যাতে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সঙ্কট এড়ানো সম্ভব হয়, তার জন্য প্রয়োজন বিশ্বের ব্যাঙ্ক ব্যবস্থাকেই বদলে দেওয়ার. এই বিষয়ে “রেডিও রাশিয়াকে” দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে ঘোষণা করেছেন, বাংলাদেশের বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ মুহম্মদ ইউনুস. তিনি ২০০৬ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছিলেন বহু সংখ্যক জনগনের জন্য অর্থনৈতিক ও সামাজিক ভাবে উন্নয়নের পরিস্থিতি সৃষ্টি করার প্রচেষ্টার জন্য. এই মর্মে তিনি বলেছেন:

“ব্যাঙ্কগুলি গরীব মানুষদের ব্যবসা শুরু করার জন্য কোন রকমের সম্ভাবনা দিতে প্রস্তুত নয়, ব্যাঙ্ক ব্যবস্থা হওয়া দরকার সকলকে একসাথে নিয়ে চলার উপযুক্ত রকমের – তার মধ্যে যেন প্রসারিত ভাবে জনগনকে পরিষেবা দেওয়ার সম্ভাবনা থাকে. আর বর্তমানে থাকা বিশ্বের ব্যাঙ্ক ব্যবস্থা রয়েছে একে বারে উল্টো অর্থাত্ আলাদা লোকদের জন্য. তা নিজেদের ক্ষেত্র থেকে সেই সমস্ত লোকদের বাদ দিয়ে দেয়, যাদের কম অর্থ রয়েছে. এটা – সঠিক ব্যাঙ্ক ব্যবস্থা নয়. তা বেশীর ভাগ মানুষকেই গরীব অবস্থায় নিয়ে ফেলে. ব্যাঙ্ক গুলির মধ্যে একে অপরকে ঋণ দেওয়ার কাজের ধরণ, একেবারে সর্বনাশ করা. তা শুধু সেই সমস্ত লোকদের জন্য মনোযোগ দেয় ও পরিষেবা দিয়ে থাকে, যারা অনেক বেশী অর্থ রোজগার করে. বর্তমানের এই নিয়মকেই পাল্টানোর প্রয়োজন রয়েছে”.

১৯৮৩ সালে মুহম্মদ ইউনুস বাংলাদেশে গ্রামীণ ব্যাঙ্কের প্রতিষ্ঠা করেন, যা ক্ষুদ্র ঋণের বিষয়ে বিশেষ করে কাজ করছে. তিনি এই ক্ষুদ্র বিনিয়োগের বিষয়ে ব্যাখ্যা করে বলেছেন:

“তা বর্তমানে সারা বিশ্বেই উন্নতি করেছে. ১৬ কোটির বেশী মানুষ বিভিন্ন দেশে ক্ষুদ্র ঋণ ব্যবহার করতে পেরেছেন. বাংলাদেশে আমরা ২০ ডলারের সমান অর্থ থেকেই ঋণ দেওয়া শুরু করে থাকি, তার মধ্যে একেবারে নিঃস্ব ও ভিক্ষা করে খাওয়া মানুষদেরও. এটা মানুষদের সাহায্য করে, তাদের একবারে ছোট হলেও নিজে ব্যবসা শুরু করতে দেয়”.

বাংলাদেশ, ভারত ও অন্যান্য এশিয়ার দেশে, আফ্রিকাতে ও লাতিন আমেরিকাতে ক্ষুদ্র বিনিয়োগের প্রয়োজন রয়েছে. তার ওপরে গ্রামীণ ব্যাঙ্কের শাখা, যা মুহম্মদ ইউনুস প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তা ইউরোপেও কাজ করছে, আর এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও. এটা ঠিক যে, ঋণের পরিমান সেখানে স্থানীয় জনগনের জীবনযাত্রার মানের উপরে নির্ভর করেই দেওয়া হয়ে থাকে, এ প্রসঙ্গে ইউনুস বলেছেন:

“নিউইয়র্কে আমাদের ব্যাঙ্কের ছটি শাখা রয়েছে, তাতে গড় ঋণের অঙ্ক - দেড় হাজার ডলার. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এটা খুবই কম – একেবারে ছোট্ট পরিমাণ. এখানে আমাদের রয়েছেন বারো হাজার ঋণ গ্রহীতা, আর তারা সকলেই মহিলা.

ক্ষুদ্র ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা রাশিয়াতেও প্রসারিত হয়েছে. আমি একাধিকবার রাশিয়াতে এসেছি ও ক্ষুদ্র ঋণ সংক্রান্ত নানারকমের সম্মেলন ও পরামর্শ আলোচনাতে অংশ নিয়েছি.

এই ব্যবস্থা যথেষ্ট ফলপ্রসূ, আর তা দরিদ্র লোকদের আর্থিক বিষয়ে স্বাধীন হওয়ার সুযোগ দেয়”.

নতুন বিশ্বায়নের যুগে পৃথিবীর আর্থিক সমৃদ্ধির ভিত্তিই হল ব্যাঙ্ক ব্যবস্থা – যার অনেক পরিবর্তন করার দরকার রয়েছে ও প্রত্যেক ব্যক্তির সৃষ্টি করার ক্ষমতাকে বাস্তব সহায়তা দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলেই বিশ্বাস করেন নোবেল বিজয়ী এই বাংলাদেশের মানুষ মহম্মদ ইউনুস. তিনি রাশিয়ার ইকাতেরিনবুর্গ শহরে আয়োজিত আন্তর্জাতিক সম্মেলন “বিশ্বময় বুদ্ধিতে” অংশ নিয়েছেন. মুহম্মদ ইউনুস রাশিয়ার উরাল অঞ্চলের এই বড় অর্থনৈতিক, বৈজ্ঞানিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রীয় শহরে “এক্সপো -২০২০” করার ধারণাকে সমর্থন করে বলেছেন:

“আমি এই ধারণাকে সমর্থন করি, এই জায়গা খুবই ভাল! বিশ্বের মানুষ ইকাতেরিনবুর্গ নিয়ে কমই জানেন, আর তারা এই শহর ও তার সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়া সুযোগ পাবেন, আমি বিশ্বাস করি যে, বিশ্ব এখানে নিজের জন্য নতুন ও খুবই আশ্চর্যজনক এক প্রান্তরকে আবিষ্কার করবে”.

ইকাতেরিনবুর্গে আয়োজিত “বিশ্বময় বুদ্ধি” নামের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশ নিয়েছেন বিখ্যাত ব্যবসায়িক প্রতিনিধিরা, রাজনীতিবিদরা, অর্থনীতিবিদরা, বিজ্ঞানীরা, যাঁরা এসেছেন সমস্ত মহাদেশ থেকেই. নোবেল পুরস্কার বিজয়ী মহম্মদ ইউনুসের মতে, তাঁদের কাজ হবে – সমস্ত শক্তি একজোট করার, যাতে “বিশ্বময় বুদ্ধি” সঙ্কীর্ণ ব্যবসায়িক কর্পোরেশনের স্বার্থের উর্দ্ধে উঠে স্বীকৃতী পায়.