সিআইএ সংস্থার প্রাক্তন কর্মী এডওয়ার্ড স্নোডেনকে ঘিরে পরিস্থিতি আমাদের চোখের সামনেই একটা গুপ্তচর কেলেঙ্কারি থেকে একেবারে টেলিভিশনের লাইভ শোতে পরিণত হয়েছে, বলে লিখেছে রাশিয়ার সংবাদপত্র “ত্রুদ” (শ্রম).

একজন ব্যক্তি রয়েছেন, যিনি মস্কো উড়ে এসেছেন, কিন্তু রাশিয়ার সীমান্ত পার হন নি. তার ওপরে আবার একটা বিমানবন্দর রয়েছে, যার ভেতরের এলাকা খুবই সীমিত. আর আছে একেবারে একটা পুরো ভীড়ে ভর্তি সাংবাদিকের দল, যারা এই এলাকার একেবারে মাটি খুঁড়ে ফেলছে স্নোডেনকে দেখবে বলে, বিমানের টিকিট কিনছে আর এমনকি হাভানা অবধি উড়ে যাচ্ছে, কিন্তু পলাতকের কোন চিহ্ন খুঁজে পাচ্ছে না.

নানা রকমের ধারণা ও কল্পনা যথেষ্ট রয়েছে. কেউ বলছে যে, খবর ফাঁস করে দেওয়া স্নোডেন অনেকদিনই শুধু তার নিজের একা জানা কোন দিকে চলে গিয়েছে, আর সেই খবর জানে রাশিয়ার বিশেষ দায়িত্ব পূর্ণ দপ্তরই. আমেরিকার এক সেনেট সদস্য একেবারে স্পষ্ট দেখার মত করে মত বলেছেন: হতে পারে এই কুত্তীর বাচ্চা অনেকক্ষণ হল একটা আরাম দায়ক ক্যাবিনেটে বসে খুবই চালাক রুশ কর্নেলদের সঙ্গে সজীব আলোচনায় ব্যস্ত রয়েছে – আর যতক্ষণ না তার ভেতর অবধি ঝেড়ে সব খবর বার করে নিতে পারছে, ততক্ষণ মনে তো হয় না তাকে কোথাও যেতে দেবে.

এই রকমের একটা পরিস্থিতিতে রাশিয়ার উচ্চ নেতৃত্ব হাত উল্টো করে দিয়েছেন আর এই উদ্ভূত সমস্যার কারণ নিয়ে সমস্ত কিছু একেবারে ভেঙে দিচ্ছেন, - লেখা হয়েছে সংবাদপত্রে. আমেরিকার নেতৃত্ব স্পষ্টই নিজেদের ধৈর্য হারাচ্ছে, তারা উদ্বিগ্ন হচ্ছে আর চিনারা যেমন বলছে, এবারে নিজেদের মান সম্মান হারাচ্ছে. মহাসাগরের ওপার থেকে অস্পষ্ট সব বিড়বিড় করে বলা কথা শোনা যাচ্ছে আর খুবই খারাপ ভাবে গোপন করা হুমকি দেওয়া হচ্ছে, কখনও ইকোয়েডর দেশকে, কখনও চিনকে, আবার কখনও রাশিয়াকেও. কিন্তু বোধহয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বুদ্ধিমান লোকরা ইতিমধ্যেই কিছু একটা ব্যাপার সম্বন্ধে ধারণা করতে পেরেছেন.

এনবিসি টেলিভিশন চ্যানেলের সমীক্ষক উল্লেখ করেছেন, - “আমেরিকার প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্নোডেনকে ফেরত না পাওয়া খুবই সূক্ষ্ম সমস্ত কূটনৈতিক সম্পর্কের সুর কাটতে বাধ্য করেছে, আর সম্ভবতঃ, বিশ্বে আমেরিকার ইমেজের উপরেই একটা আঘাত হেনেছে”. এই চ্যানেলে নিজের মন্তব্য করার সময়ে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রফেসর রবার্ট জারভিস উল্লেখ করেছেন যে, সেই সমস্ত গোয়েন্দা গিরির প্রোগ্রাম গুলি, যেগুলির কথা স্নোডেন ফাঁস করে দিয়েছে, তা বিশ্বে বহু লোককেই একটা ভিত্তি দেয় আমেরিকা সম্বন্ধে একটা দুমুখো নীতির দেশ বলে ভাবতে, আর এই সারা বিশ্ব জুড়ে অপরাধী ধরার জন্য খানা তল্লাশী শুধু পরিস্থিতিকেই আরও কঠিন করেছে. “এটা একেবারেই ব্যবস্থা করে দিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কমে আসা ক্ষমতা সম্বন্ধে মানুষের ধারণা তৈরী করে দিতে”.

এই রকমের একটা পরিস্থিতিতে আমেরিকার ইগোকে বিশেষ ব্যথা দিয়েছে ভ্লাদিমির পুতিনের মন্তব্য, যিনি, নিজের হিংস্র আনন্দ আর গোপন করতে না পেরে স্নোডেন ও আসাঞ্জকে বলেছেন “মানবাধিকার রক্ষা কর্মী” বলে, যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে যাওয়া আর শুয়োরের লোম কাটা একই ব্যাপার: অনেক শব্দই শুধু, আর তার ফল একটুই. এই রকমের একটা বাক্য ব্যবহার করে পুতিন আমেরিকার লোকদের বহুদিন ধরে রাশিয়ার উপরে মানবাধিকার কর্মীদের উপরে দমন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের উত্তর দিয়েছেন. দেখা যাচ্ছে যে, যখন আমেরিকার কুটির থেকে ময়লা ফেলার জন্য বাইরে আনা হয়, তখন কুটিরের গৃহকর্তা খুবই সহজে নিজের ভদ্র আচরণ হারিয়ে ফেলেন...

এই সংবাদপত্র একই সঙ্গে রুশ গুপ্তচর সংস্থার এক ঐতিহাসিক নিকোলাই দোলগাপোলভের মন্তব্যও উল্লেখ করেছে:

স্নোডেনকে ঘিরে পরিস্থিতি এই ভাবে ঝুলে রয়েছে কেন? আমার মনে হয় যে, সে এখন আর তাড়াহুড়ো করছে না, কারণ সে এখন নিজেই পরিস্থিতির মালিক – স্থায়ী ভাবে থাকার জন্য দেশ নির্বাচন করছে. আর আজ কেউই, তার মধ্যে সেই আমেরিকার লোকরা, অথবা তারা, যারা তাকে আশ্রয় দেওয়ার জন্য ঠিক করেছে, জানে না, সে কোথায় উড়ে যেতে পারে. আর তার বেছে নেওয়ার মত জায়গাও রয়েছে. আর এটা, প্রসঙ্গতঃ, দেখিয়ে দিচ্ছে যে, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বিশ্বজোড়া পরিবর্তন এসেছে. আগে আমেরিকার লোকদের সকলেই খুব ভয় পেত – তাদের যে কোন ইঙ্গিত বা চেঁচামেচিকেই. কিন্তু এই সময়টা শেষ হয়েছে, এমন সব দেশ উদ্ভব হয়েছে, যেখানে স্নোডেন খুবই শান্ত ভাবে যেতে পারে. আর তা শুধু লাতিন আমেরিকাতেই নয়, বরং, যেমন আইসল্যান্ড, যারা সহজেই তাকে রাজনৈতিক আশ্রয় দিতে পারে. হতে পারে তাকে নিতে রাজী হবে এক গাদা লাতিন আমেরিকার দেশে. আমি এটাকে “চাভেস প্রভাব” বলতে পারি – নেতা আর নেই, কিন্তু এই মহাদেশে স্বাধীনতার হাওয়া রয়েই গিয়েছে.

সাংবাদিকরা যে, ট্রানজিট এলাকায় স্নোডেনকে খুঁজে পান নি, তাতে অবাক হওয়ার মতো কিছু নেই. এটা শুধু বলে দেয় যে, তারা নিজেদের কাজে পেশাদার হলেও, স্নোডেন সম্পূর্ণ অন্য বিষয়ে পেশাদার. তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, এখন সিআইএ সংস্থার পেশাদার লোকের সঙ্গে কিছু অপটু লোক খেলতে নেমেছে, আর তাই পেশাদারের জিতে যাওয়ার সমস্ত সুযোগই রয়েছে.

মনে করে দেখা যেতে পারে, কয়েকদিন আগে আমেরিকার দূতাবাসের এক কর্মীকে এক গাদা পরচুলা সমেত ধরে ফেলার পরে ইন্টারনেটে মন্তব্য যারা করেছিল, তারা কি পরিমানে বিষয়টা নিয়ে ব্যঙ্গ করেছিল. আর এটা সিআইএ সংস্থার সব সময়েই ঐতিহ্যের মধ্যেই ছিল, নানা রকমের পোষাক পাল্টানো, গোঁফ, দাড়ি, পরচুলা ব্যবহার করা, গাড়ীর ড্রাইভারের পাশে হাওয়া দিয়ে ফোলান পুতুল ব্যবহার করা যাত্রীর জায়গায় ইত্যাদি, সুতরাং এহ বাহ্য যে, স্নোডেন তার স্বাভাবিক চেহারা পাল্টে ফেলেছে ও তাকে পুরনো চেহারায় ধরার সম্ভাবনা নেই.

এখন শুধু মনে রাখতে হবে যে, এই ব্যক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সত্যই গুরুতর বিপদের কারণ – কারণ সে যতটা সংবাদ মাধ্যমে দিয়েছে, তার থেকে তার নিজের গোপন জায়গায় আরও অনেক তথ্য রয়েছে ফাঁস করে দেওয়ার জন্য. আর যদি তার সঙ্গে কিছু হয়ে যায়, তবে রয়েছে তার ভরসা করার মত লোকজন, যারা এই সব তথ্য তত্ক্ষণাত প্রকাশ করে দেবে. মনে করি না যে, যুক্তরাষ্ট্র এই রকমের কোন পরিণাম চায় – লিখেছেন নিকোলাই দোলগাপোলভ.