শুরু করছি আমাদের নিয়মিত অনুষ্ঠান – ‘রাশিয়া ও ভারতীয় উপ-মহাদেশঃ ঘটনাবলী, স্মরণযোগ্য ব্যক্তিত্বরা, উল্লেখযোগ্য তারিখগুলি’. এই মাসিক অনুষ্ঠানে আমরা স্মরণ করি সেই সব উল্লেখযোগ্য তারিখগুলি ও সেই সব শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিদের, যেগুলি ও যারা রাশিয়ার সাথে ভারতীয় উপ-মহাদেশের দেশগুলির সম্পর্কের ইতিহাসে অনন্য অবদান রেখেছে বা রেখেছেন.

      ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতমা পুরোধা ও পরবর্তীতে প্রখ্যাত রাজনৈতিক ও সমাজকর্মী অরুনা আসফ আলি বলেছিলেন – “রাশিয়া ও ভারতবর্ষের মধ্যে ঐতিহাসিক মৈত্রী ও সহযোগিতা অদৃষ্টনামা. এই দুই দেশের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক পারস্পরিক স্বার্থ রক্ষা করে”. উপোরক্ত উদ্ধৃতি তিনি দিয়েছিলেন ১৯৫০ সালে তাঁর প্রথমবার সোভিয়েত ইউনিয়ন সফরের পর. সেবার প্রায় তিন মাস ধরে আমাদের দেশ সফর করা কালে অরুনা আসফ আলি যা স্বচক্ষে অবলোকন করেছিলেন, তা তাঁর প্রত্যাশা ছাপিয়ে গিয়েছিল. পরবর্তীকালে তিনি ইসকাসের (ইন্দো-সোভিয়েত কালচ্যারাল সোসাইটির) নেত্রী পদে অনেকবার মস্কো ও সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্যান্য এলাকা সফর করেছিলেন. ১৯৬৪ সালে তাঁকে আন্তর্জাতিক লেনিন শান্তি পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছিল, সোভিয়েত আমলে যা ছিল বিদেশী নাগরিকদের জন্য সবচেয়ে সম্মানজনক খেতাব. বিভিন্ন পুরস্কারের সূত্রে অর্জিত সব অর্থ অরুনা আসফ আলি দান করতেন তার দাতব্য তহবিলে ও ছাত্র বৃত্তিদানের পেছনে. এই অসাধারণ মহানুভবী ও বিদগ্ধা মহিলা জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৯০৯ সালের ১৬ই জুন, পরলোকগমনও তিনি করেছিলেন জুলাই মাসেই – ১৯৯৬ সালের ২৯শে জুন. রুশী বিজ্ঞান অ্যাকাডেমির অন্তর্ভুক্ত প্রাচ্যবিদ্যা ইনস্টিটিউট প্রকাশিত সংকলনে একটি বড় জায়গা জুড়ে লেখা আছে অরুনা আসফ আলিকে নিয়ে. প্রবন্ধটি লিখেছিলেন সুপ্রসিদ্ধা ভারত ও পাকিস্তান তত্ত্ববিদ ল্যুদমিলা ভাসিলিয়েভা, যাকে অরুনা আসফ আলি আদর করে ডাকতেন –‘মেরি রুসি বেটি’.

      ১৯৪৩ সালের ১৭ই জুলাই শুরু হয়েছিল মস্কো থেকে বাংলা ভাষায় বেতার সম্প্রচারণ. যুদ্ধক্ষেত্র থেকে আসা প্রথম সংবাদগুলি পরিবেশন করেছিলেন ভাষ্যকার প্রমথ দত্ত. শীঘ্রই তার স্থলাভিষিক্ত হয়েছিলেন যে ব্যক্তি, বেতারে তিনি তার পরিচয় দিতেন ‘জ্যাক লিটন’ বলে. তার আসল নাম ছিল – খগেন্দ্র লাল দত্ত. আমরা আজ কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করছি যুদ্ধ পরবর্তীকালে বিভিন্ন সময়ে বাংলা ভাষায় আমাদের ভাষ্যকারদের নামঃ বিনয় রায়, মীরা দাশগুপ্ত, গোপেন চক্রবর্তী, প্রভাস বসু, রঞ্জিত বসু, সুনীল দাশগুপ্ত. ২০০৯ সালের ২৯শে মার্চ থেকে ‘রেডিও রাশিয়া’ বাংলায় পুরোপুরি ইন্টারনেট সাইটের মাধ্যমে সম্প্রচারে চলে গেছে. এখন বাংলা সাইট পরিচালনা করেন রথীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়, সুমিত সেনগুপ্ত, কৌশিক দাস, জামিল খান ও ল্যুদমিলা পাতাকি.

     আমাদের দেশের সাথে নেপালের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের ৫৭ বছর কাটতে চললো. ঘটনাটি ঘটেছিল ১৯৫৬ সালের ২০শে জুন. তবে তার অনেক আগে থেকেই রাশিয়া ও নেপালের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপন করার প্রচেষ্টা শুরু হয়েছিল. যিনি এই ব্যাপারে সর্বপ্রথম সাফল্য লাভ করেছিলেন, তিনি ছিলেন সুবিদিত রুশী প্রাচ্যবিদ, পিটার্সবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইভান মিনায়েভ. উনবিংশ শতকের শেষদিকে তিনি কাঠমান্ডু গিয়েছিলেন. সেখানে তিনি সংগ্রহ করেছিলেন নেপালের ভূগোল, ইতিহাস, কৃষ্টি, সাহিত্য, নৃতত্ত্ব, কথ্য ভাষাগুলি নিয়ে বহু তথ্য ও পরে সেগুলি ছাপিয়েছিলেন.

    স্বাধীনতা অর্জন করার পরে ভারতের সামরিক নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর বহু জওয়ান রাশিয়ায় এসে প্রশিক্ষণ নিয়ে গেছেন. শতাধিক বছর আগে এরকমই স্বপ্ন ছিল প্রবাদপ্রতীম ভারতীয় স্বাধীনতাসংগ্রামী বাল গঙ্গাধর তিলকের. ১৯০৫ সালে এই ব্যাপারে তিনি বোম্বাইস্থিত আমাদের কনস্যুলার দফতরের সঙ্গে কথাবার্তাও বলেছিলেন. কিন্তু ইংরেজদের সাথে সম্পর্ক খারাপ করার ভয়ে আমাদের কূটনীতিজ্ঞরা তখন পিছিয়ে গেছিলেন. যদিও এক ভারতীয়, মাধবরাওকে সুইজারল্যান্ডে সামরিক শিক্ষালাভের ব্যাপারে সাহায্য করা হয়েছিল. এখনো তিলকের লেখা ‘বেদের সুমেরুস্থিত মাতৃভূমি’ আগ্রহের সঞ্চার করে, যেখানে তিনি প্রমাণ করতে চেয়েছেন, যে আর্যদের আদিনিবাস ছিল অধুনাতন রাশিয়ার ভূখন্ডে. বাল গঙ্গাধর তিলক জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৮৫৬ সালের ২৩শে জুলাই.