আমেরিকার গুপ্তচর বিভাগের গোপনীয় তথ্য ফাঁস করে দেওয়া এডওয়ার্ড স্নোডেনের ভাগ্য আগের মতই অনির্দিষ্ট. মস্কো শহরের শেরেমেতিয়েভো বিমান বন্দরের ট্রানজিট এলাকায় এই পলাতক কর্মী রয়েছে ও চেষ্টা করছে কোন একটা দেশে রাজনৈতিক আশ্রয় পাওয়ার আর ক্যাপসুল সাইজের হোটেলের ছোট্ট কামরা থেকে আন্তর্মহাদেশীয় কেলেঙ্কারি তৈরী করায় আশ্চর্য ক্ষমতা দেখাচ্ছে.

এডওয়ার্ড স্নোডেনের একেবারে বদ্ধ জায়গায় থাকতে খুবই খারাপ লাগছে. এই সপ্তাহের শুরুতে সে তাকে রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়ার আবেদন করে খান কুড়ি দেশে পাঠিয়েছিল. রাশিয়ার রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিন তাদের মধ্যে প্রথম এই অনুরোধে ইতিবাচক উত্তর দিয়েছেন, কিন্তু তিনি স্নোডেনকে শর্ত দিয়েছেন, তিনি বলেছেন:

“যদি সে এখানে থেকে চায়, একটা শর্ত রয়েছে: সে তার কাজ বন্ধ করতে বাধ্য, যা সেই দিকে লক্ষ্য করেই করা হচ্ছে, যাতে আমাদের আমেরিকার সহকর্মীদের ক্ষতি করা সম্ভব হয়, তা এটা আমার মুখ থেকে শুনতে যত আশ্চর্যই লাগুক না কেন. কিন্তু সেই কারণে, যে সে (স্নোডেন) নিজেকে ভাবে মানবাধিকার রক্ষী বলে ও মানবাধিকারের জন্য সংগ্রামী যোদ্ধা বলে, তাই সব দেখে শুনে মনে হয়েছে যে, সে তা বন্ধ করতে চায় না. তাই সে নিজের জন্য যাওয়ার দেশ দেখে নিক ও সেখানে চলে যেতে বাধ্য”.

স্নোডেন সহমত হয়েছে যে, রাশিয়া, তার জন্য সর্ব শ্রেষ্ঠ উপায় নয়, আর সে তাই পালিয়ে থাকার জায়গা খুঁজেই গিয়েছে.

এই সময়ের মধ্যে মস্কো শহরে গ্যাস রপ্তানীকারক দেশ গুলির শীর্ষ সম্মেলন হয়ে গিয়েছে. এর অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে – ইরান, ভেনেজুয়েলা, বোলিভিয়ার নেতারা ছিলেন. ওয়াশিংটনের মতো করে চলার বিষয়ে এঁদের কোন দোষ দেওয়া যায় না. আর যখন সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেছিলেন স্নোডেনকে ঘিরে পরিস্থিতি নিয়ে, তখন বোলিভিয়ার রাষ্ট্রপতি এভো মোরালেস ঘোষণা করেছিলেন যে, আমেরিকার এই লোকটির আবেদন তিনি বিচার করে দেখতে পারেন. এই উত্তর মোরালেসের জন্য প্রায় জীবন দিয়ে মূল্য চুকানোর মতো হয়ে গিয়েছিল. যখন বোলিভিয়ার রাষ্ট্রপতি মস্কো থেকে তাঁর দেশের দিকে ফিরে যেতে শুরু করেছিলেন – এখানে উল্লেখ করবো যে, তিনি উড়ে গিয়েছিলেন মস্কোর আরেকটি বিমান বন্দর ভ্নুকোভা থেকে, শেরেমেতিয়েভো থেকে নয়, যেখানে স্নোডেন রয়েছে – হঠাত্ করেই ফ্রান্স ও পর্তুগাল তাঁকে নিজেদের আকাশ সীমা ব্যবহার করতে নিষেধ করেছিল, আর স্পেন তাঁর বিমানকে ক্যানারী আইল্যান্ডে জ্বালানী ভরার জন্য আগে থেকে নেওয়া সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে নিয়েছিল. এই সব দেশের প্রশাসন আশঙ্কা করেছিল যে, রাষ্ট্রপতির বিমানে হঠাত্ করেই পলাতক মার্কিন গুপ্তচর থাকতে পারে. প্রসঙ্গতঃ, যে কিনা সেই ইউরোপের লোকদেরই চোখ খুলে দিয়েছে, কি করে তাদের জোট সঙ্গী ও ন্যাটো সংস্থার সহকর্মী দেশ – মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র লুকিয়ে ইউরোপীয় সঙ্ঘের নাগরিকদের উপরে নজরদারি করছে আর এই সঙ্ঘের নেতাদের টেলিফোনে কথাবার্তা শুনে ফেলছে. আর এই রকমের একটা পরিস্থিতিতে ইউরোপের দেশ গুলিই নিজেদের আকাশ সীমা বন্ধ করে দিয়েছে সেই লোকের জন্যই, যে তত্ত্বগত ভাবে হলেও স্নোডেনকে সাহায্য করতে পারতো, এই প্রসঙ্গে ফ্রান্সের থেকে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য ব্রুনো গোলনিশ বলেছেন:

“খুবই দুঃখের বিষয় হল যে, আমাদের প্রশাসনের অবস্থান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে - এটা মাথা নত করে থাকার অবস্থান. এই রকমের আড়িপাতা নিয়ে একমাত্র প্রতিক্রিয়া – এটা হল যে, ফ্রান্সের তরফ থেকে অবাধ বাণিজ্য নিয়ে আলোচনা দুই সপ্তাহের জন্য পিছিয়ে দেওয়া. আমেরিকার প্রতি যে ধরনের নির্ভরতা করে আমরা আজ রয়েছি, সেই অবস্থা দেখে আমি একেবারে স্তম্ভিত হয়েছি. আর তার থেকেও বেশী আমাকে স্তম্ভিত করেছে যে, ফ্রান্স নিজেদের আকাশ সীমা বোলিভিয়ার রাষ্ট্রপতি এভো মোরালেসের জন্য বন্ধ করে দিয়েছে. আমি আমার দেশের জন্য এটাকে সত্যিকারের অমর্যাদা বলেই মনে করি”.

মোরালেসকে জরুরী কালীণ ভাবে অবতরণ করতে দিয়েছে শুধু ভিয়েনা. আর অস্ট্রিয়ার লোকদের অতিথি পরায়ণতা বোলিভিয়ার রাষ্ট্রপতি ১২ ঘন্টা ধরে ব্যবহার করেছেন – যতক্ষণ না অস্ট্রিয়ার প্রতিনিধি এই বিমানের ভেতরে ঢুকেছেন ও মাড্রিডকে প্রমাণ করেছেন যে, তাতে কোন বেআইনি যাত্রী নেই. তারপরে ইউরোপের দেশ গুলিকে বোলিভিয়ার রাষ্ট্রপতির বিমান নিয়ে ঘটনার জবাবদিহি করতে হয়েছে. যেসব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা সেই ধরনের খবরের প্রতিক্রিয়া যে, স্নোডেন একেবারে “নিশ্চিত ভাবে” এই বিমানের ভিতরে রয়েছে, এই কথা স্পেনের পররাষ্ট্র প্রধান হোসে ম্যানুয়েল গার্সিয়া-মার্গালিও গত শুক্রবারে বলেছেন. তিনি অবশ্য নির্দিষ্ট করে বলতে রাজী হন নি যে, এই খবর কে দিয়েছে. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে স্নোডেনের অবস্থান নিয়ে কোন খবর স্পেন পেয়েছিল কিনা, এই প্রশ্নের উত্তরে গার্সিয়া-মার্গালিও উত্তর দিয়েছেন যে, এটা “তদন্তের গোপনীয়” কথা.

আমেরিকার বিশেষ বাহিনীর জন্য মোরালেসের বিমান নিয়ে ঘটনা - আরেকটা বিফলতা, এই কথা উল্লেখ করে রাজনীতিবিদ সের্গেই মিখিয়েভ বলেছেন:

“এটা আমেরিকার বিশেষ বাহিনীর জন্য খুবই বড় রকমের বিফলতা, আর তাদের প্রশাসনিক ব্যবস্থার জন্যেও তাই, আর বলা যেতে পারে আমেরিকার সম্পূর্ণ পররাষ্ট্র নীতির জন্যেও. তারা এখন ক্ষেপে গিয়েছে. স্নোডেনকে তাদের চাই, যাতে তার উপরে একটা লোককে দেখিয়ে দেওয়ার মতো বিচার আয়োজন করা যায়, যাতে অন্যদের এই ধরনের কাজ করার সাহস না হয়. আর তারা সেটা করে উঠতে পারছে না, তাই তারা ভুল করে চলেছে. এই ঘটনা – এটা তাদের আরও একটা ভুল. স্নোডেন বিমানের ভিতরে ছিল না. তারা আবারও সারা বিশ্বের সামনে হাস্যস্কর হয়েছে”.

লাতিন আমেরিকার দেশ গুলি মোরালেসের সঙ্গে নিজেদের একমত হওয়া দেখিয়ে খুবই উত্তেজিত প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে এই ঘটনা নিয়ে. তারা রাষ্ট্রসঙ্ঘের মহাসচিব বান কী মুনকে এই ঘটনার মূল্যায়ণ করে বলার দাবী করেছে. বর্তমানে স্নোডেনকে নিজেদের দেশে নীতিগত ভাবে থাকতে দিতে চেয়েছে ভেনেজুয়েলা ও নিকারাগুয়া.