বুধবারে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ পাঁচ দিনের চিন সফর শুরু করেছেন – নতুন পদে এটা নিজের প্রথম বিদেশ সফর. চিনা ও পাকিস্তানী সংবাদ মাধ্যমের শীর্ষে এই সফরের সংজ্ঞাকে দুই দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতা বলেই মূলতঃ বিশেষ করে উল্লেখ করা হচ্ছে. কিন্তু স্ট্র্যাটেজিক লক্ষ্য, যা স্পষ্টই অর্থনৈতিক প্রকল্প গুলির ভিতরে রয়েছে, তা অনেক সুদূর প্রসারী. যদি এই প্রকল্পগুলি বাস্তবায়িত হয়, তবে এটা শুধু দক্ষিণ এশিয়াতেই শক্তির অবস্থান বদল করবে না, বরং আরও বিস্তৃত এলাকাতেও, যার মধ্যে ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকার পশ্চিম দিকও থাকবে.

পাকিস্তানের পার্লামেন্ট নির্বাচনে নওয়াজ শরীফের বিজয়ের পরেই তিনি নিজের নতুন প্রশাসনের তিনটি মুখ্য কাজ নির্দিষ্ট করেছেন: অর্থনীতি, অর্থনীতি ও আরও একবার অর্থনীতি. এই সব হেড লাইন ও কাজের বর্ণনার ঠিক নীচেই বর্তমানের সফরের কাজকর্মকে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে: এই সফর পরিকাঠামোর উন্নয়নে, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের বিকাশে ও পাকিস্তানের অর্থনীতিতে চিনের বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য উত্সর্গ করা হয়েছে.

আর যখন এমনকি কথা হচ্ছে মুখ্য বিষয় নিয়ে, যা বেজিংয়ে আলোচনা করা হতে চলেছে – অর্থাত্ পরিবহনের করিডর নিয়ে, যা চিনের সিনঝিয়ান – উইগুর স্বয়ংশাসিত এলাকার সঙ্গে পাকিস্তানের গোয়াদার বন্দরকে জুড়ে দেওয়া নিয়ে, তখন মুখ্য ভাবে বিশেষ করে বলা হচ্ছে অর্থনৈতিক দিকটিকে নিয়ে: বিশেষ অর্থনৈতিক এলাকা তৈরী করা, রেলপথের নেটওয়ার্কে উন্নতি করা ও পাইপ লাইন ব্যবস্থার বিকাশ ইত্যাদি. তারই মধ্যে এই করিডরের সংজ্ঞা শুধু অর্থনীতি দিয়েই সীমাবদ্ধ থাকছে না, বরং তা প্রাথমিক ভাবেই স্ট্র্যাটেজিক ও তার মধ্যে সামরিক-রাজনৈতিক সংজ্ঞাও পেয়ে যাচ্ছে. প্রসঙ্গতঃ দুই পক্ষের এই ক্ষেত্রে স্বার্থও আলাদা রকমের, কিন্তু তা একে অপরকে খুবই সার্থক ভাবে পরিপূরণ করছে, এই কথা উল্লেখ করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“চিনের জন্য এই পরিবহনের করিডর, যা গোয়াদার বন্দর থেকে শুরু হবে ও যা চিনের সাহায্যে তৈরী হয়েছে ও তাদের কোম্পানীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, তা বিশাল রকমের মানে রাখে – বিশেষ করে ২০১১ সালের শেষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থের দিক বদলের পররাষ্ট্র নীতির পরিপ্রেক্ষিতে, যা করা হতে চলেছে এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায়.আজ চিনের প্রয়োজনের শতকরা আশি ভাগ খনিজ তেল ও গ্যাস চিন পায় সমুদ্র পথে, আর তাদের বয়ে নিয়ে যাওয়া ট্যাঙ্কার গুলি বাধ্য হয় সংকীর্ণ মালাক্কা প্রণালী দিয়ে যেতে. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যেই অস্ট্রেলিয়ার ডারউইনে সামুদ্রিক পদাতিক বাহিনী মোতায়েন করেছে আর সিঙ্গাপুরে – নিজেদের নৌবহরের যুদ্ধ জাহাজ রেখেছে, আর এবারে তাদের সুযোগ হয়েছে সহজেই এই মালাক্কা প্রণালীকে বন্ধ করে দেওয়ার, আর ব্যতিক্রমী রাস্তা রয়েছে শুধু সুন্ডা প্রণালী দিয়ে.

তাই চিনের জন্য বাণিজ্যের মাল আনা নেওয়ার একটি আলাদা পথের গুরুত্ব খুবই বেশী (প্রথমতঃ, সেই কার্বন যৌগের কাঁচামাল আনার জন্যই”).

পাকিস্তানের জন্য গোয়াদার বন্দর ঘিরে পরিকাঠামোর উন্নতির অর্থ হল বেলুচিস্তানের জনগনের জীবনের মান বেড়ে যাওয়া – যে এলাকার ক্ষমতা খুবই সম্ভাবনাময় কিন্তু দেশের অন্যান্য এলাকার চেয়ে সেই অঞ্চল কম উন্নত. আর এটা, একদিক থেকে বেলুচিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের পায়ের তলা থেকে মাটি কেড়ে নেবে, যারা বিগত সময়ে খুবই সক্রিয় হয়েছে ও আরও বেশী করেই সমর্থন পাচ্ছে (অন্তত পক্ষে মানসিক ভাবে) সেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকেই, তাই ভলখোনস্কি বলেছেন:

“কিন্তু সবচেয়ে মোদ্দা কথা এটাই নয়, যদি গোয়াদার সিনঝিয়ান করিডর বাস্তবায়িত হয়, তবে এটা সরাসরি ভাবেই কাশ্মীরের সেই পাকিস্তান অধিকৃত এলাকা দিয়েই অনেকখানি যাবে. আর এর মানে হল যে, বর্তমানের কাশ্মীর ঘিরে অসমাধিত বিবাদ বাস্তবে সমাধান পেয়ে যাবে সেই স্ট্যাটাস-কো অবস্থার স্বপক্ষেই, যা মনে হয় না, ভারতের পছন্দ হবে”.

আর তার মানে হল যে, বেজিংয়ে নওয়াজ শরীফের সফরের সময়ে দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা গুলি, যা মনে হচ্ছে হবেই, তা বাস্তবায়িত করতে হলে অনেক সমস্যা পার হতে হবে.