বিগত সপ্তাহের শেষে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন এশিয়া দেশ গুলিতে সফরের মধ্যে পাকিস্তানে গিয়েছিলেন. যতক্ষণ তিনি ও তাঁর সহকর্মী নওয়াজ শরীফ সম্মিলিত ভাবে সন্ত্রাসের মোকাবিলার প্রয়োজন নিয়ে কথা বলছিলেন, জঙ্গীরা ততক্ষণ এই বিষয়ে নিজেদের মতো করেই উত্তর দিয়েছে: দেশের বিভিন্ন শহরে একসারি সন্ত্রাসের ফলে পঞ্চাশ জনের বেশী নিহত হয়েছেন, অনেক লোক আহতও হয়েছেন. এই অন্তর্ঘাত মূলক কাণ্ডগুলি বিগত বছর গুলির ঘটনা পরম্পরার যুক্তির সাথে সম্পূর্ণ ভাবেই মিলে যাচ্ছে: আপাততঃ যতক্ষণ কথাবার্তায় পশ্চিম পাকিস্তানকে তার সন্ত্রাসের সঙ্গে যুদ্ধে সমর্থন করছে, ততক্ষণ কারো পক্ষে লাভজনক হচ্ছে এই দেশে পরিস্থিতিকে উত্তেজিত রেখে, এমন একটা দেখার মতো অবস্থা তৈরী করে, যাতে মনে হয় যে, পাকিস্তান একটা “ফেল হয়ে যাওয়া রাষ্ট্র” হওয়ার কিনারাতেই রয়েছে.

গত রবিবারে সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসের আঘাত হয়েছে ঐতিহ্য মেনেই সন্ত্রাসবাদীদের জন্য প্রিয় শহর কোয়েটাতে, যেখানে ২৮জন নিহত হয়েছেন, আর পেশোয়ারে, যেখানে মারা গিয়েছেন ১৭জন. বিগত সপ্তাহের শেষে পাকিস্তানের পশ্চিমে সব মিলিয়ে মৃত নিরীহ মানুষের সংখ্যা পঞ্চাশের বেশী হয়েছে.

একই সময়ে ইসলামাবাদে ডেভিড ক্যামেরন ও নওয়াজ শরীফ সন্ত্রাসের সঙ্গে সম্মিলিত লড়াইয়ের কথা বলেছেন. ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী, এর আগে কাবুল হয়ে এসে, আশ্বাস দিয়েছেন, যে, তিনি সমস্ত কিছুই করবেন, যাতে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের নেতৃত্বের অবস্থান কাছে আনা সম্ভব হয়, যাদের মধ্যে বিগত সময়ে খুব একটা কম মনোমালিন্য হয় নি. এই প্রসঙ্গে তিনি গ্রেট ব্রিটেন ও পাকিস্তানের আগ্রহের কথা আবারও বলেছেন যাতে, আফগানিস্তান এক স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধিশালী দেশে পরিণত হতে পারে. প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরন – একই সঙ্গে ঘোষণা করেছেন যে, “পাকিস্তানের বন্ধুরা ব্রিটেনের বন্ধু ও পাকিস্তানের শত্রুরা ব্রিটেনেরও শত্রু”.

শুনতে সুন্দর মনে হয়, কিন্তু এই রকম ভাবার ভিত্তি রয়েছে যে, এই সমস্ত ঘোষণা করা হয়েছে শুধু জনতার কথা মাথায় রেখেই, আর সত্যিকারের ঘটনা পরম্পরা এই ছবির থেকে অনেক দূরে, - এই রকম মনে করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“যদি এই দিয়ে শুরু করা হয় যে, ক্যামেরন পাকিস্তানে এসেছেন ঠিক তার পরেই, যখন মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব জন কেরি একেবারে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে নিজের পাকিস্তান সফর বাতিল করেছেন, তবে ন্যাটো জোটে মার্কিনদের সবচেয়ে কাছের সহকর্মী দেশের যুক্তি বোঝা সহজ হয়: পাকিস্তানে আমেরিকা বিরোধী মানসিকতার উত্তপ্ত পরিস্থিতি খুবই বেশী, আর ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রীকে মুখ্য আলোচনাকারী হিসাবে এগিয়ে দেওয়া পাকিস্তান ও পশ্চিমের মধ্যে সম্পর্ক কিছুটা কমাতে সাহায্য করতে পারে”.

কিন্তু জঙ্গীরা এই যুক্তিতে “ঠকে” যায় নি, তারা ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানিয়েছে অন্তর্ঘাত দিয়ে. আর এখানেই অন্য একটা প্রশ্নের উদয় হয়: আর কে, ঠিক করে বললে দোষী, যার জন্য পাকিস্তানের পশ্চিমে সন্ত্রাসবাদী কাজের একটা কুণ্ড তৈরী হয়েছে, যা শুধু পাকিস্তানকেই হুমকি দিচ্ছে না, বরং সারা এলাকাকেই দিচ্ছে?

কারণ বাস্তবে, ২০০১ সালে পশ্চিমের অপারেশনের আগে পাকিস্তানকে নিয়ে সন্ত্রাসবাদ বলতে গেলে শুধু পুরনো কাশ্মীর সমস্যা আর ভারত-পাক সম্পর্ক নিয়েই বলা যেতে পারত. দেশের ভিতরে পরিস্থিতি ছিল খুবই শান্ত. আমেরিকা বিরোধ মনোভাব শুরুই হয়েছিল প্রতিবেশী আফগানিস্তানে তালিবদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরে – এই রকম মনে করে বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“প্রথমে এর প্রকাশ হয়েছিল গণ মিছিল ও সমাবেশ দিয়ে, তারপরে কট্টরপন্থীরা সশস্ত্র যুদ্ধের পথ নিয়েছিল. ২০০০ সালের শুরুতে পাকিস্তানে একই নামের অথচ একেবারেই এক রকমের নয় এমন আফগানিস্তানের তালিবদের মতই সংগঠন তৈরী হয়েছিল – পাকিস্তানের তেহরিক-এ-তালিবান পাকিস্তান. তার সৃষ্টির উত্স মুখে যারাই থাকুক না কেন, তাদের লক্ষ্য ছিল স্পষ্ট: প্রথমতঃ, আফগানিস্তানের এলাকার বাইরে যুদ্ধকে বার করে দেওয়া, অর্থাত্ জঙ্গীদের সক্রিয়তা ন্যাটো জোটের সেনাদের বিরুদ্ধে না পাঠিয়ে পাকিস্তানের সরকারি যন্ত্রের বিরুদ্ধে পাঠানো; আর দ্বিতীয়তঃ, - খোলাখুলি ভাবে সন্ত্রাসবাদী সংগঠন আফগানিস্তানের তালিবদের সঙ্গে “একই নামে” তৈরী করা, যার ইমেজ আফগানিস্তানে তালিবদের প্রধান শত্রু ন্যাটো জোটের উপরে প্রসারিত করা যায়”.

পাকিস্তানের এলাকার উপরে আমেরিকার ড্রোন বিমানের আঘাত এই বিরোধের আগুনে ঘৃতাহুতি করেছে. আমেরিকার লোকদের উপরে প্রতিশোধ নেওয়ার কোনও সুযোগ না পেয়ে, পাকিস্তানের তালিবরা নিজেদের প্রশাসন বিরোধী সক্রিয়তা বৃদ্ধি করেছে.

এই রকমের পরিস্থিতিতে বেলুচিস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সক্রিয়তা সম্বন্ধে মনে করিয়ে দেওয়া নাও যেতে পারে, যারা কম করে হলেও ওয়াশিংটনে ক্রমবর্ধমান মানসিক (এটা কম করে হলেও) সমর্থন পাচ্ছে.

এই পরিস্থিতিতে ডেভিড ক্যামেরন স্রেফ “ভাল পুলিশের” ভূমিকা নিতে চেষ্টা করছিলেন, বলে রাশিয়ার বিশেষজ্ঞ মনে করেছেন. পশ্চিমের রাজনীতির মূল বিষয় হল, পাকিস্তানের এমন একটা ইমেজ তৈরী করে দেওয়া যে, সেটা “ফেল করা রাষ্ট্র”, আর সেটা কিন্তু এর ফলে পাল্টায় নি.