শুরু করছি আমাদের নিয়মিত পাক্ষিক অনুষ্ঠান - 'রাশিয়ার আদ্যোপান্ত'.

      এই অনুষ্ঠানে আমরা আপনাদেরই পাঠানো প্রশ্নাবলীর ভিত্তিতে গল্প করি রাশিয়ার অতীত ও বর্তমান সম্পর্কে.

      তাই ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, মরিশাসে আমাদের পাঠক ও শ্রোতাদের কাছে অনুরোধ - রাশিয়া সম্মন্ধে সারবত্তা সম্পন্ন যত খুশি প্রশ্ন পাঠান - আমাদের অনুষ্ঠানের শরিক হোন.

     আজ আমরা উত্তর দেব নিম্নোক্ত প্রশ্নগুলিরঃ

     ভারতের চন্ডীগড় থেকে দীপক কুমার জানতে চেয়েছেন - নিজের বই 'ভারতের প্রতিচ্ছবি'তে রুশী চিত্রকর সিমিওন চুইকোভ কি লিখেছিলেন?

     বিজয়ওয়াড়া থেকে মহম্মদ আকবর খান জানতে চেয়েছেন - রাশিয়ায় বেওয়ারিশ কুকুরদের সমস্যা কিভাবে মেটানো হয়?

     '"রাশিয়ার আদ্যোপান্ত' অনুষ্ঠানের একটি আসরে আপনারা একজন রুশী চিত্রকর সম্পর্কে জানিয়েছিলেন, যিনি ভারতবাসীদের সম্পর্কে বই লিখেছিলেন. আমার সেই শিল্পী ও ভারতবর্ষ সম্পর্কে তার বইয়ের নাম মনে নেই. আমি নিজে একজন চিত্রশিল্পী. আমার দেশের মানুষজন সম্পর্কে এক জন বিদেশী চিত্রশিল্পীর কি অনুভূতি, আমার সেটা জানতে খুব ইচ্ছা করে.

     বইটার নাম 'ভারতের প্রতিচ্ছবি' এবং তার লেখক সিমিওন চুইকোভ. আমরা সেই বইটি খুঁজে বার করেছি এবং জানাচ্ছি আপনাদের সেই বইয়ের সারবত্তা.

     সিমিওন চুইকোভ প্রথমবার ভারতে গিয়েছিলেন ছোট একটা সোভিয়েত শিল্পীদের প্রতিনিধিদলের সদস্য হয়ে ১৯৫২ সালে দিল্লি, মুম্বাই, কোলকাতায় ভিজ্যুয়াল আর্টের প্রদর্শনীতে. শুনুন তিনি তার প্রথম অনুভূতি কিভাবে প্রকাশ করেছেন - "যত দেখছি, মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছি, এত রঙের জৌলুস, এত ছায়ার বৈচিত্র্য! বহির্রুপ নিয়ে কি আর বলবো - শাড়ির ভাঁজেই এত বিন্যাস! ভারতীয় নারীরা আমাকে মনে পড়িয়ে দেয় পুরাকালীন ভাস্কর্য. তাদের দেহবিন্যাসে শাড়ি এতটাই মানানসই. এদের প্রত্যেককে আঁকার সাধ হয়".

     তার প্রথম ভারত সফরে সিমিওন চুইকোভের মনে গেঁথে গিয়েছিল আগ্রা থেকে জয়পুরের পথযাত্রা. প্রথমবার তারা থেমেছিলেন ছোট একটা চোখজুড়ানো গ্রামে. বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে গিয়ে সোভিয়েত শিল্পীরা যে যার পছন্দ মতো গ্রামটির দৃশ্য আঁকতে লাগলেন. সিমিওন চুইকোভকে ব্যতিব্যস্ত করছিল স্থানীয় গ্রামবাসীরা, বিশেষতঃ বাচ্চারা. চুইকোভের পিঠের পেছন থেকে এক গ্রাম্য মহিলার দেওয়া নির্দেশে ব্চ্চারা এমনভাবে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো, যে শিল্পীর দৃশ্যপটটাই হারিয়ে গেল. তিনি অনুরোধ করলেন, কিন্তু বাচ্চারা কিছু না বুঝে হেসে আরও সঙ্ঘবদ্ধ হল. আর যখন চুইকোভ বুড়ির দিকে ঘুরে তাকালেন, তখন সে ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নিলো, পরে বুড়ি জানতে পেরে, যে চুইকোভ ইংরেজ নয়, ক্ষমা প্রার্থনা করেছিল.

    এটা ঘটেছিল ১৯৫২ সালে - ভারতের স্বাধীনতাপ্রাপ্তির মাত্র ৫ বছর পরে. সুতরাং ইংরেজদের প্রতি ভারতবাসীর ঘৃণা তখনও তীব্র ছিল.

    দ্বিতীয় বার চুইকোভ ভারত ভ্রমণ করেছিলেন সাতজন সোভিয়েত শিল্পী দলের সদস্য হিসাবে. চুইকোভ সেবারে এঁকেছিলেন ভারতের সাধারণ মানুষদের ও রাস্তাঘাট. পুরনো দিল্লির অলিগলিতে বিচরন করার অভিভূতি শিল্পী বর্ণনা করেছেন এইভাবে – “মনমাতানো অনুভূতি. সবকিছুই আমার নজর কাড়ছে, আমার আঁকতে ইচ্ছা করছে”.

দিল্লিতে সোভিয়েত দূতাবাসে একটি সম্বর্ধনা অনুষ্ঠানে সিমিওন চুইকোভের পরিচয় হয়েছিল ‘টাইমস অফ ইন্ডিয়া’র এক জন সংবাদদাত্রীর সাথে, যার দায়িত্ব ছিল চুইকোভের ইন্টারভিউ নেওয়ার. চিত্রশিল্পী ইতিপূর্বে ভারতে আঁকা তার ছবিগুলির ফোটো ঐ সংবাদদাত্রীকে দেখান. খুব শীঘ্রই চুইকোভের প্রতিকৃতি সহ তার সম্পর্কে সংবাদপত্রে একটি প্রবন্ধ ছাপা হয় 'কুলির বংশীবাদন’ নাম দিয়ে. ঐ প্রবন্ধে তুলে ধরা হয়েছিল শিল্পীর আঁকা ঐ নামের ছবিটি. প্রবন্ধটির শিরোনাম ছিল – “সোভিয়েত শিল্পী আবিষ্কার করছেন ভারতকে”. বিস্মিত চুইকোভের প্রশ্নের উত্তরে সেই সংবাদদাত্রী বলেছিলেন – “এত দিন পাশ্চাত্যের শিল্পীরা ভারতের ঐতিহাসিক দ্রষ্টব্য স্থানের, মনমাতানো প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলীর ছবি এঁকেছেন. আপনিই প্রথম ভারতের মাটির কাছাকাছি জনমানবের ছবি আঁকছেন. সুতরাং আপনি তুলে ধরছেন অন্য ভারতবর্ষকে, ভারতের মা-মাটি-মানুষকে”.

বাস্তবিকই তাই. তার কয়েকটি ছবির নাম করলেই সেটা স্পষ্ট হবে – ‘গোলাপী পাগড়ি পরিহিত ছুতোর’, ‘মা ও মেয়ে’, ‘তরুন মুটে’, ‘ক্রীড়ারত উচ্ছ্বল মেয়েরা’, ‘ফুলবিক্রেতা ছোট্ট মেয়েটি’ ইত্যাদি.

প্রসঙ্গক্রমে জানাই, যে চুইকোভের আঁকা ‘মা ও মেয়ে’ এবং ‘ক্রীড়ারত উচ্ছ্বল মেয়েরা’ চেন্নাইয়ে সংগ্রহশালার শোভাবর্ধন করছে আর ভারতে আঁকা তার ছবিগুলি মস্কো ও পিটার্সবার্গ সহ প্রাক্তন সোভিয়েত রাজধানী শহরগুলির বড় বড় মিউজিয়ামে প্রদর্শন করা হয়.

শেষবার সিমিওন চুইকোভ ভারতে গিয়েছিলেন ১৯৬৮ সালে দিল্লি ও চেন্নাইয়ে তার ছবির প্রদর্শনী এবং জওহরলাল নেহরু পুরস্কার প্রাপ্তি উপলক্ষে. দিল্লিতে তার ছবির প্রদর্শনী হয়েছিল ললিতকলা অ্যাকাডেমিতে.

আমরা সংক্ষেপে জানালাম সিমিওন চুইকোভের লেখা ‘ভারতের প্রতিচ্ছবি' বইটির বৃত্তান্ত, যেখানে শিল্পী ১৯৫২, ১৯৫৭ ও ১৯৬৮ সালে তাঁর ভারত ভ্রমণের কাহিনী লিপিবদ্ধ করে রেখে গেছেন.

আমাদের পাক্ষিক অনুষ্ঠান 'রাশিয়ার আদ্যোপান্ত' শুনছেন আপনারা. এবার শিল্পের ইন্দ্রলোক ছেড়ে মাটির কাছাকাছি যাওয়া যাক. বিজয়ওয়াড়া থেকে মহম্মদ আকবর খান জানতে চেয়েছেন – রাশিয়ায় বেওয়ারিশ কুকুরের সমস্যার সমাধান কিভাবে করা হয় ?

সমস্যাটা গুরুতর. বিশ্ব জীবজন্তু সংরক্ষণ সংস্থার খতিয়ান অনুযায়ী, পৃথিবীতে জীবন্ত ৫০ কোটি কুকুরের মধ্যে ৭৫ শতাংশই বেওয়ারিশ.

আমার মনে পড়ে গত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ধ্বসে যাওয়ার পরে মস্কোর রাস্তাঘাটে, বিশেষতঃ ফাঁকা জায়গায় ও অলিগলিতে চলাচল করা বিপজ্জনক ছিল.

     হঠাত্ উদ্ভব হয়েছিল ঝাঁকে ঝাঁকে বেওয়ারিশ কুত্তার. মস্কোবাসীরা অবশ্যই তাদের অল্পবিস্তর খাবারদাবার দিত. কেউই কুত্তার দলকে পাশ কাটিয়ে যেত না এক টুকরো রুটি, চীজ বা মাংস ছুঁড়ে না দিয়ে. তবুও তাদের সংখ্যা হয়ে গেছিল বাড়াবাড়ি রকমের বেশি. মস্কোবাসীরা একে অপরকে জিজ্ঞাসা করতো – সোভিয়েত আমলে ছিল না, হঠাত্ এখন কোথা থেকে বেওয়ারিশ কুত্তাদের এত দৌরাত্মি! তবে সবাই বুঝতে পারতো, যে অন্যান্য এত সমস্যার মধ্যে কুকুরদের জন্য আর্থিক সংস্থান নেই.

    ইদানীং মস্কোর রাস্তাঘাটে বেওয়ারিশ কুকুর আর প্রায় নেই. তারা গেল কোথায় ?

    এই সমস্যা সমাধানের খাতে খরচা করার সংস্থান নগর কর্তৃপক্ষের আছে. বেওয়ারিশ কুত্তা এখনো আছে, তবে তাদের সংখ্যা আজকাল অনেক কম. কর্তৃপক্ষ তাদের পাকড়াও করে পশু চিকিত্সা করায়, যৌন ক্ষমতারহিত করে তারপর বিশেষ কুকুরশালায় আশ্রয় দেয়. তারপরে পশুশালার কর্মীরা তাদের জন্য মালিক খোঁজে. তারা কুকুরগুলির রঙীন ফোটো খবরের কাগজে, ইন্টারনেটে ছাপায় হৃদয় বিদারক আর্জি জানিয়ে – যেমন, “বুদ্ধিমান কুকুরটি খুঁজছে তার বন্ধু-মানুষকে”, “আদুরে কুকুরছানা দয়ালু মালিকের প্রতীক্ষায় আছে”, “এই কুকুরগুলির চোখের দিকে তাকিয়ে দেখুন! ওরা সবাই চায় সহৃদয়তা ও প্রয়োজনীয়তা অনুভব করতে” – ইত্যাদি.

    কুকুরশালায় খাওয়াদাওয়া, চিকিত্সা, যৌন শক্তিরহিত করানোর খরচা প্রচুর, আর তাই মস্কোবাসীদের, বিশেষতঃ সচ্ছল সংসারীদের উদারমন্যতার উপর নির্ভর করা হয়.

   ‘রাশিয়ার আদ্যোপান্ত’ অনুষ্ঠানটি এবারের মতো এখানেই শেষ করছি. আপনাদের কাছ থেকে রাশিয়া সম্পর্কে নতুন নতুন প্রশ্ন সম্বলিত চিঠিপত্রের অপেক্ষায় থাকবো আমরা. ইন্টারনেটে আমাদের ঠিকানা – letters a ruvr.ru