পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ দুর্নীতির বিরুদ্ধে সার্বিক সংগ্রাম ঘোষণা করেছেন. দেশের সরকারি কর্মচারীদের বিশাল বাহিনীর প্রতি নতুন মন্ত্রীসভার প্রধান খুব গম্ভীর ও কঠোর সুরে বলেছেন: ঘুষখোর ও সরকারি অর্থ যারা নয়ছয় করে, তাদের সবাইকে সমস্ত পদ থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হবে ও তাদের জায়গায় নেওয়া হবে শুধু উপযুক্ত কর্মচারীদেরই, যাদের মর্যাদায় কোন দাগ লাগে নি. কিন্তু নওয়াজ শরীফের দুর্নীতির উপরে আক্রমণ খাবি খেতে পারে: সেই ধরনের পরিকল্পনা, যখন একদল সরকারি কর্মচারী আরেক দলের উপরে নজরদারি করবে, তা একেবারেই ইউটোপিয়া বলে মনে হয়, এই রকম মনে করে আমাদের সমীক্ষক সের্গেই তোমিন বলেছেন:

“পাকিস্তানের নতুন প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে এই ঘোষণা বহু লক্ষ নির্বাচকই আশা করেছিলেন, আর তা সোমবারে ঘোষিত হয়েছে, যেন নতুন সরকারের প্রধান নীতির মতই. “বর্তমানের প্রশাসনের জন্য সবচেয়ে বড় কাজ হল দুর্নীতির বিরুদ্ধে সংগ্রাম. এখন থেকে সরকারি কাজের ব্যবস্থায় শুধু কাজ করতে পারবে উপযুক্ত কর্মচারীরাই, যাদের সমাজে মর্যাদা পরিস্কার. দুর্নীতির ঘটনার সঙ্গে জড়িত সরকারি কর্মচারীদের অবিলম্বে বরখাস্ত করা হবে”, - বলা হয়েছিল মন্ত্রণালয়ের প্রধান ও দপ্তর প্রধানদের প্রতি লিখিত এক বিজ্ঞপ্তিতে”.

শুকনো সরকারি দলিলের সঙ্গে একেবারেই এক রকমের নয় এমন এই বার্তায় জড়ানো এক নাটকীয়তা যেন নিজের মধ্যে সমস্ত পাকিস্তানের রাস্তায় জনতার দাবীকেই ভরে নিয়েছে, নির্বাচনের প্রাক্কালে আমেরিকার ড্রোন বিমানের আঘাতের সঙ্গে একই রকম গুরুত্ব দিয়ে লোকে দাবী করেছিল দুর্নীতি বন্ধ করার.

দেশের এই রকমের করুণ অবস্থা, অর্থনীতিই দুর্নীতির কর্কট রোগে আক্রান্ত বলে সমর্থন করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার রক্ষা সংস্থা গুলি, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল সংস্থার তথ্য অনুযায়ী ২০০৮ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত, যখন সরকারে পাকিস্তানের পিপলস্ পার্টি কায়েম ছিল, তখন দুর্নীতির কারণে দেশের বাজেটের ক্ষতি হয়েছে ৯ হাজার ৪০০ কোটি ডলার.

নওয়াজ শরীফের এই বার্তাকে কোন পরিকল্পনা বলাই কঠিন, কারণ তা খুবই ঘোষণা সর্বস্ব ও তাতে দুর্নীতির সঙ্গে লড়াই করার মতো কোন নির্দিষ্ট ব্যবস্থার কথা নেই. সমস্ত ঠগ ও চোরকে বের করে দেওয়া ও তাদের জায়গায় সচ্চরিত্র লোকদের এনে বসানো যতটা ভাল শুনতে লাগে, ততটাই কাল্পনিক মনে হয়. এই ধরনের আহ্বানের প্রতি আসক্ত থাকেন শুধু জনপ্রিয় হতে চাওয়া লোকরাই বিশ্বের সমস্ত দুর্নীতির কারণে খারাপ হয়ে যাওয়া দেশগুলোতেই. তাই সের্গেই তোমিন বলেছেন:

“শরীফের উদ্যোগের সঙ্গেই তার সমস্ত বাস্তব প্রয়োজনীয়তা থাকা স্বত্ত্বেও প্রচুর প্রশ্নের একসাথে উদয় হয়. কে আর কি ভাবে সত্ আর অসত্ লোকদের আলাদা করবে? দুর্নীতির সঙ্গে লড়াই রাজনৈতিক হিসাব নিকাশের অস্ত্র হবে না তো? আর শেষমেষ, সবচেয়ে বড় কথা হল যে, রাজনৈতিক সংশোধন, যা আশু প্রয়োজন তার থেকে আলাদা করে দুর্নীতির সঙ্গে লড়াই কি করে হবে, যার জন্যে প্রয়োজন স্বচ্ছ নিয়ম নীতি, তা যেমন ব্যবসায়ে, তেমনই রাজনীতিতে আর সামাজিক নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রতিষ্ঠান গঠনের মাধ্যমে”?

আপাততঃ এই সব প্রশ্নের উত্তর নেই. এই প্রসঙ্গে দুর্নীতির সঙ্গে লড়াইয়ের জন্য উঠে দাঁড়িয়েছেন এমন এক রাজনীতিবিদ, যিনি ইতিমধ্যেই দু’বার প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন ও তার মধ্যেই দুর্নীতির জন্য শাস্তি পেয়েছিলেন. সকলেই জানে যে, তাঁর শাসনের সময়ে দুর্নীতি ছিল সর্বব্যাপী. “প্রবল দুর্নীতি নিয়ে বহু খণ্ডের রচনা সংগ্রহ লেখা যেতে পারে... আমি সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি যে, বিশাল আকারে দুর্নীতি ক্ষমতার সর্ব্বোচ্চ স্তরে, রাজনীতিবিদদের মধ্যে, সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে ও ব্যাঙ্কের কর্তাদের মধ্যে ছড়িয়ে গিয়েছে”, লিখেছেন নিজের স্মৃতিচারণের বই “লাইন অফ ফায়ারে” পাকিস্তানের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি পারভেজ মুশারফ. তিনি এই দুর্নীতির জন্য বেশীর ভাগ দোষই দিয়েছেন নওয়াজ শরীফের উপরে ও তার সরকারের উপরে, যার মন্ত্রীসভাকেই পারভেজ মুশারফ উত্খাত করেছিলেন ১৯৯৯ সালের হেমন্ত কালে.

এখন নওয়াজ শরীফ আরও একটি ঐতিহাসিক সুযোগ পেয়েছেন সংশোধনের. কিন্তু তিনি কি এই সুযোগ কাজে লাগাবেন? অথবা ব্যবসার ক্ষেত্রে পুরনো নিয়ন্ত্রণের গূঢ় ইচ্ছাই আবার করে প্রবল হবে? নিজের ম্যানিফেস্টকে কাজে পরিণত করতে হলে নওয়াজ শরীফকে একজন রাজনীতিবিদ হিসাবে আবার করে জন্ম নিতে হবে. এই ধরনের মেটামরফোসিস রাজনীতিতে হয়ে থাকে, তবে বিশ্বের অভিজ্ঞতা যেমন দেখিয়েছে যে, তা খুবই কম হয়ে থাকে.