0বিগত সপ্তাহে রাশিয়ার রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিন আন্তর্জাতিক পারমানবিক শক্তি নিয়ন্ত্রণ সংস্থার প্রধান ইউকিও আমানোর সঙ্গে দেখা করেছেন. এই সংস্থার সঙ্গে রাশিয়ার সহযোগিতার ভবিষ্যত নিয়ে আলোচনা করেছেন, আর তারই সঙ্গে তথাকথিত সমস্যা সঙ্কুল দেশ গুলির পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা হয়েছে, যাদের পারমানবিক পরিকল্পনা বিশ্বে উদ্বেগের কারণ হয়েছে. ২৭-২৮শে জুন সেন্ট পিটার্সবার্গে হয়েছে “একবিংশ শতকে পারমানবিক শক্তি” নামের এক উচ্চ পর্যায়ের আন্তর্জাতিক সম্মেলন, যেখানে সংস্থার ডিরেক্টর, ৮০টি দেশের বিজ্ঞানী, বিশারদ ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের উচ্চ পদস্থ সরকারি কর্মীরা অংশ নিয়েছেন. প্রধান প্রশ্ন, যা এখানে অংশগ্রহণকারীরা আলোচনা করেছেন, তা হল সেই ঐতিহ্য অনুযায়ী প্রশ্ন যে, পারমানবিক শক্তি প্রযুক্তি – এটা আরামদায়ক ও সঞ্চয়ী জীবনের পথ, নাকি বিশ্বের নিরাপত্তার হুমকি? জানাই আছে যে, এই বিষয়ে এখনও একমাত্র অর্থবহ কোন উত্তর দেওয়া সম্ভব হয় নি.

রাশিয়া আগামী বছর গুলিতে নিরাপদ ও সর্বাধুনিক রিয়্যাক্টর ব্যবহার করে পারমানবিক বিদ্যুত শক্তি উত্পাদন বৃদ্ধি করতে চলেছে. এই বিষয়ে মস্কো শহরে রাশিয়ার রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিন ঘোষণা করেছেন আন্তর্জাতিক পারমানবিক শক্তি নিয়ন্ত্রণ সংস্থার প্রধান ইউকিও আমানোর সঙ্গে আলোচনার সময়ে.

আলোচনার সময়ে ভ্লাদিমির পুতিন ইউকিও আমানোকে তাঁর এই সংস্থায় নেতৃত্ব দানের সময়ে বিশেষ সাফল্যের জন্য এবং দ্বিতীয়বার নির্বাচিত হওয়ার জন্যও অভিনন্দন জানিয়েছেন. তিনি সংস্থার সঙ্গে রাশিয়ার গঠন মূলক কাজের সম্পর্কের কথা বিশেষ করে উল্লেখ করে মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, রাশিয়া এই সংস্থার সঙ্গে এর সৃষ্টি হওয়ার সময় অর্থাত্ ১৯৫৭ সাল থেকেই রয়েছে. রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করেছেন যে, আন্তর্জাতিক পারমানবিক শক্তি নিয়ন্ত্রণ সংস্থা পারমানবিক শক্তি প্রযুক্তি ক্ষেত্রের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে খুবই গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা এবং ইউকিও আমানোকে দেশের পারমানবিক প্রযুক্তি ক্ষেত্রে বিকাশের পরিকল্পনা সম্বন্ধে জানিয়েছেন. এই প্রসঙ্গে পুতিন বলেছেন:

“আমরা আসন্ন বছর গুলিতে পারমানবিক ভাবে শক্তি উত্পাদন বৃদ্ধি করতে চলেছি, প্রসঙ্গতঃ সবচেয়ে আধুনিক ও নিরাপদ প্রযুক্তি ব্যবহার করেই, আমি বলতে চাই ভেভেএএর রিয়্যাক্টরের কথা, যা আপনি নিজেই জানেন. এই সবই আমরা সেই প্রযুক্তি ব্যবহার করে করছি, যা আমরা বলে থাকি ফুকুসিমা পরবর্তী বলে, যেখানে পারমানবিক শক্তির সবচেয়ে বেশী নিরাপদ ব্যবহারের ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়েছে. আমরা খুবই আশা করবো আমাদের সহযোগিতা চালু থাকা নিয়ে ও তৈরী রয়েছি আপনার নেতৃত্বে আসন্ন চার বছরে এই প্রতিনিধিত্ব মূলক ও সম্মানীয় আন্তর্জাতিক সংস্থার কাজে নিজেদের অবদান রাখার”.

ইউকিও আমানো নিজের তরফ থেকে মন্তব্য করেছেন যে, রাশিয়া – সংস্থার একটি মুখ্য সহকর্মী দেশ. তিনি ঘোষণা করেছেন যে, সেন্ট পিটার্সবার্গের সম্মেলনে খুবই ভাল সম্ভাবনা তৈরী হবে পারমানবিক শক্তির বিকাশের ভবিষ্যত ও ব্যবস্থা নিয়ে, যা এর উন্নয়নের জন্য ও নিরাপত্তা রক্ষার জন্য প্রয়োজন. তিনি এই সূত্রে বলেছেন:

“আমি মনে করি যে, সেন্ট পিটার্সবার্গের আন্তর্জাতিক সম্মেলন খুবই সময়মতো হতে চলেছে, কারণ “ফুকুসিমা- ১” পারমানবিক বিদ্যুত কেন্দ্রের বিপর্যয়ের ঘটনার পরে দুই বছরের বেশী সময় কেটে গিয়েছে. তার ওপরে আমরা স্বীকার করি যে, আপনাদের দেশ পারমানবিক প্রযুক্তির বিকাশের ক্ষেত্রে নেতৃস্থানীয় ভূমিকা নিয়ে থাকে”.

ক্রেমলিনের উত্স থেকে পাওয়া খবর অনুযায়ী ভ্লাদিমির পুতিন ও ইউকিও আমানো শুধু রাশিয়ার সঙ্গে আন্তর্জাতিক পারমানবিক শক্তি সংস্থার সহযোগিতার কথা নিয়েই আলোচনা করেন নি, বরং তাঁরা আরও আলোচনা করেছেন সেই সমস্ত সমস্যা নিয়েও, যা গণহত্যার অস্ত্র প্রসার রোধের ক্ষেত্রে হয়েছে. সবচেয়ে বেদনা দায়ক বিন্দু এই ক্ষেত্রে হয়েছে - উত্তর কোরিয়া ও ইরানের পারমানবিক পরিকল্পনার সমস্যা, যা পশ্চিমের দেশ গুলিকে উদ্বিগ্ন করেছে ও আন্তর্জাতিক পারমানবিক শক্তি নিয়ন্ত্রণ সংস্থাকেও করেছে.

মস্কো সফরের আগে ইউকিও আমানো ঘোষণা করেছেন যে, তাঁর সংস্থা ইরানে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রতি আগ্রহ নিয়ে লক্ষ্য করেছে. তিনি আশ্বাস দিয়েছেন যে, সংস্থা এই দেশের সঙ্গে গঠন মূলক আলোচনার জন্য প্রস্তুত ও নির্দিষ্ট ফল অর্জনের দিকে লক্ষ্য স্থির করেছে. প্রসঙ্গতঃ, ইরানের পারমানবিক সক্রিয়তার উপরে সংস্থার পক্ষ থেকে ফলপ্রসূ নিয়ন্ত্রণ থাকা উচিত্ হবে, যাতে তার শান্তিপূর্ণ চরিত্র সম্বন্ধে নিঃসন্দেহ হওয়া যায়. আর “পারমানবিক সংস্থার পক্ষ থেকে ইরানের প্রতি সম্পর্ক আগের রাষ্ট্রপতির সময়ের মতই থাকবে”.

প্রসঙ্গতঃ, আগামী সোমবারে রাষ্ট্রপতি পুতিন ঐস্লামিক প্রজাতন্ত্র ইরানের বিদায়ী রাষ্ট্রপতি আহমাদিনিজাদের সঙ্গে দেখা করবেন, যিনি গ্যাস রপ্তানীকারক দেশ গুলির শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নিতে আসছেন. আশা করা হয়েছে যে, তাঁরা দুই দেশের সম্পর্কের সমস্ত অংশ নিয়েই আলোচনা করবেন, এই কথা মনে করে যে, খুব শীঘ্রই ক্ষমতা নতুন রাষ্ট্রপতির হাতে তুলে দেওয়া হবে. তার মধ্যে পারমানবিক বিষয়ও থাকছে.

উত্তর কোরিয়া সম্বন্ধে যা বলা যেতে পারে, তা হল যে, আন্তর্জাতিক পারমানবিক শক্তি নিয়ন্ত্রণ সংস্থার সদস্য দেশ গুলি কাজ করছে এই দেশকে আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসার জন্য, যদিও এই সহকর্মী দেশটি মোটেও সহজ নয়. মস্কোর ইরান ও উত্তর কোরিয়ার পারমানবিক পরিকল্পনা নিয়ে অবস্থান খুব ভাল করেই জানা রয়েছে. সেই নীতি অনুযায়ী নতুন করে পারমানবিক অস্ত্র আছে এমন দেশের উদয় হওয়াকে সমর্থন করা হয় না. কিন্তু স্বীকার করে যে, প্রত্যেক সার্বভৌম দেশেরই অধিকার রয়েছে নিজেদের দেশে শান্তি পূর্ণ কারণে পারমানবিক শক্তি বিকাশের.

সেন্ট পিটার্সবার্গের ফোরামে সংস্থার প্রধান ইতিমধ্যেই ঘোষণা করেছেন যে, সংস্থার পারমানবিক পদার্থের উপরে নিয়ন্ত্রণ করার মতো যথেষ্ট রকমের ক্ষমতা রয়েছে. তাঁর কথামতো, সেই সমস্ত দেশ, যাদের এই মৃত্যুবাহী অস্ত্র নেই, তাঁরা অস্ত্র প্রসার রোধের চুক্তি ও আন্তর্জাতিক পারমানবিক শক্তি নিয়ন্ত্রণ সংস্থার পক্ষ থেকে গ্যারান্টি সহ সমঝোতা পত্রে স্বাক্ষর করেছে. এই দলিল অনুযায়ী, সেই সব দেশ, যারা এতে স্বাক্ষর করেছে, তারা নিয়মিত ভাবে সংস্থার কাছে নিজেদের কাজের হিসাব দিতে বাধ্য আর নতুন পদার্থ ও তাই নিয়ে নতুন যে কোন কাজের জায়গা সম্বন্ধে খবর দিতে বাধ্য. সংস্থা নিজেদের পর্যবেক্ষকদের এই সব কাজের জায়গায় পাঠায়, যাতে তাঁরা নিজেরা দেখে নিতে পারেন যে, একমাত্র শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্য নিয়েই এই সব জায়গা ব্যবহার করা হচ্ছে, বলে উল্লেখ করেছেন আমানো.

নিরাপত্তা নামক শব্দটিই এই ফোরামে অংশ নেওয়া সবার জন্যই মুখ্য শব্দে পরিণত হয়ে ছিল. আর চেরনোবিল এবং “ফুকুসিমা – ১” পারমানবিক বিদ্যুত কেন্দ্রে বিপর্যয়ের পরে এটা আশ্চর্য কিছু নয়. প্রসঙ্গতঃ এই নিয়ে কাজকর্ম মোটেও ততটাই নাটকীয় নয়, যা প্রাথমিক দৃষ্টি পাতের পরে মনে হতে পারে. পারমানবিক জ্বালানী শক্তি শিল্প তার সমস্ত রকমের সম্ভাব্য ঝুঁকি থাকা স্বত্ত্বেও এখনও সবচেয়ে সম্ভাবনাময় ও পরিবেশ বান্ধব শক্তি উত্পাদনের ব্যবস্থা হয়ে রয়েছে, এই কথা উল্লেখ করে রাশিয়ার রসঅ্যাটম সংস্থার প্রধান সের্গেই কিরিয়েঙ্কো বলেছেন:

“পারমানবিক শক্তি ক্ষেত্র আমাদের বিশ্বে পরিবেশ সংক্রান্ত সমস্যা সমাধানে খুবই উল্লেখ করার মতো অবদান রেখেছে. খুবই সহজ হিসাব, যা ফুকুসিমার পরে বিতর্ক শুরুর সময়ে করা হয়েছে, তা দেখিয়ে দিয়েছে যে, যদি পারমানবিক বিদ্যুত কেন্দ্র গুলি প্রতি বছরে বহুল প্রসারিত ভাবে সম্মিলিত কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্যাসের বাতাসে দূষণ কম করে দেয়. চলুন মনে করা যাক যে, সমস্ত পারমানবিক বিদ্যুত কেন্দ্র একই সঙ্গে বন্ধ হয়ে গিয়েছে. এর অর্থ হবে প্রতি বছরে ১৭০ হাজার কোটি টন কার্বন যৌগ দিয়ে বাতাসে দূষণ বেড়ে যাওয়া”.

সাধারণ গ্রাহকদের জন্য পারমানবিক শক্তি – এটা তুলনামূলক ভাবে সস্তা বিদ্যুত শক্তি. আর রাষ্ট্রের জন্য – অর্থনৈতিক উন্নতির ভিত্তি. উদাহরণ হিসাবে চিনে ফুকুসিমা -১ বিপর্যয়ের পরে শুধু এই ধরনের শক্তি ব্যবহারই কমের কথা হয় নি, বরং উল্টো, তারা চারটি নতুন রিয়্যাক্টর চালু করেছে আর গণ প্রজাতান্ত্রিক চীন আরও ১০টি নতুন ব্লক তৈরী করছে. সের্গেই কিরিয়েঙ্কো পারমানবিক শক্তির বিশ্বজোড়া সংজ্ঞা নিয়ে উল্লেখ করে বলেছেন:

“পারমানবিক শক্তি ছাড়া অদূর ভবিষ্যতে বিশ্বের স্থিতিশীল শক্তি সরবরাহ করা সম্ভব হবে না. এটা প্রাথমিক ভাবে, সেই সমস্ত দেশকেই স্পর্শ করে, যারা আজ সবচেয়ে দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নতির হার দেখাতে পারছে, কিন্তু এই ক্ষেত্রে তাদের জ্বালানী শক্তির ও অন্যান্য ধরনের শক্তির উত্স গুলির উপরে কম পৌঁছনোর ক্ষমতা রয়েছে. আজ স্পষ্টই দেখতে পাওয়া যাচ্ছে যে, পারমানবিক শক্তির মতো ভরসা যোগ্য শক্তির উত্স খুঁজে পাওয়া বহু দেশের জন্যই স্থিতিশীল উন্নতির জন্য মুখ্য শর্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে”.

এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, রাশিয়া সর্বাধুনিক পারমানবিক প্রযুক্তি সম্পন্ন দেশ গুলির মধ্যে বিশেষ জায়গা নিতে পেরেছে. রসঅ্যাটম সংস্থার কাজের হিসাবের মধ্যে রয়েছে – দেশের ভিতরে বড় মাপের কাজের বরাত ও সহযোগিতার বিষয় আর বিশ্বের নানা অঞ্চল থেকে আসা নানা ধরনের বরাত. বৈজ্ঞানিক ক্ষমতা, সমৃদ্ধ ঐতিহ্য, আর তারই সঙ্গে খুবই কড়া ধরনের নিরাপত্তার ব্যবস্থা ও শক্তি খরচ কমানোর উপায়, আমাদের বলতে সুবিধা করে দিচ্ছে যে, আগামী বছর গুলিতে রাশিয়ার এই কর্পোরেশন বিশ্ব অর্থনীতির এই পরিকল্পনা মূলক ক্ষেত্রে নেতৃস্থানীয় অবস্থানই নিতে চলেছে.