সিআইএ সংস্থার প্রাক্তন কর্মী এডওয়ার্ড স্নোডেনকে ঘিরে কেলেঙ্কারি এবারে আকাশ ছুঁয়েছে. তার জন্য বোলিভিয়ার রাষ্ট্রপতির বিমান কূটনৈতিক সুরক্ষা হারিয়েছে. মস্কো থেকে লা-পাস যাওয়ার সময়ে এভো মোরালেসের বিমান বাধ্য হয়ে ভিয়েনা শহরে নেমেছে, যেখানে সেটা আবার তল্লাশী করে দেখা হয়েছে.

বোলিভিয়ার রাষ্ট্রপতি এভো মোরালেসের বিমান ইউরোপের দেশ গুলি ফিরে যেতে দেয় নি. ফ্রান্স, পর্তুগাল ও স্পেন নিজেদের আকাশ সীমাই এই বিমানের জন্য বন্ধ করে দিয়েছিল. তারা সন্দেহ করেছিল যে, এই বিমানে আমেরিকার পলাতক গুপ্তচর এডওয়ার্ড স্নোডেন রয়েছে. এভো মোরালেস মস্কো থেকে গ্যাস রপ্তানীকারক দেশ গুলির শীর্ষ সম্মেলন সেরে ফিরেছিলেন. এর আগে পলাতক গুপ্তচরের পরিস্থিতি নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বোলিভিয়ার রাষ্ট্রপতি বলেছিলেন যে, তিনি রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন নিয়ে ভেবে দেখতে পারেন. এই কথার ভিত্তিতে বেশ কয়েকটি ইউরোপের দেশের নেতারা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে, মোরালেস ঠিক করেছেন বেআইনি ভাবে স্নোডেনকে রাশিয়া থেকে উড়িয়ে নিয়ে যাবেন. তাই তারা রাষ্ট্রপতির বিমানকে নিজেদের বিমানবন্দরে নামতে দিতে চায় নিও এমনকি নিজেদের আকাশ সীমাও ব্যবহার করতে দেয় নি. আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে এটা করার অধিকার তাঁদের ছিল, এই কথা উল্লেখ করে আইনজীবী লিনা তাল্তসেভা বলেছেন:

“আসলে এবারের ঘটনাই বিরল প্রকৃতির নয়. যেমন, ২০০৪ সালের মার্চ মাসে জর্জ্জিয়া নিজেদের আকাশ সীমা বন্ধ করে দিয়েছিল, যাতে আঝারিয়া স্বয়ংশাসিত এলাকার নেতা আসলান আবাশিদজে ফিরে আসতে না পারেন. আর ২০১১ সালে তুর্কমেনিয়া ও তাজিকিস্তানের প্রশাসন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চাপে পড়ে নিজেদের দেশের আকাশ সীমা সুদানের রাষ্ট্রপতি ওমার আল-বাশিরের জন্য বন্ধ করে দিয়েছিল. আর এই ক্ষেত্রে – সেই সমস্ত রাষ্ট্রের স্বার্থের গুরুত্বের কথা চিন্তা করার সময়ে, যাদের উপর দিয়ে এমনকি অন্য দেশের রাষ্ট্রপতির বিমানও উড়ে যায় ও অতিথির স্বার্থের কথা মাথায় রেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে তাকে – সব কিছুই রাজনীতিবিদেরা স্থির করে থাকেন”.

কিন্তু বর্তমানের পরিস্থিতিতে বোলিভিয়ার রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে যে ঘটনা ঘটল, তাতে আন্তর্জাতিক আইনে একটা দৃষ্টান্তই রয়ে গেল. এভো মোরালেসের বিমান অস্ট্রিয়া নামতে দিয়েছে. সারা রাত ও আরও অর্ধেক দিন কূটনীতিবিদেরা তাঁর পরবর্তী যাত্রাপথ স্থির করেছেন. আলোচনার পরে ফ্রান্স ও পর্তুগাল নিজেদের আকাশ সীমা পার করতে দিতে রাজী হয়েছিল. সবার চেয়ে বেশী সময় ধরে প্রতিরোধ করেছে স্পেন, তারা বিশ্বাস করতে চায় নি রাষ্ট্রপতির মুখের কথায় যে, বিমানে স্নোডেন নেই, আর দাবী করেছে অস্ট্রিয়াতে থাকা স্পেনের রাষ্ট্রদূতকে বিমান খুঁজে দেখতে দিতে. বোলিভিয়া ক্ষোভের সঙ্গে এই উপায় প্রত্যাখ্যান করেছে. ফলে মোরালেসের সঙ্গে ব্যক্তিগত ভাবে কথা বলতে ভিয়েনা বিমান বন্দরে এসেছিলেন অস্ট্রিয়ার রাষ্ট্রপতি হাইনত্স ফিশার. তার পরেই খবর এসেছিল যে, অস্ট্রিয়ার প্রতিনিধিরা বিমানে প্রবেশ করেছেন ও সেখানে স্নোডেন নেই. স্পেন তখন আকাশ সীমা ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছিল. এভো মোরালেস নিজের দেশে ফিরে যাওয়ার পথ ধরেছিলেন, কিন্তু এই ঘটনার আন্তর্জাতিক প্রতিধ্বনি হয়েছে বিশালাকারে, এই কথা উল্লেখ করে রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ আন্তর্জাতিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের ডিরেক্টর আলেকজান্ডার অর্লোভ বলেছেন:

“আন্তর্জাতিক আইনের ক্ষেত্রে এটা নতুন দৃষ্টান্ত. কি করে রাষ্ট্র প্রধানের বিমানে তল্লাশী করা সম্ভব হয়, যা কূটনৈতিক সুরক্ষা কবচ পাওয়া! আপনারা একবার ভেবে দেখুন যে, কোন একটা দেশে, স্থানীয় প্রশাসন বিদেশী দূতাবাসের সম্পর্কে বেআইনি পদ্ধতি নিতে শুরু করবে. একই রকম ভাবে, এমনকি আরও বেশী করেই, এটা দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও তাদের পরিবহনের মাধ্যমের উপরেও বিস্তৃত থাকে, যেগুলি চড়ে তাঁরা যাতায়াত করে থাকেন”.

জেনেভায় রাষ্ট্রসঙ্ঘের দপ্তরে বোলিভিয়ার স্থায়ী রাষ্ট্রদূত আনহেলিকা নাভার্রো ইয়ানোস রাষ্ট্রপতির এই বিমান তল্লাশীকে বলেছেন আগ্রাসন ও আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘণ করা বলে. এভো মোরালেসের সঙ্গে একজোট হওয়ার কথা বলেছেন ইকোয়েডর ও আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রপতি. দক্ষিণ আমেরিকার জোটের রাষ্ট্র গুলির নেতারা জরুরী বৈঠক করতে যাচ্ছেন বোলিভিয়ার রাষ্ট্রপতির বিমান ঘিরে পরিস্থিতি সম্বন্ধে আলোচনা করার জন্য.

বলা উচিত্ হবে যে, ইউরোপীয় সঙ্ঘের বহু সদস্য দেশই কোন রকমের লজ্জা না করেই স্নোডেনের ফাঁস করে দেওয়া তথ্য গ্রহণ করেছে. কোন সন্দেহই নেই যে, পুরনো বিশ্বের রাজনীতিবিদেরা প্রাক্তন গুপ্তচরের পরবর্তী তথ্যের জন্য অপেক্ষা করে আছে আর বোধহয় তা ব্যবহার করতে চায় আমেরিকার লোকদের সঙ্গে নিজেদের সম্পর্ক নিয়ে বোঝাপড়া করার জন্য. কিন্তু তা স্বত্ত্বেও তারা ওদের খুব বেশী শক্তিশালী বিরক্তি উত্পাদনের ভয় পাচ্ছে. অনেক সোজা হল তৃতীয় পক্ষের উপরে অপমানজনক কাজ করা, যা তাদের দৃষ্টিকোণ থেকে দুর্বল দেশ. এটা ইউরোপের কূটনীতির জন্য খুবই অভ্যস্ত ব্যাপার, স্রেফ সাধারণ দুমুখো নীতি.

তারই মধ্যে আন্তর্জাতিক কেলেঙ্কারির জন্য দোষী এডওয়ার্ড স্নোডেন আগের মতই শেরেমেতিয়েভো বিমান বন্দরের ট্রানজিট এলাকায় রয়েছে. সে অপেক্ষা করছে তাকে রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়ার অনুরোধের প্রতিক্রিয়া, যা সে কয়েকটি দেশের কাছে পাঠিয়েছে. ইতিবাচক উত্তর আপাততঃ- কেউই দেয় নি.