ইজিপ্টের “মুসলমান ভাইদের” সংগঠন, যারা গত শুক্রবারে বহু লক্ষ সমর্থকদের সামরিক অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে রাস্তায় বের করে এনেছিল, তারা এই সপ্তাহে আবার করে গণ মিছিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে. তার ওপরে আবার এই মিছিল আজ সন্ধ্যা থেকেই শুরু হতে চলেছে ইসাম আরিয়ান নামের একমাত্র এই সংগঠনের আপাততঃ জেলের বাইরে থাকা নেতার আহ্বানে.

ইসাম আরিয়ান স্বাধীনতা ও ন্যায় দলের উপ সভাপতি, অর্থাত্ “মুসলমান ভাইদের” দলের রাজনৈতিক শাখার নেতা. এই দলের সভাপতি ৩রা জুলাই মুর্সিকে ক্ষমতাচ্যুত করার অব্যবহিত পরেই, অন্যান্য এই দলের নেতাদের মতোই গ্রেপ্তার হয়েছেন. এই দলের এক সবচেয়ে বিখ্যাত নেতা ইসাম আরিয়ান নিজেও আত্মগোপন করে আছেন. কিন্তু সাবধান হওয়ার ব্যবস্থা মেনেই তিনি “রেডিও রাশিয়াকে” এক বিশেষ সাক্ষাত্কার দিতে রাজী হয়েছেন. সাক্ষাত্কার নিয়েছেন রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের এশিয়া ও নিকট প্রাচ্য কেন্দ্রের প্রধান এলেনা সুপোনিনা.

প্রশ্ন : আপনি আবার ইজিপ্টের লোকদের রাস্তায় বের হতে ডাক দিয়েছেন – এবারে আজ থেকেই, অর্থাত্ সোমবারেই – রাষ্ট্রপতি মুহাম্মেদ মুর্সিকে ক্ষমতাচ্যুত করার প্রতিবাদে. কিন্তু আপনি কি মনে করেন না যে, এই ধরনের আহ্বান বিপজ্জনক ও তা সমাজে আরও বেশীকরেই বিভাজন ডেকে আনতে পারে?

উত্তর: আমি একেবারেই তা মনে করি না যে, এই মিছিল কোন রকমের বিপদ নিজে থেকে ডেকে আনতে পারে. অবশ্যই না. আর ইজিপ্টের সমাজে রাজনৈতিক বিভাজন এর অনেক আগে থেকেই রয়েছে. সেই যখন ২০১১ সালের ১৯শে মার্চ বিপ্লবের পরে, প্রথম জনমত গ্রহণ করা হয়েছিল দেশের সংবিধান সংশোধনের জন্য. তখন থেকেই এটা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল একেবারে দিনের আলোর মতই. এই মিছিল শুধু এটাই প্রমাণ করে দেয়, কিন্তু তা কোন ভাবেই বিভাজনে সহায়তা করে না. কিন্তু এটাও ঠিক যে, মিছিল দিয়ে সমস্যার সমাধান করা যাবে না. এটা করতে হবে আলোচনার মাধ্যমে ও নির্বাচনের মাধ্যমেই.

প্রশ্ন:তাহলে এই মিছিলের কি দরকার?

উত্তর: মিছিল করা দরকার এই কারণেই যে, যাতে সামরিক অভ্যুত্থানকে “না” বলা যায়. সামরিক অভ্যুত্থানকেই শেষ করে দেওয়া যায় – এটাই আমাদের ইজিপ্টে প্রতিবাদের আজ মুখ্য লক্ষ্য. রাজনৈতিক পথেই ফেরা দরকার আর দেশের সংবিধান অনুযায়ীই কাজ করা উচিত্.

প্রশ্ন:আপনি আলোচনার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন. তাহলে তো ইজিপ্টের বর্তমানের সরকার আপনাদের “মুসলমান ভাইদের” সংগঠনকে তো আলোচনার জন্য ডাক দিয়েছিল আর এমনকি মন্ত্রীসভাতেও আমন্ত্রণ করেছিল. আপনারা তাহলে আপত্তি করছেন কেন?

উত্তর: কারণ আমরা কোন রকমের অভ্যুত্থানকে মানি না. আমরা এই সরকারকে স্বীকার করি না আর এই তথাকথিত রাষ্ট্রপতিকেও স্বীকার করি না, যাকে রাষ্ট্রপতি ভবনে এই উলট পাল্টা করা লোকরা নিয়ে গিয়ে, রেখেছে. আমরা বর্তমানে চালু সংবিধান রদ করাকেও মানি না. আমরা চাই সব কিছুই যেন আইনের আওতায় ফেরে. যাতে সমস্ত কিছুই সংবিধান মেনে হয়.

প্রশ্ন: তা স্বত্ত্বেও, এই অভ্যুত্থান হয়েছে. আপনি কি সত্যই ভাবেন যে, সামরিক বাহিনীর লোকদের উপরে মিছিলের লোকরা প্রভাব ফেলতে পারবে? সত্যিই কি আশা করেন যে, আগের মতই সব কিছু ফিরে আসবে? এখন কি করা উচিত্?

উত্তর: আমরা দেশের জনগনের ইচ্ছার উপরে ভরসা করি. আমরা আস্থা রাখি যে, ইজিপ্টের লোকরা অভ্যুত্থান চান না. লোকে জোর দিয়ে চাইছেন যে, তাঁদের নির্বাচিত সেই সংবিধানের আওতায় যেন রাজনৈতিক প্রক্রিয়া বিকশিত হয়. ইজিপ্টে যারা অভ্যুত্থান করেছে, তাদের হার হবেই. সামরিক বাহিনীর লোকরা তাদের ঘাঁটিতে ফিরে যেতে বাধ্য. কারণ এটাও সংবিধানই দাবী করে. সামরিক বাহিনীর লোকরা রাজনীতি করতে পারেন না.

প্রশ্ন: রবিবারে ২১শে জুলাই সংবিধানের সংশোধন করার প্রস্তুতি নিয়ে সদ্য গঠিত পরিষদের প্রথম অধিবেশন হয়েছে. ইজিপ্টে আবার করে মূল আইন বদলানো নিয়ে আপনি কি মনে করেন?

উত্তর: ২০১২ সালে জনমত গ্রহণের ফলে, দেশের জনগন যে সংবিধান মেনে নিয়েছে, তাতে এই সংবিধানে সংশোধনের নিয়মের কথা রয়েছে, আর এই নিয়ম মানা উচিত্. তা নিয়ে অংশতঃ বলা রয়েছে সংবিধানেরই ২১৭ ও ২১৮ নম্বর ধারায়. সংশোধন যেমন রাষ্ট্রপতির অনুরোধে বিচার করা যেতে পারে, তেমনই তা দেশের পার্লামেন্টের দুই কক্ষের সম্মতি পেলেই তবে করা যেতে পারে. কিন্তু যে কোন ক্ষেত্রেই, তা দেশের পার্লামেন্টের পক্ষ থেকে মেনে নেওয়া দরকার. আর তা দুই কক্ষের পক্ষ থেকেই.

সুতরাং এর জন্য আগে দেশে পার্লামেন্ট নির্বাচন করা দরকার. আর পার্লামেন্টের পক্ষ থেকে সংবিধানে সংশোধনের বিষয়ে সম্মতি পেলে তবেই তা সমস্ত দেশবাসীর মত গ্রহণের জন্য বাইরে প্রকাশ করা উচিত্. অন্য যে কেন ধরনের সংবিধান বদল করার চেষ্টাই বেআইনি আর তা কোন ফল দিতে পারে না.

প্রশ্ন: ক্ষমতাচ্যুত রাষ্ট্রপতি মুহাম্মেদ মুর্সি বর্তমানে কোথায় রয়েছেন? আপনার এই বিষয়ে কি কিছু জানা আছে?

উত্তর: আমরা আন্তর্জাতিক সমাজের এই নীরব থাকাতে অবাক হয়েছি. ইজিপ্টের রাষ্ট্রপতি মুহাম্মেদ মুর্সি আইন সম্মত ভাবেই নির্বাচিত হয়েছিলেন ও তাঁকে বেআইনি ভাবে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছে. কেন সবাই চুপ করে আছেন! কেন রাষ্ট্রপতি পুতিন চুপ করে আছেন, যিনি নিজের কাছে আমাদের রাষ্ট্রপতিকে স্বাগত জানিয়েছিলেন আর তাঁর সঙ্গে আলোচনাও করেছেন! আর এখন রাশিয়ার রাষ্ট্রপতি আমাদের রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করতে চাইতেও তো পারতেন, তারই সঙ্গে খবর দাবী করতেও তো পারতেন. রাশিয়া আন্তর্জাতিক মঞ্চে খুবই প্রভাবশালী ও রাশিয়ার ওজনও অনেক, আর তাদের পক্ষ থেকে একটা কথাও যথেষ্ট হতে পারতো এই সব পুত্চ যারা করেছে তাদের উপরে প্রভাব ফেলার জন্য.

ইজিপ্টের রাষ্ট্রপতি অপহৃত. আর এটা অন্যান্য দেশের জন্য খুবই খারাপ উদাহরণ – দেখা যাচ্ছে যে, অভ্যুত্থান করা যেতেই পারে ও রাষ্ট্রপতিকে অপহরণ করা যেতেই পারে – আর সকলে তা দেখেও চুপ করে থাকবে!

প্রশ্ন: কিন্তু রাষ্ট্রপতি মুর্সি নিজেও তো নিজের পদে থাকার সময়ে ভুল করেছেন. সম্ভবতঃ, এই সব ভুলই বিপ্লবের সূচনা করেছে ও তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করেছে. আপনি এই মর্মে কি বলতে পারেন?

উত্তর: দেশের নেতৃত্ব করতে গিয়ে ভুল না করা অসম্ভব. সকলেই ভুল করেন. রাষ্ট্রপতি মুর্সি নিজের প্রকাশ্য ভাষণে এই ধরনের কিছু ভুল নিয়ে নিজেই বলেছিলেন. তার মধ্যে অনেক গুলিই সংশোধন করা হয়েছিল. আর, যে কোন ক্ষেত্রেই, আইন সঙ্গত উপায় রয়েছে প্রশাসনের উপরে প্রভাব ফেলার জন্য – নির্বাচনের মধ্য দিয়ে, পার্লামেন্টের মাধ্যমে. এটা মোটেও কোন কারণ নয়, যাতে দেশের আইন সম্মত ভাবে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতিকে সংবিধান অসম্মত ভাবে ক্ষমতাচ্যুত করা যেতে পারে বলে. সামরিক অভ্যুত্থানের কোন স্বীকারোক্তি হতে পারে না.

ইজিপ্টে পুত্চ হওয়ার পেছনে, আমাদের তথ্য অনুযায়ী বাইরের শক্তিরা রয়েছে. এটা আমেরিকা ও ইহুদীদের বিশেষ বাহিনী. আর তাদের সঙ্গে একই সঙ্গে রয়েছে পারস্য উপসাগরীয় এলাকার কিছু দেশের বিশেষ গুপ্তচর বাহিনীরাও.

প্রশ্ন: তা স্বত্ত্বেও, আপনি কি জানেন, কোথায় আপনার সহকর্মী ও রাষ্ট্রপতি মুহাম্মেদ মুর্সি এখন রয়েছেন? তিনি জেলে বন্দী নাকি গৃহবন্দী?

উত্তর: কি রকমের গৃহবন্দী তাঁকে রাখা যেতে পারে! কাউকে এমনকি গৃহবন্দী রাখতে হলেও নির্দিষ্ট রকমের বিচারের নিয়ম মানা দরকার, একটা রায় দেওয়া দরকার. রাষ্ট্রপতি মুর্সি স্রেফ অপহৃত হয়েছেন! রাষ্ট্রপতিকে অপহরণ করা হয়েছে – এটাই সঠিক সংজ্ঞা. তাঁর সঙ্গে কোন যোগাযোগ নেই. কোন আত্মীয় স্বজন, কোন বন্ধু বান্ধব, কোন সহকর্মী, কোন পরামর্শদাতা – কেউই তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে নি.

আমরা মুহাম্মেদ মুর্সির ভাগ্য নিয়ে খুবই চিন্তিত. আমরা জানি না, তাঁকে কোন রকমের চিকিত্সার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে কি না. আমরা জানি না, তাঁকে কিভাবে রাখা হয়েছে, খেতে দেওয়া হচ্ছে কি না? এখন মুসলমানদের উপবাসের মাস রমজান চলছে, রাষ্ট্রপতি সব সময়েই নিয়ম মেনে উপবাস রেখেছেন, কিন্তু আমরা জানি না যে, আজ তাঁর এই সব করার মতো কোন উপায় আছে কি না. আমরা আমাদের রাষ্ট্রপতিকে ফিরিয়ে আনতে চাই ও জানতে চাই, তাঁর কি হয়েছে. লোকে কেন রাস্তায় বের হয়েছেন, তার এটাও একটা কারণ.

প্রশ্ন: আপনিও সত্যই জানেন না, তিনি কোথায়?

উত্তর: আমরা, তিনি কোথায় জানি না. যদি এই অভ্যুত্থান বা পুত্চ যারা করেছে, তাদের একফোঁটাও ভদ্রতা বা সাহস থাকতো, তাহলে তারা অনেক দিন আগেই বলে দিতো মুহাম্মেদ মুর্সি কোথায় রয়েছেন. কিন্তু সামরিক বাহিনীর লোকরা ভয় পাচ্ছে যে, তাহলে লোকে যাবে মুর্সিকে ছাড়িয়ে আনতে, আর তাই তাঁর অবস্থান লুকিয়ে রেখেছে, কারণ তাঁর জন্য বহু লক্ষ লোকই ভোট দিয়েছেন. অভ্যুত্থান যারা করেছে, তারা এখনও রাষ্ট্রপতি মুর্সিকে ভয়ই পাচ্ছে.

প্রশ্ন: আপনাকেও তো খোঁজা হচ্ছে, যাতে গ্রেপ্তার করা যায়. মুসলমান ভাইদের অন্যান্য নেতারা সবাই তো জেলে. আপনি কি করে লুকিয়ে থাকতে পারছেন?

উত্তর: আমি একেক সময়ে স্থানীয় সংবাদ মাধ্যমে পড়ি আর নিজেই অবাক হই, আমাকে কি অভিযোগেই না অভিযুক্ত করা হচ্ছে! কিন্তু, জানেন তো, আমি আগের হোসনি মুবারকের প্রশাসনের সময়ে কম করে হলেও আটবার জেলে গিয়েছি. আমি জেলের ভিতরে সাড়ে আট বছরের বেশী সময় কাটিয়েছি, সুতরাং আমার গ্রেপ্তারকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই. আমি জেল ভয় পাই না. আর আমি শেষ অবধি আমাদের দেশের লোকের সঙ্গেই থাকবো. আমাদের বিরোধ মিছিল শান্তিপূর্ণ, আমরা এই অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেই যাবো.

তা না হলে, যদি পরবর্তী রাষ্ট্রপতিও সামরিক বাহিনীর পছন্দ না হয়, তাহলে, তারা তাঁকেও অপহরণ করবে. তাদের জনগনের নেওয়া সংবিধান পছন্দ হয় নি, তারা এটাকে রদ করেছে, বদলে দিচ্ছে. তারা জনগনের নির্বাচিত পার্লামেন্টকে পছন্দ করে নি, তাদের কাঠামোকে ভেঙে দিয়েছে. এই ভাবেই সামরিক বাহিনীর লোকরা ইজিপ্টকে একটা কানাগলিতে পৌঁছে দেবে. এই ধরনের পথ নিয়ে ইজিপ্টে কোন রকমের গণতন্ত্র আসবে না. পুত্চ যারা করেছে, তারাই ইজিপ্টে গণতন্ত্রকে হত্যা করছে.