আজ তিরিশে জুন রবিবারে এক সপ্তাহ হতে চলল, যখন থেকে মস্কোর শেরেমেতিয়েভো বিমান বন্দরের ট্রানজিট এলাকায় বসতি করে রয়েছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিআইএ ও জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থার কর্মী এডওয়ার্ড স্নোডেন. সংবাদ মাধ্যমে আমেরিকার পক্ষ থেকে বিশ্বজোড়া গুপ্তচর বৃত্তির খবর ফাঁস করে দেওয়ার পরে সে হংকংয়ে পালিয়ে ছিল, তার পরে ২৩শে জুন উড়ে এসেছে মস্কোয়. আর এখন, আইন সঙ্গত ভাবে নিরপেক্ষ এলাকায় থেকে, সে অপেক্ষায় রয়েছে ইকোয়েডর দেশে রাজনৈতিক আশ্রয় সংক্রান্ত প্রশ্নের সমাধানের জন্য. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাকে বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগে অভিযুক্ত করেছে এবং রাষ্ট্রের গোপন বিষয়ে “ফাঁস করে দেওয়ার” জন্যেও. নিজের দেশে তার জন্য অপেক্ষা করে রয়েছে এমনকি মৃত্যুদণ্ডের মতো শাস্তিও.

“স্নোডেনের এই দুঃসাহসিক ও দীর্ঘ অভিযান” প্রায় প্রত্যেক দিনই নতুন বিশদ বর্ণনা দিয়ে ভরে উঠছে. শেষের গুলির মধ্যে স্নোডেনের বাবা - লোন্নির ইন্টারভিউ – এনবিসি ও ফক্স নিউজ টেলিভিশন চ্যানেলে. সেখানে সিনিয়র স্নোডেন ঘোষণা করেছেন যে, তাঁর পুত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে আসতে পারে, যদি তাকে বিচারের আগে গ্রেপ্তার করা না হয়, আর বিচার হয় প্রকাশ্যে. একই সঙ্গে তিনি বলেছেন যে, অত্যন্ত প্রয়োজন না হলে, তাঁর পুত্র এই ধরনের অন্তিম পদক্ষেপ নিতে যেত না.

ইকোয়েডর রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি রাফায়েল কোর্রেয়া ঘোষণা করেছেন যে, রাজনৈতিক আশ্রয় চাওয়ার প্রক্রিয়াতে ইকোয়েডর রাষ্ট্রের এলাকায় থাকা বাধ্যতামূলক. কোর্রেয়া উল্লেখ করেছেন যে, তাঁর দেশ “মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কথায় কান দেবে”, কিন্তু শেষ সিদ্ধান্ত নিজেরাই স্থির করবে. কোর্রেয়া জানিয়েছেন যে, তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে উপরাষ্ট্রপতি জো বাইডেনের সঙ্গে কথা বলেছেন, যিনি অনুরোধ করেছেন যে, স্নোডেনকে যেন আশ্রয় দেওয়া না হয়. তারই মধ্যে ইকোয়েডর রাষ্ট্রের সরকার সেই সুরক্ষা পত্র বাতিল বলে ঘোষণা করেছে, যা স্নোডেনের নামে দেওয়া হয়েছিল. রাষ্ট্রপতি কোর্রেয়া ঘোষণা করেছেন যে, লন্ডনের ইকোয়েডর রাষ্ট্রের কনস্যুল ফীদেল নার্ভায়েস, যিনি এই দলিল দিয়েছেন, তিনি নিজের ক্ষমতার বেশী দায়িত্ব নিয়েছেন ও তাঁর শাস্তি প্রাপ্য. তিনি বিশেষ করে উল্লেখ করেছেন যে, নার্ভায়েস, ইকোয়েডরের প্রশাসনের জানার বাইরেই এই কাজ করেছে.

এখানে বলা দরকার যে, স্নোডেনের রাশিয়ার বিমান বন্দরে “আটকে থাকা” দেশের সরকারকে খুব একটা খুশী করছে না. রাশিয়ার রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিন ২৫শে জুন সাংবাদিক সম্মেলনে বলেছেন যে, রাশিয়া স্নোডেনকে ধরিয়ে দিতে যাচ্ছে না. কিন্তু বুঝতে দিয়েছেন যে, শেরেমেতিয়েভো এলাকায় এই থেকে যাওয়াটা বেশী দিন চলতে পারে না. তিনি বলেছেন:

“যে কোন ভাবেই হোক, আমি নিজে এই ধরনের সমস্যা নিয়ে কোন কিছু করতে চাই না. তাই মার্কিন এফবিআই সংস্থার ডিরেক্টর মিস্টার রবার্ট ম্যুল্লের ও রাশিয়ার এফএসবে সংস্থার ডিরেক্টর মিস্টার আলেকজান্ডার বোর্তনিকোভ এই সমস্যার সমাধান নিয়ে কাজ করে দেখতে পারেন. আশা করব যে, এটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের কাজের সম্পর্কে কোন রকম ভাবেই প্রভাব ফেলবে না. আর, আশা করবো যে, আমাদের সহকর্মীরা এটা বুঝতে পারবেন. মিস্টার স্নোডেন স্বাধীন ব্যক্তি, আর যত দ্রুত তিনি নিজের শেষ গন্তব্য বেছে নেবেন ও ততটাই আমাদের জন্য এবং তার জন্যও ভাল হবে”.

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামা, নিজের পক্ষ থেকে ঘোষণা করেছেন যে, স্নোডেনের কাজ, এমন কিছু নয়, যে তার থেকে বড় আন্তর্জাতিক কেলেঙ্কারি তৈরী করতে হবে. তিনি বলেছেন:

“আমাদের চিনের সঙ্গে ও রাশিয়ার সঙ্গে অনেক কাজ রয়েছে. আর আমি এমন করতে চাই না যে, এক পলাতক ব্যক্তি, যাকে আমাদের কাছে পাঠিয়ে যাওয়ার আমরা দাবী করেছি, তার জন্যে আমাকে লেনদেন করতে বসতে হবে, কোন চুক্তি করতে হবে অন্যান্য বহু সমস্ত প্রশ্ন নিয়ে. আর এই সব করতে হবে শুধু সেই জন্যেই যে, একজন যুবককে দেশ থেকে বের করিয়ে দেওয়ার জন্যে ও তাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অভিযোগের দায়ভার বওয়ানোর জন্যে”.

পররাষ্ট্র দপ্তরের সরকারি মুখপাত্র প্যাট্রিক ভেনট্রেল্ল বলেছেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রত্যেক দিনই রাশিয়ার সঙ্গে বর্তমানে হওয়া পরিস্থিতি নিয়ে দেশের আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার মাধ্যমে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে. প্রসঙ্গতঃ, ৩- ৪ঠা জুলাই রাশিয়াতে আসছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী জ্যানেট নিওপলিতানো, ভ্লাদিভস্তক শহরে নিরাপত্তা সংক্রান্ত সমস্যা নিয়ে বাত্সরিক সম্মেলনে যোগ দিতে. সম্ভবতঃ, তিনি সেখানে অন্য সব বিষয়ের মধ্যে স্নোডেনের প্রশ্ন নিয়েও আলোচনা করবেন, তাঁর রুশ সহকর্মীদের সাথে.

কিন্তু স্নোডেনের ইতিহাসে সবচেয়ে উল্লেখ করার মতো হল যে, কেউই ঠিক করে জানে না যে, সে ঠিক কোথায় রয়েছে. সে দুবার মস্কো – হাভানা ফ্লাইটে সীট বুকিং করেছে অথচ দুবারই সেই সীট খালি ছিল ও বিমান তাকে ছাড়াই হাভানা উড়ে গিয়েছে. বলা হয় যে, সে শেরেমেতিয়েভো বিমান বন্দরের আন্তর্জাতিক ট্রানজিট এলাকার “ক্যাপস্যুল বিভাগে” ঘর নিয়ে রাত কাটাচ্ছে. কিন্তু সেখান থেকেও সে ভ্যানিশ হয়ে যাচ্ছে যেন হাওয়াতেই মিলিয়ে গেছে.

বলা যেতে পারে যে, সারা বিমান বন্দরে ছেয়ে থাকা সাংবাদিকরা সমস্ত টিকিট রেজিস্ট্রেশন করার জায়গাতেই স্নোডেনকে দেখার জন্য অপেক্ষায় রয়েছে, সমস্ত হল ও হোটেল তন্নতন্ন করে খুঁজে ফেলেছে, কিন্তু আপাততঃ অপেক্ষায় কোন লাভ হয় নি. আর এই প্রসঙ্গেই অনিচ্ছা স্বত্ত্বেও একটা প্রশ্নের উদয় হয় – ঠিক জায়গাতেই স্নোডেনকে খোঁজা হচ্ছে তো?