সিরিয়ার জঙ্গীরা যে রাসায়নিক অস্ত্রের ব্যবহার করেছে, তা নিয়ে একেবারে অকাট্য প্রমাণ রাশিয়া তুলে দিয়েছে রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য দেশ গুলির হাতে. এই নিয়ে রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রী সের্গেই লাভরভ ও রাষ্ট্রসঙ্ঘে রাশিয়ার স্থায়ী প্রতিনিধি ভিতালি চুরকিন সকলকে বলেছেন.

সিরিয়াতে বর্তমানে ক্ষমতাসীন প্রশাসনের নামে এই ধরনের মারণাস্ত্র ব্যবহার নিয়ে পশ্চিমের নেতৃবর্গের বহু সংখ্যক ভিত্তিহীন অভিযোগের প্রত্যুত্তরে রাশিয়া প্রস্তাব করেছে একেবারে বাস্তব তথ্যের ভাষায় কথাবার্তা বলতে. ভিতালি চুরকিনের ভাষায়, এই বিষয়ে তদন্ত একেবারে নির্দিষ্ট করে প্রমাণ করে দিয়েছে যে, ১৯শে মার্চ আলেপ্পো শহরের উপকণ্ঠে জঙ্গীরা বিষাক্ত জারিন গ্যাস ব্যবহার করেছিল, যার ফলে প্রায় জনা তিরিশেক মানুষের মৃত্যু হয়েছে. রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রী সের্গেই লাভরভ এই তদন্তের ফলাফল নিয়ে খুবই বিস্তৃত ভাবে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন:

“আমাদের বিশেষজ্ঞরা নমুনা সংগ্রহ করেছেন, তারা সেগুলিকে রাসায়নিক অস্ত্র নিষিদ্ধ করার সংস্থা স্বীকৃত ল্যাবরেটরীতে পরীক্ষা করে দেখেছেন ও সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, এই গোলা ও তার মধ্যে থাকা জারিন গ্যাস – হাতে বানানো. সেখানে একেবারেই স্পষ্ট ও কোন রকমের দ্বিমত থাকতে পারে এমন সম্ভাবনা না রেখেই সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে, যাতে এই গোলার চরিত্র ও এই জারিন গ্যাসের নমুনা সেই মানের সঙ্গে একেবারেই মেলে না, যা সামরিক শিল্পে বানানোর সময়ে মেনে চলা হয়. আমাদের বাড়তি তথ্য অনুযায়ী এই গোলা ও তার মধ্যের জিনিষ ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে বানানো হয়েছিল সিরিয়ার এলাকাতেই, যা তখন স্বাধীন সিরিয়ার বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে ছিল, আর তা বানিয়েছে এক গোষ্ঠী, যারা এই স্বাধীন সিরিয়ার সামরিক বাহিনীর সঙ্গেই যুক্ত রয়েছে”.

এই ধরনের তথ্য অনেকেরই ভাল লাগবে না. আর তা প্রাথমিক ভাবে তাদের, যাদের স্বার্থ যে কোন মূল্যে বিশ্বকে উল্টো বিষয়ে রাজী করানো. আর সেই ধরনের লোকের সংখ্যা যথেষ্ট. যেমন, রাজনৈতিক ও সামরিক লবি করা লোকরা, যারা কিছু পশ্চিমের ও প্রাচ্যের দেশে রয়েছেন, যাদের পক্ষে লাভজনক সিরিয়ার বিরোধী পক্ষকে অস্ত্র সরবরাহ করার সিদ্ধান্তকে জোর দিয়ে ঠেলা. আর এটা শুধু ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রশ্নই নয়, বরং আর্থিক বিষয়েও বটে. যদিও আমেরিকার পার্লামেন্ট রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামার পক্ষ থেকে সিরিয়ার বিরোধী পক্ষকে অস্ত্র সরবরাহের সিদ্ধান্তে ভেটো প্রয়োগ করেছে, তবুও পেন্টাগনের প্রতিনিধির করা ঘোষণা অনুযায়ী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জঙ্গীদের সহায়তা দেওয়ার জন্য উপায় বার করার প্রচেষ্টা চালিয়েই যাবে. যাদের মস্কোর “কাটা ঘায়ে নুন ছেটানোর” উদ্দেশ্য রয়েছে, তাদের পক্ষে লাভজনক হয় আন্তর্জাতিক সমাজকে বিশ্বাস করানো, বাশার আসাদের “নৃশংস আচরণ” সম্বন্ধে, আর সেটা জোর গলায় প্রমাণ করার চেষ্টা করে যে, মস্কো এই অপরাধী প্রশাসনকে পৃষ্ঠপোষকতা করছে. সিরিয়ার বিরোধী পক্ষও খুবই গূঢ় উদ্দেশ্য নিয়ে নিজেদের অপকর্মকে লুকিয়ে ফেলতে চাইছে আর তাদের অপরাধ বিরুদ্ধ পক্ষের ঘাড়ে চাপাতে চাইছে. এটা আরও একটি এই সব “মুক্তি যোদ্ধাদের” বাইরের দেশ থেকে সাহায্যের প্রয়োজন প্রমাণের, যুক্তি.

এই প্রসঙ্গে একেবারে সাধারণ যুক্তিই দেখিয়ে দিচ্ছে যে, এই বহুদিন ধরে চলতে থাকা নাটকে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করা শুধু এক “পক্ষের” জন্যই লাভজনক নয় – বাশার আসাদের নিজেরই. সামরিক বাহিনীর লোকরা স্পষ্ট দেখতে পাওয়ার মত সাফল্য লাভ করছে, আর এই ধরনের নির্দিষ্ট একক কোন জায়গায় নিষিদ্ধ অস্ত্র প্রয়োগ করে আঘাত হানা, যার চিহ্ন কোন রকম ভাবেই লুকিয়ে ফেলা বাস্তবে সম্ভব নয়, তা তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের সমাধিই করতে পারে ও সামগ্রিক ভাবে সমস্ত রকমের আন্তর্জাতিক শান্তি উদ্যোগকেও.

কিন্তু এমনকি এর পরেও যখন ৮০ পাতার রুশ রিপোর্ট আমেরিকার লোকদের হাতে পড়েছে, পররাষ্ট্র দপ্তরের সরকারি মুখপাত্র জেনিফার প্সাকি ঘোষণা করেছেন যে, ওয়াশিংটন আরও বেশী করেই “এখনও বিশ্বাস করছে না যে, সিরিয়াতে বিরোধী পক্ষই রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করেছে”. যেন এটা বিশ্বাস বা অবিশ্বাসের প্রশ্ন, কোন অকাট্য প্রমাণের ব্যাপার নয়, যা রাশিয়ার বিশেষজ্ঞরা সংগ্রহ করেছেন.

জেনিফার প্সাকি যোগ করেছেন যে, “রাশিয়া রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের রাসায়নিক অস্ত্র নিয়ে তদন্ত করার প্রচেষ্টায় বাধা দিচ্ছে”. ভিতালি চুরকিন এই প্রসঙ্গে খুবই যুক্তিসঙ্গত ভাবে উল্লেখ করেছেন যে, এই ধরনের সিদ্ধান্ত নিরাপত্তা পরিষদ নেয় না, বরং নিয়ে থাকে সিরিয়ার প্রশাসন, এক সার্বভৌম দেশ হিসাবেই. আর তারা, বিশেষ করে, এটা কোনদিনই এড়িয়ে যেতে চায় নি, বরং উল্টো দামাস্কাসের উদ্যোগেই সুইডেনের প্রফেসর ওকে সেলস্ট্রম- এর নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক পরিষদ তৈরী হয়েছে, যারা এই দেশে প্রবেশের অপেক্ষায় রয়েছে.

এখানে উল্লেখ করা উচিত হবে যে, কয়েকদিন আগে এক খুবই আচমকা ঘোষণা করা হয়েছে লন্ডন থেকে. গ্রেট ব্রিটেনের গুপ্তচর ও নিরাপত্তা পরিষদের রিপোর্টে বলা হয়েছে যে, বাশার আসাদের ক্ষমতা থেকে অপসারণের ফলে এই দেশে থাকা রাসায়নিক অস্ত্রের ভাণ্ডার জঙ্গী ও সন্ত্রাসবাদীদের হাতে পড়তেই পারে, যা এক বিপর্যয় হওয়া মতো পরিণতি নিয়ে আসতে পারে. একই সময়ে সুইজারল্যান্ডের সংবাদ মাধ্যম এমন সব তথ্য প্রকাশ করেছে যা, ফ্রান্সের পররাষ্ট্র মন্ত্রী লোরান ফাবিউসের দামাস্কাসকে নিষিদ্ধ বস্তু প্রয়োগের অভিযোগের ভিত্তিহীন হওয়াই প্রমাণ করেছে. সুতরাং, জারিন ও অন্যান্য বিষাক্ত বস্তুর চারপাশে তৈরী করা রাজনৈতিক কুচক্র, তাদের সম্বন্ধে বাস্তব ঘটনা জানার বিষয়ে গঠনমূলক উদ্যোগকেই, এবারে পথ ছেড়ে দিতে বাধ্য. শুধু, যারা সিরিয়াকে সেই দেশের আইন সঙ্গত প্রশাসন থেকে বঞ্চিত করতে চাইছে, তাদের ক্ষেত্রে এই লক্ষ্য দেখা যাচ্ছে, খুব কমই রয়েছে. আর সিরিয়ার জনগনের স্বার্থ এই রকমের বড় ও অসত্ ভূ-রাজনৈতিক খেলায়, যারা নিষ্ঠুর সমস্ত ব্যবস্থা নিতে চায়, তাদের জন্য খুব কমই হিসাবের মধ্যে আসে.