কিম চেন ঈনের ছোট বোন কয়েকদিন আগে এক দায়িত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় পদে বহাল হয়েছেন. দক্ষিণ কোরিয়ার সংবাদ মাধ্যমে যেমন জানানো হয়েছে যে, ২৬ বছরের কিম ইও চ্ঝান রাষ্ট্রীয় প্রতিরক্ষা পরিষদের অনুষ্ঠান বিভাগের নেত্রী হয়েছেন. এই পদে তিনি সমস্ত রকমের অনুষ্ঠানের নেতৃত্ব দেবেন, যাতে কিম চেন ঈন নিজে অংশ নেবেন.

এটা ঠিকই যে, এই খবরের প্রতি সাবধান হওয়া দরকার. এটার ভিত্তি কানাঘুষো, আর সময়ের সাথে এমনটি খুবই হতে পারে যে, এই কানাঘুষোর সঙ্গে বাস্তবের কোনও মিল নেই. কিন্তু এই খবর যথেষ্ট সত্ বলেই মনে হচ্ছে. খুব সম্ভবতঃ, কিম ইও চ্ঝান যে দায়িত্ব পেয়েছেন, তা ঠিকই হয়তো ঘটেছে. আর তা একটা আসন্ন পরিবর্তনের ইঙ্গিত.

এখন অনেকেই ভুলে গিয়েছেন যে, ২০১১ সালের ডিসেম্বর মাসে, যখন কিম চেন ইর, কিম পরিবারের থেকে উত্তর কোরিয়ার দ্বিতীয় শাসক মারা গিয়েছিলেন, তখনও কিম চেন ঈনকে তাঁর উত্তরাধিকারী হিসাবে ঘোষণাও করা হয় নি. আপাত দৃষ্টিতে দেখলে কিম চেন ঈন, রাজনৈতিক মঞ্চে উদয় হয়েছিলেন শুধু ২০১০ সালে, তিনি দেশের উচ্চ পর্যায়ের নেতৃত্বের খালি আরেকজন সদস্য ছিলেন, আর ছিলেন সবচেয়ে অল্প বয়সী. কিন্তু খুব শীঘ্রই উত্তর কোরিয়ার উচ্চ পর্যায়ের নেতারা দেখিয়ে দিয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে ঐক্য ও গোষ্ঠীবদ্ধতা. আর কোন রকমের মতানৈক্য ছাড়াই তাঁরা কিম চেন ঈনকে স্বীকার করে নিয়েছিলেন দেশের সর্ব্বোচ্চ নেতা হিসাবে. কিন্তু দেশের নতুন নেতার একটি দুর্বল স্থান ছিল: তাঁর নিজের কোনও গোষ্ঠী ছিল না.

কেউই আশা করেন নি যে, কিম চেন ইর এত তাড়াতাড়ি ও হঠাত্ করেই মারা যাবেন. প্রাথমিক ভাবে ধরে নেওয়া হয়েছিল যে, কিম চেন ঈন বহু বছর ধরেই নিজের পিতার কাছে শিক্ষা পাবেন, আর একই সঙ্গে সেই সমস্ত লোকদের বেছে নেবেন, যাঁদের সঙ্গে নিয়ে তিনি দেশ শাসন করবেন. কিন্তু ইতিহাস অন্যরকম ব্যবস্থা নিয়েছে, ২০১১ সালের ডিসেম্বর মাসে কিম চেন ঈন দেশের নেতা হয়েছেন, কিন্তু তিনি শাসন করতে পেরেছেন শুধুই তাঁর পিতার পরামর্শদাতাদের সাহায্য নিয়ে.

এই প্রসঙ্গে বেশীর ভাগ উচ্চ পর্যায়ের সরকারি কর্মচারীরা, যাঁদের কিম চেন ঈন নিজের চারপাশে পেয়েছেন, তাঁর পিতার উত্তরাধিকার হিসাবে, তাঁরা সকলেই তাঁর চেয়ে ৩০-৪০ বছরের বড়. এই ধরনের বয়সের ক্ষেত্রে তফাত সব জায়গাতেই অনেক সমস্যার সৃষ্টি করতে পারত, কিন্তু বিশেষ সংজ্ঞা তা বহন করে কনফুশিয়স ধর্ম বিশ্বাসী দেশে, যেখানে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বয়সের পার্থক্য অনেকটাই অর্থবহ. এর সঙ্গে যোগ করা যেতে পারে যে, কিম চেন ইরের চারপাশে সেই সমস্ত লোক ছিলেন – যাঁরা বর্তমানের নেতার চেয়ে শুধু বয়সের ক্ষেত্রেই নয়, বরং দৃষ্টিকোণের দিক থেকেও আলাদা. তাই বোঝা সম্ভব যে, কিম চেন ঈনের কোন বাছাই করে নেওয়ার উপায় নেই, তাঁকে এই লোকদের সঙ্গেই কাজ করতে হবে, আর তা ধারণা করা যেতেই পারে যে, খুব একটা সহজ নয়.

একেবারে শুরু থেকেই স্পষ্ট ছিল যে, নতুন নেতা অবশ্যম্ভাবী ভাবেই নতুন প্রশাসনিক কাঠামো তৈরী করতে শুরু করবেন, যা মূলতঃ সেই সমস্ত লোকদের দিয়েই তৈরী হবে, যাঁরা কিম চেন ঈনের মতই তাঁর সঙ্গে বয়সে মিলবেন, আর জীবনের অভিজ্ঞতার বিষয়েও. এই ধরনের প্রশাসন তৈরী করতে মাত্র এক বছর সময় যথেষ্ট নয়, কিন্তু তার একটা বাইরের গঠন এখনই স্পষ্ট হয়েছে. কিম চেন ঈনের সময়ের একজন সরকারি কর্মচারীর চেহারা এই রকমের – ৩০-৩৫ বছরের মানুষ, যিনি দেশের বাইরে খুব সম্ভবতঃ প্রশিক্ষিত অথবা যিনি বাইরের দেশে প্রায়ই গিয়েছেন, আর কিম চেন ঈন ও তাঁর চারপাশের লোকদের একেবারে ছোট থেকেই চেনা.

উত্তর কোরিয়া সমাজ কিভাবে তৈরী সেটার কথা হিসাবের মধ্যে আনলে, উপরে লিখিত রূপ, শুধু দেশের উচ্চ পর্যায়ের সরকারি কর্মচারীদের প্রতিনিধিদের মধ্যেই থাকতে পারে. এক দিক থেকে - এঁরা কিম পরিবারেরই লোক, আর অন্য দিক থেকে - কয়েক ডজন মুষ্টিমেয় পরিবারের সদস্য, যাঁরা এই দেশ শাসন করছেন কিম ইর সেনের সময় থেকেই. শুধু এই লোকরাই, যাঁরা উত্তর কোরিয়াতে “পেক্তুসান মতবাদের” ধারক বলে পরিচিত, তাঁরাই শুধু বাইরে গিয়ে পড়াশোনা করতে পারেন, আর শুধু তাঁদেরই সুযোগ রয়েছে কিম চেন ঈনের সঙ্গে সেই সময়ে পরিচিত হওয়ার, যখন তিনি নিজে দেশের নেতা ছিলেন না.

এখানে সম্ভাব্য বলে ধরে নেওয়া হয়ে থাকে যে, কিম চেন ঈনের শাসনের প্রথম বছর গুলিতে কিম পরিবারের সদস্যদের সংখ্যা অনেকটাই বেড়ে গিয়েছে, যাঁরা দেশের উচ্চ পর্যায়ে পদ গুলিতে বহাল হয়েছেন. কিম চেন ঈনের নিজে কাজকর্ম করার বিষয়ে অভিজ্ঞতা কম, তাই খুবই সহজ ধরে নেওয়া যে, বেশীর ভাগ লোকই, যাঁদের তিনি ভাল করে জানেন ও বিশ্বাস করেন – এটা তাঁরই আত্মীয় স্বজন. সুতরাং কিম ইও চ্ঝান যে পদে বহাল হয়েছেন, এটা আসন্ন দেশের নেতৃস্থানীয় কর্মচারীদের পদে পরিবর্তনের ইঙ্গিতই হতে পারে.

খুব সম্ভবতঃ, এই পরিবর্তন যথেষ্ট প্রতিক্রিয়াশীল চরিত্রের হবে, সুতরাং আগামী তিন- চার বছর পরে উত্তর কোরিয়ার প্রশাসনে সম্পূর্ণ অন্য লোকরা থাকবেন. কিছু বয়স্ক ও ভেটেরান হয়তো প্রশাসনে টিকে যেতে পারেন, কিন্তু সব মিলিয়ে সময় আসছে যৌবনের. সেই সব লোক, যাঁরা ধরা যাক ২০১৭ সালে এই দেশের প্রশাসনে মুখ্য হবেন, তাঁদের বেশীর ভাগকে আমরা এখনও এমনকি নাম হিসাবেও জানি না – উত্তর কোরিয়ার বনেদী লোকরা তাঁদের পরিবারের শাখা প্রশাখা নিয়ে কোন হ্যান্ডবুক ছাপেন না. তবে এঁরা যে হবেন সব নতুন লোক, আর তাঁদের রাজনীতি, যা তাঁরা করবেন, খুব সম্ভবতঃ হবে নতুন, তা আশা করা যেতেই পারে.

p.s. পর্যবেক্ষক এখানে খালি নিজের মতই লিখেছেন, বাস্তব রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ও উত্তর কোরিয়ার রাজনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে অমিল থাকতেই পারে. “রেডিও রাশিয়ার” সম্পাদকীয় বিভাগ এই মত পোষণ করেন না.