বিগত কিছু দিনের ঘটনা ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক উন্নতির বিষয়ে কিছুটা আশা জুগিয়েছে. গত সপ্তাহের শেষে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ, ইসলামাবাদে ভারতীয় ব্যবসায়ীদের এক দলকে, যারা পাকিস্তানে এসেছেন বাত্সরিক পাক-ভারত যৌথ ব্যবসায়িক পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে, সম্ভাষণ করে ঘোষণা করেছেন যে, তাঁর মন্ত্রীসভা এই অঞ্চলে শান্তি ও সমৃদ্ধির বিকাশের জন্য মৈত্রী ও সহযোগিতার রাজনীতি করার মানসিকতা রাখে.

প্রসঙ্গতঃ, ভারতের প্রতি মৈত্রী সুলভ বার্তা, সেই মুহূর্তেই পাকিস্তানের কট্টর পন্থীদের তরফ থেকে কড়া সমালোচনার মুখে পড়েছে. আর এটাও সত্য যে, ভারতেও খুব কম শক্তি খুঁজে পাওয়া যাবে না, যারা আগ্রহ প্রকাশ করে থাকে দ্বিপাক্ষিক সমস্যাকে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে সমাধান করার.

ভারতীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সাক্ষাত্কারের সময়ে নওয়াজ শরীফ ঘোষণা করেছেন যে, পাকিস্তান ঠিক করেছে ভারতীয় ব্যবসায়ের তরফে বিনিয়োগ বান্ধব নীতি নেওয়াকে প্রশ্রয় দেওয়ার. এর প্রমাণ হিসাবে তিনি আরও ঘোষণা করেছেন যে, আসন্ন সময়ে ভারতে যাবেন পাকিস্তানের জল সম্পদ ও শক্তি মন্ত্রী খাওয়াজা মুহম্মদ আসিফ, যিনি দেশে বিদ্যুত শক্তি আমদানীর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করবেন ও অন্যান্য সহযোগিতার ক্ষেত্র সম্বন্ধেও কথা বলবেন.

যদি পাকিস্তানের মন্ত্রীসভা সত্যই এই অঞ্চলে নিজেদের বৃহত্তম প্রতিবেশীর সঙ্গে ও বহু দিনের প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে সম্পর্ক তৈরী করতে মনস্থির করে থাকে, তবে এটাকে ইতিবাচক ইঙ্গিত বলেই ধরা যেতে পারে, বলেছেন রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি. প্রসঙ্গতঃ, বহু নৈর্ব্যক্তিক ও ব্যক্তি সম্বন্ধিত পরিস্থিতি রয়েছে, যেগুলি বলে দিচ্ছে যে, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে গুণগত ভাবে সম্পর্কের চরিত্র বদল করা সহজ কাজ হবে না, তাই তিনি যোগ করেছেন:

“প্রথমতঃ, এমনকি ভারতে শক্তি মন্ত্রীকে পাঠানোও – একটি খুবই বাধ্য হয়ে করা কাজ. পাকিস্তান বিদ্যুত্শক্তির খুবই তীক্ষ্ণ অভাব বোধ করছে. লোড শেডিং এমনকি বৃহত্ শহরগুলিতেও এক স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে. আজ দিনে সাড়ে চার থেকে পাঁচ মেগাওয়াট বিদ্যুত্শক্তি কম হচ্ছে, আর গত পাঁচ বছরে এর অভাবে অর্থনীতির ক্ষতির পরিমান হয়েছে এক লক্ষ কোটি পাকিস্তানের রুপিয়া (প্রায় ১হাজার ১৬০ কোটি মার্কিন ডলারের সমান)”.

দ্বিতীয়তঃ, ব্যবসায়ীদের সামনে নিজের ভাষণে প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ বলেছেন তাঁর আগের মেয়াদের মন্ত্রীসভার অভিজ্ঞতার কথা, যা ভারতের সঙ্গে মৈত্রী সুলভ সম্পর্ক উপরেই নির্ভর করে ছিল. কিন্তু যদি মনে করা হয়, যেমন এই এলাকায় পারমানবিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার কথা, তবে তা সবচেয়ে বেশী করে হয়েছিল সেই নওয়াজ শরীফের প্রধানমন্ত্রীত্বের সময়েই, যখন ১৯৯৮ সালের মে মাসে প্রথমে ভারত ও তারপরে পাকিস্তান একসারি পারমানবিক বোমার পরীক্ষা করেছিল.

তৃতীয়তঃ, সেই পাকিস্তানেই ঐস্লামিকেরা মন্ত্রীসভার ভারত থেকে বিদ্যুত্শক্তি কেনার ইচ্ছাকে একেবারে তরোয়ালের ডগায় এনে দাঁড় করিয়েছে. সবচেয়ে বড় কট্টরপন্থী দল জামাত-উদ-দাওহা, (বর্তমানে নিষিদ্ধ সন্ত্রাসবাদী সংগঠন লস্কর-এ-তৈবা দলের রাজনৈতিক শাখা) ও তাদের নেতা হাফিজ সাঈদ ঘোষণা করেছে যে, “ভারতের কাছে ভিক্ষা করার কোন দরকার নেই”, পাকিস্তানকে বিদ্যুত্শক্তি বেচার জন্য, যা তারা সেই “পাকিস্তানের নদী” গুলি থেকেই উত্পাদন করে থাকে. এই প্রসঙ্গে আবার বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন

“আর এখানেই আমরা আসছি মূল প্রশ্নের সামনে, যা দুই দেশের সম্পর্ককে জটিল করেছে. এটা এমনকি পারমানবিক অস্ত্রের প্রশ্নও নয়, অথবা এলাকা নিয়েও সেই রকমের কোন সমস্যা নয়, বরং কাশ্মীরের জল সম্পদের ভাগ করা নিয়েই. সেই ১৯৬০ সালে পাকিস্তান ও ভারত সিন্ধু নদীর জল ভাগ করা নিয়ে চুক্তি করেছিল, যা এই কিছুদিন আগেও মনে করা হয়েছে জল ব্যবহার নিয়ে বিতর্কিত প্রশ্নের সমাধানের এক উপমা দেওয়ার মতো উদাহরণ বলেই”.

কিন্তু বিগত সময়ে ভারত বাস্তবে এই চুক্তির শর্তকেই আবার করে দেখতে চাইছে, তারা ঝিলম নদীর উপরের দিকের অববাহিকায়, অংশতঃ, নীলম (কিষান-গঙ্গা) নদীতে চাইছে বড় ধরনের জলবিদ্যুত প্রকল্প বানাবার কথা ভাবছে. পাকিস্তান এই পরিকল্পনার মধ্যে নিজেদের উপরে হুমকি দেখতে পাচ্ছে – অংশতঃ, বিদ্যুত কেন্দ্রের বিষয়ে, যা ঝিলম নদীর নীচের দিকের অববাহিকায় নির্মাণের কথা হচ্ছে.

এখন এই প্রশ্ন হেগ শহরে বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক আদালতে রয়েছে, যারা আপাততঃ, কোনও রায় দেয় নি. কিন্তু সব দেখে শুনে মনে হচ্ছে যে, হেগের আদালত বোধহয় ভারতের পক্ষেই রায় দেবে, তাই ভলখোনস্কি যোগ করেছেন:

“আর এর অর্থ হল যে, ভারত এর পরে খুব সহজেই এমন একটা দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়কে দেখতে পারে, যা অনুযায়ী জল ও অন্যান্য পাকিস্তানের সঙ্গে বিরোধের সমস্যা গুলিকে শক্তির অবস্থান থেকে সমাধানের কথা ভাবা হতে পারে.তারই মধ্যে ভারতের উচিত হবে ভেবে দেখার যে, “জলের অস্ত্র” – এটা আবার দুমুখো অস্ত্র. আর এটা শুধু সদ্য বিগত সময়ে বিপর্যয়ের মতো বন্যাই দেখিয়ে দেয় নি, যা হয়েছে গঙ্গা নদীর উপরের দিকের অববাহিকাতে, বরং হিমালয় পর্ব্বতের উল্টো দিকের পাহাড়ী এলাকাতেও হয়েছে, যেখানে ভারত নিজেই চিনের ব্রহ্মপুত্র নদীতে বাঁধ দেওয়ার পরিকল্পনার উপরে অধীনতা স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছে”.

সুতরাং, বোধহয়, পাকিস্তানের বর্তমান খারাপ অবস্থাকে এক তরফা সুবিধা আদায়ের জন্য ব্যবহার করতে যাওয়ার লোভ সম্বরণ করাই ঠিক হবে – তার বদলে শান্তির প্রচেষ্টা ও আঞ্চলিক সমৃদ্ধির কথা ভাবাই ভাল, কারণ আগের ব্যাপারটা এটায় কোন সহায়তা দিতে পারবে না. এই রকমই ভেবে বের করেছেন রুশ বিশেষজ্ঞ.