মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবারে আফগানিস্তান ছেড়ে যাচ্ছে, পেছনে রেখে যাচ্ছে অর্ধেক ধ্বসে পড়া এক রাষ্ট্র ও বহু শত কোটি ডলার, যা এই আফগানিস্তানের জমিতেই তারা আক্ষরিক অর্থে প্রোথিত করে রেখে যাচ্ছে.

কিছু তথ্য অনুযায়ী আমেরিকার পক্ষ থেকে আফগানিস্তানের যুদ্ধের জন্য সেই দেশের করদাতাদের ৬৩ হাজার কোটি ডলার খরচা হয়েছে. আফগানিস্তানের এই কারবার ছেড়ে বের হতে গেলেও তাদের মোটা অঙ্কের অর্থ খরচ কতে হবে. বিশেষজ্ঞরা বলছেন প্রায় ৮ হাজার কোটি ডলারের কথা. সন্দেহবাদীরা মনে করেছেন, এটাও কম করে বলা হচ্ছে.

সমস্যা আরও সেই ব্যাপারে যে, আমেরিকার লোকদের নিজেদের সামরিক প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতি নিয়ে কোথাও কিছু করার উপায় নেই. উল্টো দিকে তা টেনে নিয়ে যাওয়া খুবই ব্যয়বহুল বিষয়. আফগানিস্তানের লোকদের তা মানবিক সহায়তা হিসাবে দিয়ে দেওয়াও অন্য এক ধরনের চিন্তা থেকে করা সম্ভব নয়. এই প্রসঙ্গে সামাজিক-রাজনৈতিক গবেষণা কেন্দ্রের ডিরেক্টর ভ্লাদিমির ইভসেয়েভ বলেছেন:

“আফগানিস্তানের সামরিক বাহিনীকে ভারী অস্ত্র প্রযুক্তি দিয়ে দেওয়া নিয়ে ভাবা হয় নি, কারণ একটা বিপদের আশঙ্কা রয়েছে যে, এই দেশের কিছু সামরিক বাহিনীর লোক অবধারিত ভাবেই তালিবদের পক্ষে চলে যাবে. এই ক্ষেত্রে সেই সমস্ত লোকদের সঙ্গে লড়াই করতে হবে, যাদের কাছে একেবারে সর্বাধুনিক অস্ত্র থাকবে. এই ধরনের অস্ত্র পাকিস্তানকে দেওয়ার কথা ভাবা হয়েছিল. আর এটাই, এই পরিস্থিতি থেকে বের হওয়ার সবচেয়ে ভাল উপায় হতে পারতো বলে দেখা গিয়েছিল, তার মধ্যে সেই বাস্তবকে হিসাবের মধ্যে আনলে যে, পাকিস্তান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তৈরী অস্ত্রশস্ত্রই ব্যবহার করে. কিন্তু এই ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের জন্য কাবুলের সঙ্গে সম্পর্কে খুবই গুরুতর ক্ষতি হতে পারে, এমন আশঙ্কা রয়েছে. কারণ পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে খুবই জটিল সম্পর্ক বজায় রয়েছে.

তাছাড়া চিন্তা করে দেখা হয়েছিল মধ্য এশিয়ার আলাদা কিছু দেশকে এই অস্ত্র দেওয়া নিয়ে. অংশতঃ, কথা হয়েছিল তাজিকিস্থান, উজবেকিস্তান ও কিছু অংশে তুর্কমেনিয়াকে নিয়ে. কিন্তু এই সব রাষ্ট্রে অস্ত্র দেওয়া সম্ভব হয়ে ওঠে নি. বোধহয়, এই সব অস্ত্রের পরিষেবা দেওয়ার সমস্যার জন্যই. এটা অনেক আর্থিক ব্যয়সাপেক্ষ বিষয় বলে”.

আমেরিকার লোকদের আর কিছুই করার বাকী নেই, স্রেফ এই অস্ত্র ধ্বংস করে ফেলা ছাড়া. অংশতঃ সেই ধাতব খণ্ড হওয়ার জন্য অপেক্ষায় রয়েছে প্রায় দুই হাজার সাঁজোয়া গাড়ী. ২০১৪ সালের শেষে আমেরিকার সেনা বাহিনী প্রায় সাতশো কোটি ডলার মূল্যের অস্ত্র স্রেফ ধাতব খণ্ডে পরিণত করতে চলেছে.

এখানে হিসাব করা হয়েছে আমেরিকার লোকরা আফগানিস্তানের সামরিক বাহিনীর প্রশিক্ষণের জন্যও পাঁচ হাজার পাঁচশো কোটি ডলার খরচ করেছে. এই অর্থ খরচা করার সার্থকতা নিয়েও অনেক মতামত রয়েছে. নিউ ইয়র্ক টাইমস কাগজের তথ্য অনুযায়ী আফগানিস্তানের সামরিক বাহিনীতে সরকারি ভাবে ঘোষিত তিন লক্ষ সেনার জায়গায় এক লক্ষ কুড়ি হাজারের বেশী নেই. এই রকমের “মৃত আত্মা” সংক্রান্ত তফাতের কারণ হল, নাম তালিকাতে রাখা হয়েছে স্রেফ তাদের নামে দেওয়া বেতন, ভাগ করে নেওয়ার জন্যেই. এই বিষয়ে আবারও ভ্লাদিমির ইভসেয়েভ বলেছেন:

“আমি মনে করি যে, আফগানিস্তানের সেনা বাহিনীকে প্রশিক্ষণের জন্য খরচ করা অর্থের ফলপ্রসূতা মোটেও উচ্চ স্তরের নয়. এটা খুব দ্রুত প্রশিক্ষণ দেওয়ার প্রচেষ্টার ফলেই হয়েছে. আর তা ছাড়া, যাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে, তারাও যথেষ্ট রকমের ভরসা যোগ্য লোক নয়. দেখাই যাচ্ছে যে, তাদের একাংশ তৈরী রয়েছে হামিদ কারজাইয়ের বিরোধী পক্ষে যোগ দেওয়ার জন্য তৈরী. এখানে যত না প্রশিক্ষণের ফলপ্রসূতা নিয়ে বলা দরকার, তার চেয়েও বেশী বলা দরকার যে, আফগানিস্তানের সেনাবাহিনী কি বর্তমানের প্রশাসনকে সমর্থন করতে পারবে. এই প্রশ্ন আমেরিকার প্রশিক্ষকদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না. বর্তমানের আফগানিস্তানের সামরিক বাহিনী মানসিক ভাবে স্থিতিশীল নয়. এই দৃষ্টিকোণ থেকে বিনিয়োগ করা অর্থের ফল খুবই নীচু মানের”.

সব মিলিয়ে, আমেরিকার ডলার দিয়ে কাবুলের প্রশাসনকে ফাঁপিয়ে তোলার কোন মানে হয় না. অন্তত পক্ষে সেই কারণে যে, আফগানিস্তানে পশ্চিমের মান অনুযায়ী তৈরী রাষ্ট্র প্রশাসনের ব্যবস্থা কিছুতেই সেখানে টিকে থাকতে পারে নি. বর্তমানের প্রশাসন আধুনিক গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান দিয়ে তৈরী এক টলমলে কাঠামো, যা দাঁড়িয়ে রয়েছে পরিবার তন্ত্রের ভিত্তির উপরে স্থাপিত এক সমাজের মধ্যে, তাই আধুনিক আফগানিস্তান অনুসন্ধান কেন্দ্রের বিশেষজ্ঞ নিকিতা মেন্দকোভিচ বলেছেন:

“আফগানিস্তানে রাষ্ট্র প্রশাসনের সৃষ্টি করা – এটা অনেকাংশেই ঐতিহ্য মেনে চলা সমস্যা, যার সঙ্গে সমস্ত বিংশ শতাব্দী ধরেই ঠোক্কর খাওয়া চলেছে – আর তা সোভিয়েত সামরিক উপস্থিতির সময়েও ছিল, আর তার আগে এবং পরেও ছিল. আফগানিস্তানের সমাজের সামাজিক গঠনে খুবই শক্তিশালী হল বংশ ও পরিবার সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠান গুলি. আর এটাই খুব কঠিন করে তোলে সাধারণ রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে, এই দেশে পত্তন করার বিষয়ে. এখানেই দুর্নীতির উদয় হয়, আর যথেষ্ট রকমের শিক্ষিত সরকারি কর্মচারীর অভাব প্রকট হয়ে পড়ে. কারণ এই দেশে সাধারণ শিক্ষার মানই খুব নীচুতে রয়েছে. সরকারি ভাবে রাষ্ট্রীয় সংস্থা গুলির বিরুদ্ধে স্থানীয় পরিবার গুলি বিরুদ্ধাচরণ করে থাকে, তাতে পরিবার সংক্রান্ত আইন ও ধারণা গুলিই এগিয়ে থাকে. আফগানিস্তানকে আরও দীর্ঘদিন ধরেই এই সমস্যার সমাধান করতে হবে”.

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে আফগানিস্তানের এই অভিযান অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে খুবই বিফল হয়েছে. কিন্তু এটাই মোদ্দা কথা নয়. আমেরিকা এখান থেকে যাচ্ছে মানসিক ভাবে হেরে গিয়ে. সেই প্রবচনে যেমন বলা হয়ে থাকে – “নিজের পয়সায় নিজেই শুয়োরের বাচ্চা” হয়ে.