ইরানের নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি হাসান রোহানি এক চাঞ্চল্যকর ঘোষণা নিয়ে ভাষণ দিয়েছেন, তিনি বলেছেন দেশের মানুষের জীবনকে এই ঐস্লামিক প্রজাতন্ত্রে আরও মুক্ত করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে, বাধা নিষেধ শিথিল করার জন্য ও ইরানের মানুষদের প্রত্যহের জীবনের উপরে কড়া নিয়ন্ত্রণ তুলে নেওয়ার জন্য.

রোহানি বলেছেন, - “আমাদের প্রয়োজন শক্তিশালী সমাজের. আমাদের দেশের লোকদের সঙ্গে কথা বলা দরকার. আমাদের উচিত্ হবে সদিচ্ছা নিয়ে শোনার, তাঁরা কি বলছেন. আমাদের উচিত হবে প্রশাসনের সর্বব্যাপী প্রভুত্বে ঢিলে দেওয়ার. যদি আমাদের শক্তিশালী ও দক্ষ প্রশাসন থাকে, তবে তার অর্থ এই নয় যে, তার উচিত্ হবে সব কিছুকেই নিয়ন্ত্রণ করার”.

এই প্রসঙ্গে মন্তব্য করেছেন ভ্লাদিমির সাঝিন.

১৪ই জুনে নির্বাচিত ইরানের নতুন রাষ্ট্রপতি এখনও তাঁর পদে আরোহণ না করেই, ইতিমধ্যেই ঘোষণা করছেন, যা মাত্র কয়েক মাস আগেই রাষ্ট্রদ্রোহ বলে মনে করা যেতে পারত.

বিশ্লেষকদের উপরে খুবই বড় রকমের প্রভাব ফেলেছে তাঁর যে সব মহিলারা বোরখা পরেন না, সেই মহিলাদের উপরে নেতিবাচক সম্পর্ক নিয়ে সমালোচনা. রোহানি ঘোষণা করেছেন যে, কড়া সংরক্ষণশীল নিয়মের সঙ্গে মানানসই ভাবে যারা পোষাক পরেন, সেই সব মহিলারা সব সময়েই মোটেই বিনম্র হন না, আবার উল্টোটাও ঠিক যে, বোরখা হীন মহিলা মোটেও সব সময়ে সতীত্বহীনা বলে প্রমাণিত হয় না. ইরানের নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি একই সঙ্গে ধর্মীয় পুলিশদের সমালোচনা করেছেন, যারা রাস্তায় খেয়াল রাখে সমাজের কড়া নিয়মের সঙ্গে না মানিয়ে যে সব মহিলারা পোষাক পরেন ও অন্য রকমের দেখতে হন, তাঁদের উপরে. তাছাড়া, রোহানি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে মহিলাদের অধিকার খর্ব করার বিরুদ্ধেও বক্তব্য রেখেছেন, আর তারই সঙ্গে ছেলে ও মেয়েদের আলাদা করে লেখাপড়া করা নিয়েও.

হাসান রোহানি সৃষ্টির স্বাধীনতা প্রসারিত করার স্বপক্ষে ও শিল্প ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে সেন্সর কমানোর পক্ষেও বলেছেন, আর তারই সঙ্গে ইন্টারনেটে ও সংবাদ মাধ্যমেও. তিনি বিশেষ করে উল্লেখ করেছেন যে, বর্তমানের ইন্টারনেটের সাইট ফিল্টার করার ব্যবস্থাও প্রশাসন ও মানুষের মধ্যে একটা অবিশ্বাসের দেওয়াল তৈরী করে দেয়.

নতুন রাষ্ট্রপতি তাঁর পক্ষ থেকে একটা ভরসা প্রকাশ করেছেন যে, ইন্টারনেটে সেন্সর করতে যাওয়া বিফল হবেই. “সাংখ্যিক বিপ্লবের যুগে তথ্য সংক্রান্ত একটা বদ্ধ কূপের মধ্যে থাকা ও দেশ চালানো সম্ভব নয়”. “আমার জানতে ইচ্ছা করে, যাঁরা কড়া রকমের বাধা নিষেধের পক্ষে, তাঁদের কাছ থেকে: কি তথ্য আপনারা গোপন রাখতে পেরেছেন”? এই রকমের একটা আলঙ্কারিক প্রশ্নই তুলেছেন রোহানি. জানাই রয়েছে যে, বর্তমানে ঐস্লামিক প্রজাতন্ত্র ইরানের প্রশাসন বহু ইন্টারনেট সাইটের উপরে ট্যাবু করে দিয়েছে, যার মধ্যে সামাজিক সাইট গুলিও রয়েছে. কিন্তু ইরানের লোকরা এই সব বাধা নিষেধ পার হয়ে যায় বিশেষ ধরনের প্রোগ্রাম ব্যবহার করে. এটা বিদেশী টেলিভিশন চ্যানেল দেখা নিয়ে নিষেধ সম্বন্ধেও বলা যেতে পারে, যার ফলে দেশের বহু জনতাই বেআইনি ভাবে উপগ্রহ মারফত দেখার জন্য ডিশ অ্যান্টেনা লাগান.

নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি সংবাদ মাধ্যমের ভূমিকা নিয়েও কথা বলেছেন. তিনি উল্লেখ করেছেন যে, “কোন প্রশাসনই নিখুঁত নয়”, তিনি তাই বলেছেন: “বাস্তবে সংবাদ মাধ্যম প্রশাসনের নিয়মিত কাজের উপরে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে ও রাষ্ট্রীয় কাঠামো গুলিরও উপরে তা করে, আর তাদের এই সমালোচনা প্রায়ই খুব দরকারি হয় সেই সরকারের কাজকেই ভাল করার জন্য”. রোহানি যোগ করেছেন: “সংবাদ মাধ্যম আমাদের সাহায্য করে দেশের মানুষের ইচ্ছাকে বাস্তবায়িত করার জন্যে আর প্রশাসনের পরিকল্পনাকেও, আর সেটাই দেশের জনগন ও সরকারের পারস্পরিক আশাকেও প্রতিফলিত করে”.

হাসান রোহানি একই সঙ্গে ঘোষণা করেছেন যে, তিনি দেশের জনগনের পুনর্গঠন ও পরিবর্তনের চাহিদাকে অনুভব করতে পেরেছেন, আর তিনি নিজের দেওয়া সমস্ত প্রাক্ নির্বাচনী আশ্বাসও বাস্তবায়িত করবেন. এটা প্রশাসনকে আধুনিক করে তোলার প্রথম প্রচেষ্টা নয়, বলে উল্লেখ করে বিখ্যাত প্রাচ্য বিশারদ ও ইরান বিশেষজ্ঞ এলেনা দুনায়েভা বলেছেন:

“ইরানে বাধা নিষেধ মুক্ত হওয়ার দিকে ইচ্ছা উদয় হয়েছিল রোহানি রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগেই. যখন ১৯৮৯ সালে আয়াতোল্লা খোমেইনির মৃত্যুর পরে রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন আয়াতোল্লা হাসেমি রাফসানজানি, তিনি নিজে রাষ্ট্রপতি থাকাকালীণ খুবই মুক্ত রাজনীতি করেছিলেন, বিশেষত অর্থনীতির ক্ষেত্রে. আর তাঁর পরের রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ হাতামি, দেশের পররাষ্ট্র ও আভ্যন্তরীণ নীতিতে লিবারেল সংশোধনী কাজ কারবারে গতি বৃদ্ধি করেছিলেন. কিন্তু কট্টরপন্থী ও সংরক্ষণশীল ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের শাখা তাঁর ইচ্ছার প্রতি অখুশী হয়েছিলেন. ফলে সেই উষ্ণতা পাল্টে গিয়েছিল খুবই কড়া শীতে. এবারে আশা করা যেতে পারে যে, ইরানে আবার করে বসন্তের হাওয়া বইতে শুরু করবে”.

এখন প্রশ্নের উদয় হয় যে, রোহানি কি পারবেন তাঁর ঘোষিত লিবারেল পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করতে? যথেষ্ট হবে কি তাঁর ক্ষমতা? নতুন রাষ্ট্রপতি বাধ্য হবেন নিজের ধারণাকে বাস্তবায়িত করার জন্য সেই ধরনের পথ বের করতে, যা একদিকে, বেশীর ভাগ ইরানের মানুষের ভরসার উত্তর হবে আর অন্যদিকে – দেশের উচ্চ মহলের সমর্থন হারানোর ভয়ও থাকবে না. নির্বাচন দেখিয়েছে যে, ইরানের সমাজের এক বড় অংশ পরিবর্তন চায়. তাই কথা যত না নতুন রাষ্ট্রপতির ইচ্ছা নিয়ে হচ্ছে, বা তার পাশের লোকদের নিয়ে হচ্ছে, তার চেয়েও বেশী হচ্ছে ইরানের উন্নয়নের বাস্তব দিক গুলি নিয়েই.