মঙ্গলবার ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সলমন খুর্শিদ অপ্রত্যাশিত এক মন্তব্য করেছেন. তিনি বলেছেন, যে আফগানি সমাজের সর্বস্তরের তালিবান সমেত সশস্ত্র দলগুলির সাথে সংলাপ  ভারত        সমর্থন করছে. ভারতের পক্ষ থেকে আগেকার অবস্থান থেকে এটা লক্ষ্যণীয় ব্যতিক্রম, কারণ ইতিপূর্বে ভারত তালিবানদের মধ্যে 'ভালো' ও 'খারাপ' বলে কোনো প্রভেদ করতো না, অতএব তাদের সাথে কোনো আলোচনার সম্ভাবনাকেই সমূলে নস্যাত্ করে দিত. তবে আফগানিস্তানে আলাপ-আলোচনার প্রক্রিয়ার প্রতি ভারতের মনোভাবের বৈপ্লবিক পরিবর্তন সম্পর্কে সন্দেহ এখনো থেকে যাচ্ছে.

      সপ্তাহ দুয়েক আগে যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তালিবান গোষ্ঠী দোহায় তালিবান দপ্তরে আলোচনার টেবিলে বসার প্রস্তুতির কথা ঘোষণা করলো, তখন ভারত তার উদ্বেগ গোপন করেনি. আন্তর্জাতিক ক্রীড়ামঞ্চে ভারত বরাবর ছিল তালিবানের একান্ত বিরোধী, কারণ ঐ গোষ্ঠীকে পাকিস্তানের জাতীয় গুপ্তচর বিভাগ আইএসআই-এর দ্বারা সৃষ্ট বলেই গণ্য করতো, যাদের কাশ্মীরের ভূখন্ডেও সন্ত্রাসমুলক কার্যকলাপ চালানোর জন্য গড়া হয়েছে, বলে দৃঢ় ধারণা ছিল ভারতের.

      তবে সরকারিভাবে তালিবানদের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্টের আলোচনা এখনো শুরু না হলেও পর্দার অন্তরালে কথাবার্তা যে চলছে, তা পরিষ্কার. বড় জটিল তালিবানদের, আফগানিস্তানের বর্তমান শাসকদের ও পশ্চিমী দুনিয়ার প্রতিনিধিস্বরুপ আমেরিকাকে এক টেবিলে আলোচনার জন্য বসানো. বিগত ১২ বছর ধরে আফগানিস্তানে সশস্ত্র কোঁদল নিয়ে পারস্পরিক দোষারোপ বড় উঁচু মাত্রায় গিয়ে পৌঁছেছে.  যদিও বা দ্বিপাক্ষিক স্তরে কখনো কখনো বচসা মেটানো সম্ভব হয়, কিন্তু তা তৃতীয় পক্ষের ক্ষোভের কারণ হয়, যেন তাদের অগ্রাহ্য করা হল. এই প্রসঙ্গে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কির বক্তব্য শুনুন. -

      যে কোনো স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিদেশি পক্ষ যতই বলুক না কেন, যে তারা চায় আফগানিস্তানের ঘরোয়া বচসার সমাধান আফগানিস্তানের কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে তারা নিজেরাই করুক, প্রত্যেকেই কিন্তু সংঘাতরত কোনো এক পক্ষের উপর ভরসা রাখছে.  আর ২০১৪ সালের পরে আফগানিস্তানে নিজেদের প্রভাব বজায় রাখতে বা আরও জোরদার করতে ইচ্ছুক বিদেশীদের সংখ্যা বড্ড বেশি. এদের মধ্যে আছে আমেরিকা, পাকিস্তান, সাম্প্রতিককালে অতি তত্পর হয়ে ওঠা চীন. আরও আছে যেমন ভারত, ইরানের মতো প্রতিবেশী দেশেরা, তেমনই অঞ্চল-বহির্ভূত আন্তর্জাতিক খেলুড়েরা.

     পাকিস্তানের প্রসঙ্গ তুললে বলতে হয়, যে সে বরাবরই বাজি ধরেছে তালিবানদের স্বপক্ষে, তবে ইদানীং আর আগের মতো অতটা নয়. আফগানিস্তানের সেনাবাহিনীর হাই-কম্যান্ডার জেনারেল শের মোহাম্মদ কারিমি বিবিসি-কে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে বলেছেন, যে তালিবানদের সরকারবিরোধী কার্যকলাপ পাকিস্তান অনায়াসেই বন্ধ করাতে পারে ঐ গোষ্ঠীর নেতাদের উপর হাল্কা চাপ দিয়েই.

     অবশ্যই ব্যাপারটা এত সরল নয়. আজকের পরিস্থিতিতে ঐতিহাসিক সংযোগের ভূমিকা আগের মতো তেমন একটা নেই. খাপছাড়া যে সব জঙ্গীরা নিজেদের তালিব বলে জাহির  করে,  তারাও কোনো অভিন্ন কম্যান্ডারের নির্দেশ মেনে চলে না. আবার শুনুন পন্ডিত ভলখোনস্কির বক্তব্য -

     অন্যদিকে ভারত বরাবরই আফগানিস্তানকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে এবং ইদানীং আরও চীনের বিরুদ্ধে ছায়া-যুদ্ধের মঞ্চ হিসাবে গণ্য করে এবং বাজি রাখে তালিবান বধ করা রাষ্ট্রীয় সরকার ও তথাকথিত উত্তরাঞ্চলীয় আঁতাতের উপর.

     আফগানি-খেলায় ইরানেরও নিজস্ব মতলব. তারা সরকারের সাথে যুঝুমান তথাকথিত বিরোধীদের আস্কারা দিতে চায় পশ্চিমী প্রভাব কমে গেলেই, তবে উগ্রপন্থী সুন্নী তালিবদের উপর আস্থা রাখে না. তাই ইদানীং ইরান বাজি ধরেছে বহুশ্রুত ফিল্ড-কম্যান্ডার গুলবেদ্দিন হেকমাতিয়ার ও তার ইসলামি পার্টির উপর.  শুনুন আবার এই বিষয়ে রুশী পন্ডিত বরিস  ভলখোনস্কি কি বলতে চান-

      ২০১৪ সালে অধিকাংশ সেনা আফগানিস্তান ছেড়ে যাওয়ার পরেও সেখানে প্রভাব বজায় রাখতে আমেরিকা উদগ্রীব. সেইজন্য তারা এমন কি সেই সব শক্তির সাথে রফা করতে রাজি, যাদের বিরুদ্ধে ১২ বছর ধরে যুদ্ধ করেছে, সেই তালিবদের সঙ্গে.

     বাস্তবে নির্দিষ্ট একটা কোনো শক্তির উপর বাজি ধরা ৯০-এর দশকের অল-আউট ওয়ারের পুনরাবৃত্তি ঘটাতে পারে. এবং দেখেশুনে মনে হচ্ছে, যে ভারত এটা বুঝতে শুরু করেছে. সলমন খুর্শিদের সাম্প্রতিক মন্তব্যে এটা পরিষ্কার, যে ভারত অতঃপর তালিবানদের বিবেচনাযোগ্য শক্তি বলে মেনে নিচ্ছে এবং তাদের অগ্রাহ্য করতে চাইছে না.