বিহার রাজ্যে বৌদ্ধ পূণ্যস্থান বোধগয়াতে রবিবারের বিস্ফোরণের তদন্ত হচ্ছে খুবই কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে: ঠিক করে বললে আপাততঃ এমনকি বলাও যাচ্ছে না যে, কে বা কারা এই সব নাশকতা মূলক কাজ করেছে.

কিন্তু ভারতের নানা রকমের দলের রাজনীতিবিদরা এই ব্যাপারটার সম্ভাবনাকে ইতিমধ্যেই লুফে নিয়েছেন ও নিজেদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এটাকে যথেচ্ছ ব্যবহার করতে শুরু করেছেন. খুবই স্বাভাবিক যে, সমালোচনার মুখ্য লক্ষ্য হয়েছে দেশের কেন্দ্রীয় সরকার ও বিহার রাজ্যের প্রশাসন, যার শীর্ষে রয়েছেন কয়েকদিন আগে বিরোধী পক্ষ জাতীয় গণতান্ত্রিক মোর্চা ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়া মুখ্যমন্ত্রী নিতীশ কুমার.

আপাততঃ ভারতের সংবাদ মাধ্যমের পক্ষ থেকে সবচেয়ে সক্রিয়ভাবে চালিয়ে যাওয়া ধারণা হয়েছে যে, এই নাশকতা মূলক কাজ করেছে তারা, যারা কিছুদিন আগে প্রতিবেশী মায়ানমারে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের পক্ষ থেকে মুসলিমদের উপরে করা অত্যাচারের শোধ তুলতে চেয়েছে: ঐস্লামিক কট্টরপন্থীরা বৌদ্ধদের তাদের ভাইদের উপরে হাত তোলার প্রতিশোধ নিয়েছে.

এই ব্যাপারে আবার অগ্নিতে ঘৃতাহুতি করেছে “ভারতীয় মুজাহেদ্দীন” দলের পক্ষ থেকে নাকি করা এক টুইটার সাইটের উক্তি, যারা নিজেদের উপরে এই ঘটনার দায়িত্ব নিয়েছে আর আশ্বাস দিয়েছে যে, পরবর্তী লক্ষ্য হবে মুম্বাই.

প্রসঙ্গতঃ, সন্ত্রাসবাদী কাজকর্মের সঙ্গে যোগ আছে সন্দেহে ধরা পড়া প্রথম চার ব্যক্তির মধ্যে আবার একজনই মাত্র মুসলমান, তাদের ছেড়ে দেওয়াও হয়েছে, সুতরাং কোন একটা নির্দিষ্ট মত নিয়ে বলতে যাওয়াও এখন তাড়াহুড়ো হয়ে যাবে, এই রকম মনে করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“এই সব সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপের ঐস্লামিক ধারণা বিশেষ সক্রিয়ভাবে পাকিয়ে তুলতে শুরু করেছিল বিরোধী ভারতীয় জনতা পার্টি, যাদের আবার একটা নাম রয়েছে (বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই, তা ন্যায্য) মুসলিম বিরোধী দল বলে. কিন্তু বিজেপি দলের চেষ্টা যে, এটা মায়ানমারের ঘটনার প্রতিধ্বনি, তা তত্ক্ষণাত তাদের বিরুদ্ধেই গিয়েছে: ক্ষমতাসীন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক দিগ্বিজয় সিংহ সরাসরি এই নাশকতা মূলক কাজের জন্য বিজেপি দলের নেতৃত্ব ও বিশেষ করে নব নির্বাচিত নেতা গুজরাত রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকেই দোষ দিয়েছেন”.

“মোদী বিহারে বিজেপি দলের সদস্যদের আহ্বান করে অনুরোধ করেছেন যে, তারা যেন দলছুট নিতীশ কুমারকে একটা উচিত্ শিক্ষা দেয়... আর ঠিক তার পরের দিনই মহাবোধি মন্দিরের পাশে বোমা ফাটে” – লিখেছেন দিগ্বিজয় নিজের টুইটারের পাতায়. তাই নিয়ে আবার ভলখোনস্কি বলেছেন:

“আসলে, অবশ্যই আপাততঃ সরকারি তদন্ত শেষ হয় নি, বিজেপির দিকে বা ব্যক্তিগত ভাবে নরেন্দ্র মোদীর দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ আরও বেশী করেই তাই ভিত্তিহীণ, আর এই ধরনের প্রমাণ ছাড়া অভিযোগ কারো বিরুদ্ধেই করা যেতে পারে না, এমনকি কট্টরপন্থী ঐস্লামিকদের বিরুদ্ধেও নয়, কিন্তু রাজনীতিবিদদের, মনে হচ্ছে, সেটা নিয়ে কোন মাথাব্যাথা নেই.

আর তাই খুবই স্বাভাবিক ভাবে ক্ষমতাসীন সরকারই আক্রমণের লক্ষ্য হয়েছে - তা যেমন কেন্দ্রীয় সরকার, তেমনই স্থানীয় প্রশাসন. ভারতে এই ধরনের ঘটনা সম্বন্ধে সতর্ক করে দেওয়ার সমস্ত ব্যবস্থা নিয়েই এক গাদা খুঁত বেরিয়ে পড়েছে. তার মধ্যে একটা মুখ্য হল – বিভিন্ন ধরনের বিশেষ বাহিনীর মধ্যে যোগাযোগের অভাব, অংশতঃ অনুসন্ধান বিভাগ ও কেন্দ্রীয় তদন্ত বিভাগের মধ্যে. বিরোধী পক্ষ তক্ষুণিই চেষ্টা করেছে এটাকে একটা ব্যবস্থাপনার খাদ বলে, যা তৈরী করেছে ক্ষমতাসীন সরকার নিজে”.

“এই সবই ঘটতে পেরেছে, কারণ কেন্দ্রীয় সরকার, যার নেতৃত্বে কংগ্রেস দল রয়েছে, তারা এই সব সংস্থাকে ঠিক করে ব্যবহার করে নি”, - ঘোষণা করেছেন বিরোধী পক্ষের নেতা ও রাজ্য সভায় বিরোধী দলের মুখপাত্র অরুণ জৈটলি.

সুতরাং, এমনকি যদি বিরোধী পক্ষ কোন ভাবেই এই সব সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপের সঙ্গে যুক্ত নাও হয় (আর খুব সম্ভবতঃ ভলখোনস্কির মতে, সেটাই ঠিক), তবুও নিজের থেকে এই সব নাশকতা মূলক কাজ খুবই ভাল সুযোগ হয়েছে রাজনৈতিক ভাবে বিরোধীদের একে অপরকে একহাত নেওয়ার. প্রসঙ্গতঃ, বিজেপি দলের আবার এক ঢিলে দুই পাখী মারার সুযোগ হয়েছে: দেখানো গেছে কেন্দ্রীয় সরকার কংগ্রেসের নেতৃত্বে কতটা দুর্বল, আর বিহার রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী নিতীশ কুমারকে শাস্তি দেওয়া গেছে, যিনি কয়েকদিন আগেও বিজেপির এক মুখ্য রাজনৈতিক সহযোগী ছিলেন, কিন্তু জুনের শেষে জাতীয় গণতান্ত্রিক মোর্চার থেকে বেরিয়ে গিয়েছেন, সেই নরেন্দ্র মোদীর কারণেই.

আর ক্ষমতাসীন দলের এই অন্তর্ঘাতের সঙ্গে বিরোধী দলকে জড়ানোর একটা অপটু প্রচেষ্টা আরও বেশী করেই সেই বিরোধী দেরই সুবিধা করে দিয়েছে বলে মনে করেছেন এই রুশ বিশেষজ্ঞ. এই চেষ্টা শুধু ক্ষমতাসীন দলকে অক্ষমই প্রমাণ করে না, বরং আরও প্রমাণ করে দেয় যে, তারা এমনকি “আঘাত সহ্য” করতেও পারে না আর প্রমাণ না হওয়া অভিযোগ বেছে নেয়.