চিন দেশে সোমবারে শেষ হওয়া ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী এ. কে. অ্যান্টনির সফর একটা দ্বিধা জড়িত ধারণা রেখে গিয়েছে. একদিকে, সরকারি স্তরে দুই পক্ষই সমঝোতা করেছেন সীমান্ত এলাকায় পারস্পরিক ভরসার মাত্রা বৃদ্ধি করার, সব রকম ভাবে উত্তেজনা কমানোর ও এমনকি যৌথভাবে সামরিক মহড়া করার. এমনকি এরই সঙ্গে ঘোষণা করা হয়েছে যে, এই বছরের শেষের আগেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহ চিনে সফরে আসবেন. অন্যদিক থেকে, এই সফরই দুই তরফের রাজনৈতিক পোড় খাওয়া “শকুনিদের” খুবই কড়া ভাষায় একে অপরের উদ্দেশ্যে ঘোষণা করার কারণ তৈরী করেছে, যা মোটেও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নতির সহায়ক হবে না.

ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর বর্তমানের চিন সফর – হয়েছে গত সাত বছরে প্রথমবার. এর পারিপার্শ্বিক হিসাবে কাজ করেছে সদ্য ঘটে যাওয়া দুটি ঘটনা, যা ভারত – চিন সম্পর্কের দ্বিচারিতাকেই সব থেকে ভাল করে প্রতিফলিত করেছে. একদিকে, সেই ভারতে সদ্য ঘুরে যাওয়া চিনের নব নির্বাচিত মন্ত্রীসভা প্রধান লি কেকিয়াং - যা তাঁর নতুন পদ পাওয়ার পরে প্রথম বিদেশ সফর. আর অন্য দিকে – এপ্রিল – মে মাসে লাদাখে ঘটে যাওয়া ঘটনা, যখন চিনের সামরিক বাহিনী বিতর্কিত অঞ্চলে ভারতের এলাকার মধ্যে প্রায় কুড়ি কিলোমিটারের বেশী ঢুকে পড়েছিল আর ব্যাপারটা প্রায় সশস্ত্র সংঘর্ষে পরিণত হতে চলেছিল.

এই প্রসঙ্গে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“এশিয়ার দুই মহান রাষ্ট্রের সম্পর্কের মধ্যে বর্তমানে যে প্যারাডক্স রয়েছে, তা হল যে, দুই দেশের সর্ব্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এই সম্পর্ককে সহযোগিতার আত্মা ও এমনকি জনগনের মধ্যে মৈত্রী বলেও চালানো হচ্ছে. এই সহযোগিতার আত্মা দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ সফল ভাবে বৃদ্ধি দিয়েও মজবুত করা হচ্ছে, যা ক্রমাগতই উপরে উঠছে. ২০১১ সালে চিন ভারতের সঙ্গে বৈদেশিক বাণিজ্যের নিরিখে প্রথম স্থান দখল করেছে. আবার অন্য দিকে ১৯৬২ সালের যুদ্ধের স্মৃতি এখনও এই সম্পর্ককে বিষাক্ত করছে. বিশেষ করে ভারতেই, যেখানে দেশের সমাজের অনেক অংশই সেই যুদ্ধে হেরে যাওয়াকে ভুলতে পারে নি ও নিজেদের এলাকার একটা অংশ হারানোকেও নয়”.

এ. কে. অ্যান্টনির বর্তমানের সফর সম্পর্কের এই দ্বিচারিতাকেই প্রকট করেছে, বলে মনে করেন বরিস ভলখোনস্কি.

একদিকে, আলোচনার সময়ে নিজের চিনা সহকর্মী জেনারেল চাং ওয়াংকুয়াং-এর সঙ্গে ভারতের মন্ত্রী সমঝোতা করেছেন একসারি বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে, যাতে দুই দেশের মধ্যে সামরিক কর্মীদের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ে, সীমান্ত এলাকায় উত্তেজনা কমে ও এমনকি পাঁচ বছর ধরে থেমে থাকার পরে যৌথভাবে সামরিক প্রশিক্ষণ শুরু হয়. এই বছরের অক্টোবর মাসে চিনের দক্ষিণে কুনমিন শহরে এই মহড়া হতে চলেছে.

অন্য দিকে, সফর হয়েছে একসারি প্রকাশ্য ঘোষণার মধ্যেই, যেগুলি সেই কারণেই করা, যাতে পারস্পরিক ভাবে অবিশ্বাসের আগুন আবার করে জ্বলে ওঠে.

যেমন, নিজের “শকুনের দৃষ্টির” জন্য বিখ্যাত চিনের জেনারেল লুও ইউয়ান বেজিং শহরে ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর আগমনের প্রাক্কালে সেই সুরেই ঘোষণা করেছেন, যে, এটা ভারতই সীমান্ত এলাকায় উত্তেজনা ছড়াচ্ছে, আর এটা শুধু ভারতের উপরেই নির্ভর করে, যে তা আবার করে নতুন সমস্যার সৃষ্টি করবে কি না.

জেনারেলের ঘোষণা ভারতীয় সংবাদ মাধ্যমের অলক্ষ্যে থেকে যায় নি, যারা খুবই উত্তেজিত ভাবে প্রতিক্রিয়া করেছে. বিশেষ করে দেখার মতো হয়েছে “হিন্দুস্তান টাইমস” পত্রিকার হেডলাইন: “চিন অ্যান্টনিকে স্বাগত জানাচ্ছে সীমান্ত প্রশ্নে নিঃশ্বাসের সঙ্গে আগুন বর্ষণ করে”. তাই ভলখোনস্কি বলেছেন:

“ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রী এই সময়ে সিঙ্গাপুরে থেকে এই কড়া বাক্যালাপে কিছুটা নরম সুর দিয়েছেন, তিনি ঘোষণা করেছেন যে, ভারত ও চিন সীমান্ত সমস্যা নিয়ে তাড়াহুড়ো করবে না. কিন্তু এই ঘোষণাও ভারতের সমাজের একাংশের খুবই কড়া সমালোচনার সামনে পড়েছে. ফলে মন্ত্রী যা আশা করেছিলেন, তার উল্টোটাই হয়েছে. অনেক ব্লগ লেখকই সেই অর্থে মন্তব্য করেছেন যে, সমস্যা উদ্ভূত হওয়ার পরে পঞ্চাশ বছর কেটে গিয়েছে, আর মন্ত্রী এই প্রসঙ্গে “তাড়াহুড়ো করার দরকার নেই” বলতে কি মনে করেছেন?

আসলে, মনে হয় যে, আপাততঃ, দুই দেশের মন্ত্রীসভা চেষ্টা করছে সামনে এগিয়ে যেতে, সীমান্ত সমস্যার দিকে পিছন ফিরে না তাকিয়েই. কিছু মাথা গরম লোক সীমান্তের দুই দিক থেকেই চাইছে, যা আকৃতি দিয়ে বললে, বলা যেতে পারে যে, রথকে ঘোড়ার আগেই জুতে দিতে”.

এই মাথা গরম করা লোকরা ভুলে যায় যে, সীমান্তের সমস্যাকে সম্পর্কের সমস্ত রকমের জটিল মারপ্যাঁচ বাদ দিয়ে, একমাত্র শক্তি প্রয়োগ করা ছাড়া সম্ভব নয়. আর এটা করতে, না ভারত, না চিন, কেউই আগ্রহী নয়. তার বাস্তব সমাধান শুধু তখনই করা সম্ভব হবে, যখন অন্যান্য সমস্ত সমস্যার পারস্পরিক ভাবে লাভজনক সমাধান করার পরে, এটাও করা হবে, মোটেও এটাকে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সফলতার একমাত্র শর্ত করে দাঁড় করানো যেতে পারে না. অন্তত এই রকমই মনে করেন রুশ বিশেষজ্ঞ.