ভারতে ইংরাজী ভাষা “খুবই ক্ষতি” নিয়ে এসেছে. এই চমকপ্রদ ঘোষণা কোন প্রফেসর ভাষাবিদ করেন নি, যিনি কোন অবাক করার মতো ভাষা বিদ্যার তত্ত্বে বিশ্বাস করেন, বরং করেছেন ভারতীয় বিরোধী পক্ষের এক নেতা – ভারতীয় জনতা পার্টির সভাপতি রাজনাথ সিংহ. রাজনীতিবিদ, এর আগে উত্তর প্রদেশ রাজ্যের মন্ত্রীসভার প্রধান ছিলেন ও তাঁকে পরোক্ষ প্রভাব নির্মূল করার জন্য পরস্পর বিরোধী উদ্যোগের জন্য মনে রাখা হয়েছে, তিনি এবারে ভারতীয়দের আহ্বান করেছেন প্রাচীন সংস্কৃত ভাষা শেখার জন্য - “মহাভারতের” ভাষা শিক্ষার কাজে. হঠাত্ করেই এই বিরোধী নেতার সংস্কৃতের প্রতি টান ব্যাখ্যা করা যেতে পারে কোন ভাষা জ্ঞান সংক্রান্ত বিষয় দিয়ে নয়, বরং ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচন এগিয়ে আসার সাথে সাথেই ভারতীয় জনতা পার্টি খুবই কষ্ট করে খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে নতুন ধরনের কোন একটা সর্বগ্রাসী ধারণা খুঁজে পেতে, যা তাদের আবার করে ক্ষমতায় ফিরে আসতে দেবে. প্রসঙ্গতঃ, আপাততঃ এই ধরনের খোঁজ খুব একটা সফল বলে মনে হচ্ছে না, এই রকম মনে করে আমাদের সমীক্ষক সের্গেই তোমিন বলেছেন:

“ইংরাজী ভাষা আমাদের দেশের বিশাল ক্ষতি করেছে. আমরা আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতিকে হারিয়ে ফেলছি, আজ খুবই কঠিন হয়ে যাচ্ছে সেই রকমের মানুষ খুঁজে পেতে, যিনি সংস্কৃত ভাষায় কথা বলেন, - ভারতের “দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া” কাগজ এই ভাবেই ভারতীয় জনতা পার্টির সভাপতি রাজনাথ সিংহের কথা উল্লেখ করেছে. এই প্রসঙ্গে ভারতের বিরোধী পক্ষের নেতা মোটেও ভয় পাননি, ভারতের শিক্ষিত ও পশ্চিম ঘেঁষা অংশের ক্ষোভকে, তিনি মত প্রকাশ করেছেন যে, ইংরাজী মত চাপিয়ে দেওয়ার ফলে, বিশেষ করে ইন্টারনেটের যুগে, ভারতীয় যুব সমাজের উপরে প্রভাব পড়ছে খুবই খারাপ রকমের”.

রাজনাথ সিংহের মন্তব্যকে একটা কৌতুক অথবা বাড়িয়ে বলা কথা বলে ধরা যেত, কিন্তু তিনি খুবই গুরুত্ব দিয়ে এই কথা বলেছেন, নিজের ভারতীয় ঐতিহ্যবাদী বিশ্বাস থেকেই. যত বেশী করেই ভারত বাইরের বিশ্বের কাছে খুলে যাবে, তত বেশী করেই এই বিশ্বাস হবে মজবুত.

এখানে খুবই মজার ব্যাপার হল যে, সব দেখে শুনে মনে হয়েছে যে, রাজনাথ সিংহ সংস্কৃতের সুবিধার কথা কিন্তু তাঁর দ্বারা এত বেশী নিন্দিত ইংরাজী ভাষাতেই করেছেন, অন্তত পক্ষে তিনি মোটেও সংস্কৃত ভাষাতে কথা বলেন নি. কিন্তু তাহলে বিজেপি দলের নেতার হঠাত্ এই প্রাচ্যের লাতিন ও “মহান” অথচ “মৃত”, “মহাভারতের” ভাষা, সংস্কৃত ভাষাকে মনে পড়ার কারণ কি?

এই প্রশ্নের উত্তর সহসাই সংস্কৃত দিয়ে দিয়েছে. ব্যাপার হল যে, সংস্কৃত – এটা ভারতীয় ধ্রুপদী সংস্কৃতির এক ভিত্তি স্তম্ভ, এটা এমন এক ভাষা, যার প্রাচীন কালে সমতূল্য কোনও ভাষা ছিল না. এমন কি ইউরোপের প্রাচ্য বিশারদরা স্বীকার করেন যে, প্রাচীন সংস্কৃত, প্রাচীন গ্রীক বা লাতিন ভাষার চেয়ে অনেক বেশী সমৃদ্ধ ছিল. তাই হঠাত্ করেই সংস্কৃত ভাষা, যা শুধু লিখিত অবস্থাতেই দুই হাজার বছর ধরে ছিল, তাকে ইউরোপের ভাষা গুলিকে নিয়ে গবেষণার কাজে একটা শুরু করার বিন্দু হিসাবে ব্যবহার করা হয় না, এই প্রসঙ্গে সের্গেই তোমিন বলেছেন:

“এটা ঠিকই যে, আজ খুবই নির্বুদ্ধিতার পরিচয় মনে হবে যে, সারা ভারত হঠাত্ করেই সংস্কৃত ভাষাতে কথা বলে উঠবে, “মহাভারতের” ভাষায়. আর এটাও ঠিক যে, তা কারোরই দরকার নেই, তার মধ্যে বিজেপির নেতাদেরও নয়, যারা ভালবাসেন নিজেদের আত্মগরিমা নিয়ে খেলা করে দেখতে – কখনও জিন প্রযুক্তি ব্যবহার করা খাদ্য নিষিদ্ধ করে, কখনও আবার “বিউটি কনটেস্ট” বন্ধ করার ব্যবস্থা করে, অথবা ভারতের সংস্কৃতির রক্ষার জন্য কিছু একটা আচমকাই করে”.

কিন্তু সংস্কৃত, ভারতীয় মহানত্বের এক বিতর্কের উর্ধে থাকা প্রমাণ – এটা একটা আদর্শ লক্ষ্য, যা রাজনৈতিক প্রচারে ব্যবহার করা যেতে পারে. তার ওপরে, এই লক্ষ্য আজ কারও অধীনে নেই. ভারতে আজ, কার দরকার পড়বে সংস্কৃত ভাষায়? তাই বিজেপি এই মাটিতে পড়ে থাকা, সোনার পাতের মতো মূল্যবান বস্তু কুড়িয়ে নিয়েছে, নিজেদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করার জন্যে. ব্যাপারটা এই রকমের যে, আমরা দেশের হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনবো আর তা বাইরের থেকে হওয়া ধ্বংস করার মতো প্রভাব থেকে, প্রাচীর দিয়ে ঘিরে রাখব. এই ঘোষণা খুবই বাস্তব সম্মত – কারণ ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের আর দেরী নেই. তার মধ্যে দেশের আনাড়ী নির্বাচকদের মধ্যে অনেকটা অংশ এই টোপ গিলে নিতে পারে, একটা প্রাক্ নির্বাচনী কাহিনী হিসাবে.

এখানে ন্যায্য থাকার প্রয়োজনে বলা দরকার যে, এই নতুন এক সর্বব্যাপী ধারণার জন্য জোর দিয়ে খোঁজ, যা বিজেপি দলকে ক্ষমতায় ফিরে আসতে সাহায্য করতে পারে, তা আপাততঃ নিজের বিরল হওয়া নিয়ে খুব একটা চমকে দেয় নি. যদিও, এটাও ঠিক যে, শেষ কথা বলার দায়িত্ব থাকবে নির্বাচকদের উপরেই. তাঁরাই ঠিক করবেন, কারা বেশী ভাল – ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস, নাকি ভারতীয় জনতা পার্টি, ইংরাজী নাকি সংস্কৃত.