নেলসন ম্যান্ডেলা আন্তর্জাতিক দিবস বিশ্বে পালিত হচ্ছে ১৮ই জুলাই. রাষ্ট্রসঙ্ঘের সাধারণ সভা ২০০৯ সালে এই দিনটিকে নির্দিষ্ট করেছে ও তা উত্সর্গ করা হয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকা প্রজাতন্ত্রের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ রাষ্ট্রপতির জন্মদিনটিতে. এই ভাবেই বিশ্ব সমাজ নেলসন ম্যান্ডেলাকে তাঁর শান্তি ও স্বাধীনতার কার্যকলাপে স্বীকৃতী দিয়েছে. ১৮ই জুলাই নেলসন ম্যান্ডেলার ৯৫ বছর বয়স হল.

বহু সহস্র দক্ষিণ আফ্রিকার লোক এই দিনে প্রিটোরিয়া শহরের হাসপাতালের কাছে এসেছেন, যেখানে নেলসন ম্যান্ডেলা চিকিত্সাধীন রয়েছেন. তাঁর যথেষ্ট বয়স ও কঠিন অসুখ – নেলসন ম্যান্ডেলার ফুসফুসে সংক্রমণ আবার করে দেখা দিয়েছে – স্বত্ত্বেও দক্ষিণ আফ্রিকার প্রাক্তন রাষ্ট্রপতির পরিস্থিতি ধীরেধীরে ভালোর দিকেই যাচ্ছে.

নেলসন ম্যান্ডেলা ১৯১৮ সালের ১৮ই জুলাই দক্ষিণ আফ্রিকার পূর্ব দিকের ক্যাপ প্রদেশে তেম্বু প্রজাতির মোড়লের পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেছিলেন. তিনি তাঁর পরিবারের প্রথম শিশু, যে স্কুলে গিয়েছিল, আর তারপরে ফোর্ট-হের বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন, সেই সময়ে এটাই একমাত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল, যেখানে কৃষ্ণাঙ্গ দক্ষিণ আফ্রিকার মানুষরা পড়াশোনা করার সুযোগ পেত.

১৯৪৪ সালে ম্যান্ডেলা আফ্রিকার জাতীয় কংগ্রেসের যুব লীগে যোগদান করেন ও খুব শীঘ্রই তিনি বর্ণ বৈষম্যের বিপক্ষে একজন সবচেয়ে সক্রিয় যোদ্ধায় পরিণত হয়েছিলেন. অনেক বছর পরে বিশ্ব সমাজ তাঁর অবদানকে খুবই মূল্যবান বলে স্বীকার করেছে, এই কথা উল্লেখ করে রুশ বিজ্ঞান একাডেমীর দক্ষিণ আফ্রিকা গবেষণা কেন্দ্রের মহিলা কর্মী আলেকসান্দ্রা আর্খাঙ্গেলস্কায়া বলেছেন:

“একটা সময় ছিল, যখন দক্ষিণ আফ্রিকায় সরকারি ভাবে বর্ণ বৈষম্যের রাজনীতি করা হত. নেলসন ম্যান্ডেলা আফ্রিকার জাতীয় কংগ্রেসের একজন নেতা ছিলেন. রাষ্ট্রসঙ্ঘের সাধারণ সভা ও সমস্ত বিশ্ব সমাজ আফ্রিকার জাতীয় কংগ্রেসের এই বর্ণ বৈষম্য বাদের বিরুদ্ধে লড়াইকে স্বীকৃতী দিয়েছিল আর যার ফলে, শেষ অবধি শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং সহমতে এসে সংখ্যালঘুদের উপরে বিশেষ কোন দমন-পীড়নের ব্যবস্থা না করেই এই দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষরা ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত হতে পেরেছিল”.

ম্যান্ডেলা আফ্রিকার জাতীয় কংগ্রেস দলের সামরিক শাখার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, যার নাম ছিল “জাতির বর্শা ফলক”. তাদের কাজ ছিল বর্ণ বৈষম্যের প্রতীকী জায়গা গুলিকে বিস্ফোরণে ধ্বংস করা, সেই ধরনের জায়গা, যেমন, পাসপোর্ট অফিস, গণ আদালত, সরকারি ভবন ইত্যাদি. তারা অবশ্য এই সব কাজ করার চেষ্টা করছে মানুষের শারীরিক ক্ষতি না করেই. ১৯৬২ সালে ম্যান্ডেলা এই বর্ণ বৈষম্য বাদী প্রশাসনের পতনের জন্য করা চক্রান্তের অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন ও তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়. শুধুমাত্র ১৯৯০ সালে তাঁকে জেল থেকে ছাড়া হয়. এই ঘটনা বিভিন্ন দেশের টেলিভিশন কোম্পানী থেকে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়েছিল. তাঁর মুক্তি দিবসে নেলসন ম্যান্ডেলা জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিয়েছিলেন. তিনি ঘোষণা করেছিলেন যে, দেশের শ্বেত গাত্র চর্মের মানুষদের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ ভাবে বিবাদ মিটিয়ে ফেলতে চান, কিন্তু তিনি বিশেষ করে উল্লেখ করেছিলেন যে, তাঁর প্রধান লক্ষ্য থেকে যাবে দেশের নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ কৃষ্ণাঙ্গ জনগনের ভোটাধিকারের প্রশ্ন.

১৯৯৪ সালে ম্যান্ডেলা দক্ষিণ আফ্রিকা প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন ও তিনি পাঁচ বছর ধরে দেশের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন. তবুও দেশের জনগন তাঁকে এখনও “মাননীয় রাষ্ট্রপতি” নামেই সম্বোধন করে থাকেন, এই কথা মনে করিয়ে দিয়ে রুশ বিজ্ঞান একাডেমীর আফ্রিকা ইনস্টিটিউটের কর্মী ভ্লাদিমির শুবিন বলেছেন:

“ম্যান্ডেলা একেবারে শুরু থেকেই বলেছিলেন যে, তিনি শুধুমাত্র একটি মেয়াদের জন্যই রাষ্ট্রপতি হবেন, আর সেই আশ্বাস তিনি পালন করেছিলেন. তিনি সঙ্গে সঙ্গেই তথাকথিত “শান্তির পথ” নিয়েছিলেন, সকলকে আহ্বান করেছিলেন গণতান্ত্রিক দক্ষিণ আফ্রিকা গঠনের কাজে. তখন থেকেই এই “রামধনু জাতি” পরিভাষা চালু হয়ে যায়, এর অর্থ হল, যে জাতিতে সমস্ত গাত্র বর্ণের মানুষ রয়েছেন, রামধনুর মতোই. আর ম্যান্ডেলা নিজে পদত্যাগ করার পরেও একই ভাবে তাঁর কাজ করে গিয়েছেন. তাঁর বর্ণ বৈষম্য বাদী প্রশাসনের অপসরণের বিষয়ে সহায়তা আর তার সঙ্গে সিদ্ধান্ত মূলক পদ্ধতিতে কাজ করা আর একই সময়ে রাজনৈতিক সহমতে পৌঁছনোর জন্য সদিচ্ছা, কোন রকমের পদকে আঁকড়ে ধরতে না চাওয়া, - এই সবই প্রভূত শ্রদ্ধার উদ্রেক করে”.

ঐতিহ্য মেনেই নেলসন ম্যান্ডেলার জন্মদিনে রাষ্ট্রসঙ্ঘ প্রত্যেক ব্যক্তিকে ৬৭ মিনিট ব্যয় করতে আহ্বান করেছে অন্যকে সহায়তা দেওয়ার জন্য. ঠিক এত গুলি বছরই নিজের জীবনে নেলসন ম্যান্ডেলা ব্যয় করেছেন শান্তি ও মানবাধিকারের প্রতিরক্ষায় ও মানবিক কাজকর্মে, তা যেমন রাজনৈতিক বন্দী হিসাবে, তেমনই আন্তর্জাতিক মাপের এক শান্তি কর্মী হিসাবে. ১৯৯৩ সালে তাঁর কর্মের জন্যই তাঁকে নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছিল.