প্রাক্তন সিআইএ সংস্থার ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সংস্থার কর্মী এডওয়ার্ড স্নোডেনকে নিয়ে ইতিহাস, যে কিনা বিশ্বের বেশ কয়েক দশক দেশকে, নরম করে বললে, অসুবিধার মধ্যে ফেলে দিয়েছে, তা ভারতে খুবই তীক্ষ্ণ রাজনৈতিক বিরোধে পরিণত হয়েছে. যখন ভারতের মন্ত্রীসভা ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চেষ্টা করছে সম্ভাব্য বিরোধ পরিস্থিতির সামাল দিতে, তখন দক্ষিণ পন্থী ও বামপন্থী বিরোধীদের সকলেই মন্ত্রীসভার উপরে ও বিশেষ করে ব্যক্তিগত ভাবে পররাষ্ট্র মন্ত্রী সলমন খুরশিদের উপরে, তাঁর খুবই নরম অবস্থান ও “মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে খুশী করার চেষ্টার” সমালোচনা করে একেবারে ঝাঁপিয়ে পড়েছে. বিতর্কের চরিত্র এই সমস্যার গভীরতাকে প্রতিফলিত করেছে, যা সেই বিষয়ের সঙ্গেই জড়িত যে, ভারত আপাততঃ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জোটের বিষয়ে নিজেদের অবস্থানকে একমাত্র সংজ্ঞা দিয়ে নির্দিষ্ট করতে পারছে না ও এশিয়াতে ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক গতিপথের সঙ্গেও তাল মেলাতে পারছে না.

সেই ঘটনা যে, ভারত স্নোডেনকে রাজনৈতিক আশ্রয় দিতে অস্বীকার করেছে, তা প্রায় অলক্ষ্য ভাবেই রয়ে গিয়েছে, আর কোন তীক্ষ্ণ বিতর্কও তা নিয়ে হয় নি. শেষমেষ, ভারত সেই খান কুড়ি দেশের মধ্যে যেমন প্রথম নয়, তেমনই শেষ দেশও নয় – যেখানে স্নোডেন রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়েছিল, আর আপাততঃ যার কোন একটা থেকেও ইতিবাচক উত্তর পায় নি. এই প্রসঙ্গে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“আর সেই আড়িপাতা নিয়ে পরিস্থিতি বরং ভারতীয় সমাজে খুবই তীক্ষ্ণ বিতর্ক শুরু করিয়েছে – যেমন দেখা গিয়েছে, ইন্টারনেটে স্নোডেনের ফাঁস করে দেওয়া তথ্য থেকে যে, সেই সমস্ত জায়গা, যেগুলির উপরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনীর নজর পড়েছে, তার মধ্যে ওয়াশিংটনে ভারতের রাষ্ট্রদূতাবাসও ছিল”.

গত মঙ্গলবারে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রী সলমন খুরশিদ, ব্রুনেই রাষ্ট্রের রাজধানীতে আসিয়ান সংস্থার নিরাপত্তা সম্মেলনে যোগ দিতে গিয়ে, স্নোডেনের বিষয়ে আমেরিকার নীতির পক্ষ নিয়ে একেবারেই একটি মাত্র অর্থ হতে পারে এমন মন্তব্য করেছেন. তিনি ঘোষণা করেছেন যে, “এটা মোটেও সে যেই হোক না কেন, এমন নির্দিষ্ট কোন ব্যক্তির পাঠানো খবর বা কথাবার্তার উপরে আড়িপাতা নয়”.

আর ব্যাখ্যা করেছেন যে, এই ধরনের “নজরদারি করা” দরকার ছিল – অংশতঃ, “বেশ কয়েকটি দেশে খুবই গুরুতর রকমের সন্ত্রাসবাদী কাজকর্ম রোধ করার জন্যই”, তাই ভলখোনস্কি বলেছেন:

“আমরা বরং একদিকে সেই প্রশ্নকেই রেখে দেব যে, কি করে ওয়াশিংটনে ভারতের রাষ্ট্রদূতাবাস ও আরও ৩৭টি দেশের রাষ্ট্রদূতাবাস, যাদের উপরে আড়িপাতা হচ্ছিল, তারা সন্ত্রাসবাদী কাজ কারবারের আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে. এখানে সেই প্রশ্ন, যা আজ ভারতের সবচেয়ে প্রসারিত ভাবে ছড়ানো রাজনৈতিক মহলে আলোচনা হচ্ছে, তা এই রকমের: ভারতের সঙ্গে সহযোগী মুলক সম্পর্ক তৈরীর ক্ষেত্রে, লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে আসা নিয়ে ঘোষণা করা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের, কি এই ধরনের ব্যবহার খাপ খেতে পারে”?

ভারতীয় সমাজে আজ সবচেয়ে বেশী সমর্থিত মতামত তার মধ্যেই রয়েছে যে, ভারতের মন্ত্রীসভা “মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে খুশী করার চেষ্টার” বিষয়ে অনেক দূর চলে গিয়েছে. অনেকেই নির্দেশ করছেন যে, এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইউরোপের সবচেয়ে কাছের সহযোগীরাও বেশী কড়া অবস্থান নিয়েছেন.

“দ্য হিন্দু” সংবাদপত্র দেশের বিখ্যাত বিশেষজ্ঞ ও রাজনীতিবিদদের এই প্রসঙ্গে করা মন্তব্য উদ্ধৃত করেছে. সামাজিক মুক্তি আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী নন্দিতা হাকসার বলেছেন: “আমার, একজন ভারতীয় মহিলা হয়ে খুবই দুঃখ হচ্ছে যে, আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রীর মতো এই রকমের একজন শিক্ষিত আইনজীবী, যাঁর উচিত্ ছিল এই ধরনের প্রশ্ন ভাল করে বুঝে নেওয়ার, তিনি এই ধরনের একটা অবস্থান নিয়েছেন”. আর দিল্লীর জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক কূটনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত প্রফেসর পুষ্পেশ পন্থ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাজকর্মের মধ্যে দুমুখো নীতির দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করেছেন, যারা, “যখন স্নোডেনকে কোন দেশ থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার কথা ওঠে, তখন আন্তর্জাতিক আইনের অধিকারের প্রসঙ্গ তোলে, কিন্তু নিজেরাই আন্তর্জাতিক সমঝোতা পত্রের নিয়ম নীতি লঙ্ঘণ করে, যখন কথা হয় রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব প্রসঙ্গে”. তাই ভলখোনস্কি বলেছেন:

“সব মিলিয়ে বলতে হলে, যত দূরে গড়াচ্ছে, ততই বেশী করে স্নোডেনের মামলা আমাদের খুব ভাল করেই পরিকল্পিত এক প্ররোচনা বলে মনে করিয়ে দিচ্ছে, কারণ আসলে তার “ফাঁস” করে দেওয়া তথ্যে কোন রকমের বিশেষ করে উল্লেখ করার মতো তথ্যই নেই: সেই তথ্য যে, মার্কিন গুপ্তচর বিভাগ সবার উপরেই নজর রাখছে, তা আগে থেকেই স্পষ্ট জানা ছিল. কিন্তু “স্নোডেনের মামলা”, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সুযোগ করে দিয়েছে, একদিক থেকে নিজেদের সহযোগীদের কে কতটা তাদের প্রতি অনুগত তা পরীক্ষা করে দেখে নিতে, আর অন্যদিক থেকে – নিজেদের আদেশের জোরে সহযোগীদের “সারি দিয়ে দাঁড় করানোর”, আবার একই সঙ্গে সেই সমস্ত অবাধ্য দেশের উপরে চাপ সৃষ্টি করতেও, যেমন বোলিভিয়া অথবা ইকোয়েডর”.

আজ ভারতে যা ঘটছে, তা ভারতীয় সমাজের সঙ্গে দেশের প্রশাসনিক মহলের মোটেও একই রকমের সম্পর্ক যে নেই, তা আবার করে তুলে ধরছে, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে এশিয়াতে নিজেদের রাজনীতির কক্ষপথে নিয়ে আসার প্রচেষ্টা সম্বন্ধে. খুবই আগ্রহের বিষয় যে, এই অবস্থান গত পার্থক্য সেই সব বিষয়েই প্রকট হয়ে পড়ছে, যেমন, এই স্ক্যান্ডাল কিভাবে দেশের নানা রকমের সংবাদ মাধ্যমে দেওয়া হয়েছে, তাতেই. যদি ভারতের সংবাদপত্র “দ্য হিন্দু” এটার উপরে প্রচুর মনোযোগ দিয়ে থাকে ও মূলতঃ মন্ত্রীসভার উপরে সমালোচনাকেই প্রধানতঃ প্রকাশ করে থাকে, তবে সেই “দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া” ভাব করেছে যেন এই ঘটনাই ঘটে নি.

অবশ্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্ন ইতিমধ্যেই প্রচার শুরু হয়ে যাওয়া আসন্ন লোকসভা নির্বাচনের সময়ে প্রধান হবে না. কিন্তু তা সমস্ত রকমের তীক্ষ্ণ রূপ নিয়ে দেখা দেবে, যখন নতুন মন্ত্রীসভা - তা সে যে দলই তা তৈরী করুক না কেন – নিজেদের পররাষ্ট্র নীতি নিয়ে পথ নির্দেশ তৈরী করতে যাবে. আর তাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে বর্তমানের প্রশাসনের কাছ থেকে আনুগত্য পাওয়ার চেষ্টা খুবই বোধগম্য হয়েছে.