনি প্রায় এক বছর আগে বলেছেন. তখন, রাষ্ট্রসঙ্ঘের বিশেষ প্রতিনিধি ও আরব লীগের পক্ষ থেকে বিশেষ প্রতিনিধি হিসাবে তিনি ঘোষণা করেছিলেন যে, সিরিয়ার সঙ্কট নিরসনের জন্য সমাধান রাশিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সমঝোতার মধ্যেই রয়েছে, এই প্রসঙ্গে কনস্তানতিন সিভকভ বলেছেন:

“আজ সিরিয়ার লোকরা কোন জঙ্গীদের সঙ্গে লড়াই করছে না, বরং করছে বেআইনি সামরিক বাহিনীর সঙ্গেই, যা তৈরী করা হয়েছে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদীদের দিয়ে, যারা ন্যাটো জোটের আলাদা কিছু দেশ থেকে অস্ত্র নিয়ে প্রশিক্ষণ পেয়ে সিরিয়া যাচ্ছে. ঠিক তাই কোফি আন্নান বলেছিলেন যে, ওয়াশিংটনকে ন্যাটো জোটের নেতৃত্ব হিসাবে মস্কোর সঙ্গে প্রাথমিক ভাবে সমঝোতায় আসতে হবে. যদি রাশিয়া ছেড়ে দেয়, তাহলে তার পরেই সিরিয়ার জনগনকে আত্মসমর্পণ করতে হবে. এই ক্ষেত্রে ন্যাটো জোট বেআইনি সেনা বাহিনী দিয়ে সিরিয়ার দখল নেবে ও সেখানে নিজেদের পছন্দমত এক হাতের পুতুল প্রশাসন তৈরী করে নেবে. আর যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে দেয়, তবে এই সব জঙ্গীরা বাস্তবে প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই সিরিয়াতে তাদের কাজ কারবার গুটিয়ে ফেলবে, আর এই দেশে সংবিধান সম্মত ভাবেই দেশের ভিতরে আভ্যন্তরীণ নিয়ম শৃঙ্খলা সংস্কার করা হবে, যা নতুন রাষ্ট্রপতি ও মন্ত্রীসভা স্থির করবে ও গণতান্ত্রিক সংস্কার সাধিত হবে”.

আপাততঃ মস্কো ও ওয়াশিংটন শুধু রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়া শুরু করার প্রয়োজনীয়তা নিয়েই সমঝোতায় আসতে পেরেছে. কিন্তু এই দিয়েই এখনও কাজ থেমে রয়েছে. রাশিয়া ও আমেরিকার কূটনীতিজ্ঞরা সিরিয়া নিয়ে নতুন জেনেভা সম্মেলনের তারিখ ঘোষণা করতে সঙ্কট বোধ করেছেন. আর আপাততঃ যতক্ষণ না আলোচনাকারীরা তাঁদের কথাবার্তা শুরু করছেন, ততক্ষণ পর্যন্ত বিরোধের পরিবর্তন সব দিক থেকে ও সম্পূর্ণ ভাবেই নির্ভর করবে যুদ্ধ ক্ষেত্রের পরিস্থিতির উপরেই.