পঞ্চদশ শতাব্দীটা ছিল ভৌগলিক আবিষ্কারের যুগ. নতুন নতুন ভূমি আবিষ্কার করছিল দুঃসাহসী সমুদ্রযাত্রীরা, গবেষকরা মেতে উঠেছিলেন নতুন নতুন জগত্ অধ্যয়নের জোরদার কাজে. বহু ইউরোপীয়ই রহস্যে মোড়া ভারতবর্ষ আবিষ্কার করার চেষ্টা করছিল, কিন্তু তাদের পেছনে ফেলে দিয়েছিলেন এক রুশী পরিব্রাজক - বণিক আফানাসি নিকিতিন. 'তিন সমুদ্র পেরিয়ে' নামক তাঁর ডায়েরীতে নিকিতিন হুবহু লিপিবদ্ধ করেছিলেন ভারতবাসীদের জীবনযাত্রা, তাদের আচার-বিচার, ঐতিহ্য, ধর্মবিশ্বাস. আরও লিখেছিলেন সমসাময়িক রাজনীতি ও বাণিজ্য নিয়ে.

      নিকিতিন লিখেছেন, যে পথপ্রদর্শক হওয়ার কোনো আকাঙ্খা তার ছিল না, তিনি শুধু মোটা মুনাফায় পণ্য বেচাকেনা করতে চেয়েছিলেন. ১৪৬৬ সালে ত্ভের শহর থেকে যাত্রা করে তিনি ভীড়ে গিয়েছিলেন মস্কোর নাইটের দূতের নৌবহরে. তারা যাত্রা করেন দক্ষিণ অভিমুখে. ভোলগা নদী ধরে আস্ত্রাখান শহরের কাছে পৌঁছানোর পরে জলদস্যুরা পণ্যসমেত জাহাজ হাতিয়ে নিয়েছিল. সেই মুহুর্ত থেকেই আফানাসি নিকিতিন শুরু করেছিলেন ডায়েরীর পাতায় তাঁর ভ্রমণ বৃত্তান্ত লিপিবদ্ধ করা. নিঃস্ব হয়ে যাওয়া বণিক অজানা বিদেশে ভাগ্যসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেন. নিকিতিন প্রায় গোটা পারস্য পাক দিয়ে সমুদ্র তীরবর্তী ওরমুজ শহরে পৌঁছান.  কিন্তু তার ব্যবসা তেমন জমলো না. তখন নিকিতিন একটি দ্রুতগতিসম্পন্ন আরবী ঘোড়া কিনে নিয়ে গেলেন ভারতবর্ষে. তাঁর মাথায় এলো - অভিজাত গোত্রের আরবী ঘোড়া ভারতে চালান করার ব্যবসাটা লাভজনক, কারণ তখন ভারতে রেসের ঘোড়া চালান হতো আরব দুনিয়া থেকেই. ১৪৬৯ সালে নিকিতিন অধুনাতন মুম্বাই শহরের নিকটবর্তী চৌদা বন্দরে জাহাজ থেকে নেমেছিলেন. ভারতে গিয়ে আফানাসি নিকিতিন শহরের পর শহর ঘুরে রোজ লিখতেন ভারতবাসীদের জীবনযাত্রা, আচার-ক্রিয়া নিয়ে, মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও বিস্ময়কর মন্দিরগুলির বিবরণ. পরিব্রাজক ভাব জমিয়েছিলেন যেমন ক্ষমতাবান নায়েবদের সাথে, তেমনই সাধারণ খেটে-খাওয়া মানুষের সাথে. বহুশ্রুত ভারতীয় সুগন্ধী মসলাপাতি, অমূল্য সব রত্ন, মুক্তো, রেশমের কারবার করার ধান্ধা করেছিলেন তিনি. নিকিতিন লিখেছিলেন - "ভারতীয়দের সাথে আলাপ করতে আমার কোনো অসুবিধা হয় না. তারা নির্দ্বিধায় আমাকে গল্প করে তাদের খাবারদাবার, ব্যবসাপাতি, ধর্মানুষ্ঠানাদি সম্পর্কে, এমনকি তাদের বউদের সম্পর্কেও আমার কাছ থেকে কোনোকিছু গোপন করে না'. তাই নিকিতিনের লেখা অকপট ও সুচিন্তিত দিনলিপি এতখানি অমূল্য আমাদের কাছে. দীর্ঘ পরিব্রজ্যার পরে নিকিতিন স্বভূমিতে প্রত্যাবর্তণের দৃঢ় সংকল্প করলেন. কিন্তু দুর্ভাগ্যবশতঃ, ১৪৭৪ সালে পরিব্রাজক স্বভূমির অল্প দূরেই স্মোলেনস্ক শহরে মারা যান. জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত নিকিতিন তার ডায়েরী লেখা ছাড়েননি. সৌভাগ্যবশত তার দিনলিপি অক্ষত ছিল মস্কোর নাইট তৃতীয় ইভানের খাস-দরবারে.

       কোনো কোনো ঐতিহাসিকের অনুমান, যে নিকিতিন আদৌ সাধারণ বণিক ছিলেন না, ছিলেন গুপ্তচর, যিনি প্রাচ্যের দেশগুলি সম্মন্ধে প্রমাণিত তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন নাইট তৃতীয় ইভানের জন্য. মনযোগী পাঠক লক্ষ্য করবেন, যে নিকিতিনের লেখা বৃত্তান্তে অনেক ঝকমারি. কেন যে তিনি ভোলগা নদী ধরে সাধারণ পণ্যবাহী জাহাজে চড়ে বাণিজ্য করতে গেলেন না, গেলেন মস্কোর নাইটের নৌবহরে! তারপর নিকিতিন লিখছেন, যে জলদস্যুরা ঐ নৌবহর লুন্ঠন করার পর তিনি নিঃস্ব হয়ে গেছিলেন - তাহলে তারপরে গোটা পারস্য সফর করা, দুর্মূল্য দ্রুতগতির ঘোড়া কেনার ও ভারতে পৌঁছানোর রেস্ত তার এলো কোথা থেকে!?  সে সম্পর্কে 'তিন সমুদ্র পেরিয়ে'-তে তিনি নিরুত্তর. ধারণা করা যেতে পারে, যে আফানাসি নিকিতিনের পরিব্রজ্যার পৃষ্ঠপোষক ছিলেন মস্কোর নাইট, যিনি তার আসল উদ্দেশ্য সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলেন.

       মূল পান্ডুলিপিতে 'তিন সমুদ্র পেরিয়ে' লেখা ছিল আরবী, ফার্সি ও তুর্কি ভাষায়. এটা কি আশ্চর্যজনক নয়, যে পঞ্চদশ শতকে একজন সাধারণ রুশী বণিকের তিন-তিনটি অপরিচিত প্রাচ্য ভাষায় এতখানি দখল ছিল?  আরও একটা ধাঁধাঃ নিকিতিনের ডায়েরী মস্কোয় পৌঁছালো কি করে?  খুব সম্ভবতঃ, মৃত্যুর অব্যবহিত আগে নিকিতিন মস্কোর নাইটের কোনো ভৃত্যকে দিয়ে গেছিলেন তার ভ্রমণের খতিয়ান, যে সেটা নাইটের দরবারে নিয়ে এসেছিল.

      তবে আসল প্রশ্নটাই থেকে যাচ্ছে আফানাসি নিকিতিনের আত্ম পরিচয় নিয়ে. আমরা প্রায় কিছুই জানি না - কবে তার জন্ম হয়েছিল, তার কোনো সংসার ছিল কিনা, খ্যাতনামা ঐ পরিব্রজ্যার আগে তিনি কি করতেন?

      তবুও, যাই হোক না কেন,  রুশী বণিক-গুপ্তচর ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছেন. ১৯৫৫ সালে ত্ভের শহরে আফানাসি নিকিতিনের পূর্ণাঙ্গ স্মৃতিমূর্তি উন্মোচন করা হয়েছে, আর ভারতবর্ষ সম্পর্কে তার লেখা 'তিন সমুদ্র পেরিয়ে' প্রাচ্য দুনিয়া সম্পর্কে রাশিয়ায় মধ্যযুগে লেখা অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংকলন.