ভারত ও শ্রীলঙ্কা এই দ্বীপে জাতীয় শান্তি সমস্যা সমাধানের জন্য বেশী করে তামিল প্রজাতি অধ্যুষিত এলাকা গুলিকে স্বয়ং শাসনের সুবিধা দেওয়ার মাধ্যমে নতুন এক চেষ্টা করে দেখেছে. ভারতের প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা সংক্রান্ত উপদেষ্টা শিবশঙ্কর মেনন কলম্বো এসে শ্রীলঙ্কার প্রশাসনকে আহ্বান করেছেন শান্তি প্রচেষ্টায় নিজেদের দায়িত্ব ছেড়ে সরে না আসতে, যা ১৯৮৭ সালে দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা অনুযায়ী লেখা হয়েছিল ও স্থানীয় প্রশাসনকে বেশী করেই দায়ভার দিতে, যা এই দেশের সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনে বলা হয়েছে, তার চেয়ে. কিন্তু নয়াদিল্লীর জন্য হতাশার কারণ হয়েছে শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্রপতি মাহিন্দা রাজপক্ষে ভারতীয় পরামর্শদাতাকে প্রত্যুত্তরে জানিয়েছেন, এই প্রসঙ্গে তাঁদের ভদ্র ভাবেই দেওয়া নেতিবাচক অভিমত. এই ধরনের অবস্থান সম্পূর্ণভাবেই যুক্তিসঙ্গত, এই রকম মনে করেন আমাদের সমীক্ষক সের্গেই তোমিন, তামিলদের আন্দোলনকে ধ্বংস করে লঙ্কার নেতা “বড় ভাই” ভারতকে বুঝতে দিয়েছে যে, তারা এবারে কোন রকমের পরামর্শ ছাড়াই চলতে শিখে নিয়েছে ও তাই তোমিন বলেছেন:

“বিগত বছর গুলির তুলনায়, যখন এই দ্বীপে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন, দিল্লী ও কলম্বো, এই দুই রাজধানীর মধ্যে আলোচনা করেই স্থির হত, এবারে শ্রীলঙ্কার রাজধানীতে আলোচনা কোন রকমের কথোপকথনে পরিণত হয় নি, বরং হয়েছে দুই পক্ষের তরফ থেকে একতরফা বলা. প্রসঙ্গতঃ, দুই পক্ষই খুব একটা আশা করে নি যে, অপর পক্ষ তাদের শুনবে”.

নিজেদের আলোচনার সময়ে ভারতের পক্ষ থেকে উচ্চপদস্থ প্রতিনিধি চেষ্টা করেছেন দিল্লীর ভূমিকাকে মুখ্য আন্তর্জাতিক ক্রীড়নকের মতো করেই প্রমাণ করতে, যারা বহু দশক ধরেই লঙ্কার তামিলদের ভাগ্য নির্ধারণ করে এসেছে. সরকারি ফৌজ ও “তামিল ইলমের টাইগারদের” মধ্যে সশস্ত্র যুদ্ধ শেষ হওয়ার চার বছর বাদে “তামিলদের সমস্যাকে” নয়াদিল্লী শ্রীলঙ্কার সরকারের কাছে এখনও সমাধান হয় নি বলে স্বীকার করতে আহ্বান করতে বলেছে. যুদ্ধক্ষেত্রে বিজয়ের অর্থ এই নয় যে, এই দ্বীপে জাতীয় ঐক্যতান ফিরে এসেছে. আর এই “টাইগারদের” ধ্বংস করে দেওয়া বহু সংখ্যক সমালোচনাকেই সামনে নিয়ে এসেছে, যা এই “ধ্বংসযজ্ঞের মূল্য” নিয়েই করা হয়েছে – তামিল প্রজাতির জনসংখ্যার মধ্যে বলিদানের সংখ্যার প্রশ্ন ও তাদের অধিকার খর্ব করা নিয়ে – আর তা মোটেও গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা বলে নিজে থেকেই পরিচয় পেতে পারে না, এই প্রসঙ্গে রুশ বিশেষজ্ঞ সের্গেই তোমিন বলেছেন:

“এই দেশের সংখ্যালঘু তামিল সম্প্রদায় অধিক পরিমাণে অধ্যুষিত দেশের উত্তর পশ্চিমের এলাকা গুলিকে বেশী করে স্বয়ং শাসনের অধিকার দেওয়ার প্রক্রিয়া গত দশক ধরে করা হয়েছে সেই নীতি মেনেই যে, “এক পা আগে তো দুই পা পেছনে”, আর এই প্রক্রিয়া শেষ অবধি করাও হয় নি, যদিও আজ থেকে প্রায় পঁচিশ বছর আগেই ১৯৮৭ সালে, ভারত ও শ্রীলঙ্কার মধ্যে স্বাক্ষরিত হওয়া তথাকথিত কলম্বো চুক্তি অনুযায়ী খুবই স্পষ্ট করে লেখা হয়েছিল, তামিল সম্প্রদায়ের ঘন সন্নিবদ্ধ ভাবে বাসভূমি গুলিতে প্রাদেশিক সভার ব্যবস্থা করে দেওয়া নিয়ে. যেমন আশা করা হয়েছিল যে, এই স্থানীয় স্বয়ং শাসনের হাতে দেওয়া হবে খুবই প্রসারিত ভাবে ক্ষমতা ও দায়িত্ব আর তা শ্রীলঙ্কার সংবিধানের ১৩ নম্বর ধারাতেও সংশোধনের ভিত্তি হিসাবে নেওয়া হয়েছিল. আর আজ ভারতীয় পক্ষ থেকে কলম্বোকে আরও গুরুতর সংশোধনের পথে চলতে আহ্বান করা হয়েছে, সেই তের নম্বর ধারাতে যা বলা হয়েছে, তার চেয়েও বেশী করে. কারণ একমাত্র সেই ভাবেই দিল্লীর মতে, তামিল অধ্যুষিত এলাকা গুলিতে কেন্দ্রীয় প্রশাসনের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে”.

কিন্তু শিবশঙ্কর মেনন কলম্বো শহরে স্পষ্টতঃই সেই উত্তর শুনতে পান নি, যা তিনি আশা করেছিলেন. রাষ্ট্রপতি রাজপক্ষে ঘোষণা করেছেন যে, এই প্রশ্নের সমাধানের জন্য সবচেয়ে ভাল মঞ্চ হতে পারে বিশেষ পার্লামেন্ট পরিষদ. কিন্তু সেই সমস্ত পর্যবেক্ষকদের, যাঁরা শ্রীলঙ্কার সমস্যা সমাধানের দিকে লক্ষ্য রেখেছেন, তাঁদের এই পরিষদের নিরপেক্ষতার বিষয়েই প্রশ্নের উদ্রেক হয়েছে. কারণ পরিষদ, যাতে ১৯ জন পার্লামেন্ট সদস্য রয়েছেন, তাঁরা সকলেই ক্ষমতাসীন দলের প্রতিনিধি, আর একজনও তামিল জাতীয় জোটের সদস্য নন এবং একজনও দেশের প্রধান বিরোধী শক্তি ঐক্যবদ্ধ জাতীয় দলের প্রতিনিধি নেই.

সব মিলিয়ে রাষ্ট্রপতি রাজপক্ষে ভারতের “বড় ভাইদের” বুঝতে দিয়েছেন যে, “টাইগারদের” বিরুদ্ধে বিজয়ের পরে শ্রীলঙ্কায় জাতীয় প্রশ্নের সমাধানে খেলার নিয়ম শুধু তিনিই নির্ধারণ করে থাকেন. যখন দিল্লীর উপরে এই দ্বীপের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের ভার অনেকটাই ছিল, সেই সময় চলে গিয়েছে. আর আজ দক্ষিণ এশিয়া এই ছোট দেশ বৃহত্ আঞ্চলিক রাষ্ট্রের মতামতকে অগ্রাহ্য করতেই পারে, কোন রকমের ভয় না পেয়েই, যে এর জন্য তাদের কড়া শাস্তি দেওয়া হতে পারে. এই রকমই দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক ক্ষেত্রে নতুন বাস্তব.