শুধু ভারতেই নয়, বরং সমগ্র দক্ষিণ এশিয়াতেই, মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব জন কেরির তিনদিন ব্যাপী সফর যত না উত্তর দিয়েছে, তার চেয়ে অনেক বেশী প্রশ্নই খালি রেখে গেল. তাহলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই এলাকার সঙ্গে নিজেদের সম্পর্ক ঠিক কি ভাবে দাঁড় করাতে চাইছে? এই প্রশ্ন বিশেষ রকমের সংজ্ঞা নিয়েই উপস্থিত হয়েছে, যখন প্রতিবেশী আফগানিস্তানে ক্ষমতার প্রশ্নে শূণ্যতা দৃষ্টিগোচর হচ্ছে. সেখানে ক্ষমতার প্রশ্নে শূণ্যতা আরও বেশী করেই সৃষ্টি হয়েছে শুধু পশ্চিমের জোটের সেনাদের আসন্ন সরে যাওয়ার জন্যই নয় আর সন্ত্রাসের উত্তরোতর বৃদ্ধির কারণেই নয়, যা সেই আফগানিস্তান থেকেই বার হয়ে আসছে, বরং আরও, যেমন সেই সিরিয়া থেকেও, যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের নিকটপ্রাচ্যের জোট সঙ্গীরা সক্রিয়ভাবে জঙ্গীদের অস্ত্র দিচ্ছে, আর সেই জঙ্গীরা আবার আল- কায়দা দলেরই লোক.

পাকিস্তানের সংবাদ মাধ্যম বিশেষ ঝোঁক দিয়েই সেই বিষয়কে উল্লেখ করেছে: যদিও প্রাথমিক ভাবে পরিকল্পনা করা হয়েছিল যে, এশিয়ার দেশ গুলিতে সফরের সময়ে কেরি ইসলামাবাদ যাবেন, তবুও শেষ মুহূর্তে এই সফর বাতিল বলে ঘোষণা করা হয়েছে. সরকারি ভাবে পররাষ্ট্র দপ্তর থেকে যা বলা হয়েছে, তাতে বলা হয়েছে রাষ্ট্র সচিব তাঁর সফর স্থগিত রেখেছেন “সিরিয়ার ঘটনাতে আচমকা মোড় ফেরার” কারণে. তার ওপরে, পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রতিনিধিরা নিজেদের পাকিস্তানের সহকর্মীদের শান্ত করতে চেষ্টা করেছেন: দেখেছেন তো পাকিস্তান ও আমেরিকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের আলোচ্য তালিকা এতই প্রসারিত যে, পররাষ্ট্র সচিব ভাল ভাবে প্রস্তুত হয়ে নিয়েই তবে সেখানে খুব শীঘ্রই যাবেন.

প্রসঙ্গতঃ পাকিস্তানের “ডন” পত্রিকার তথ্য অনুযায়ী, আসন্ন ভবিষ্যতে এই সফরের কোনও পরিকল্পনা নেই, তাই রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“একেবারেই স্পষ্ট দেখতে পাওয়া যাচ্ছে যে, ভারতের জন্যই কেরির পাকিস্তান যেতে না চাওয়া ব্যাপারটা করানো হয়েছে. সিরিয়া এখানে একেবারেই কোনও ভাবে নেই. প্রথমতঃ, সিরিয়ার প্রশ্নে ভারতের অবস্থান ততটাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান থেকে দূরে(সম্ভবতঃ, হতে পারে যে, একেবারে বেশী রকমেরই উল্টো), যতটা পাকিস্তানের. আর দ্বিতীয়তঃ, রাষ্ট্র সচিবের যাতায়াতের পথ থেকে স্পষ্ট দেখতে পাওয়া যাচ্ছে (কাতার-ভারত-সৌদী আরব-ইজরায়েল ও প্যালেস্টাইন) যে, সিরিয়ার বিষয়ই তাঁর আলোচনার মূল বিষয় ছিল, আর ভারতে সফর ব্যাপারটা অনেকটাই করা হয়েছে একটা ধোঁয়াশা দিয়ে ঢাকা দেওয়ার জন্য, যাতে আসল কারণকে লুকান সম্ভব হয়”.

বোঝাই যাচ্ছে যে, ভারতের নেতাদের নিজেদের পক্ষে আনা – রাষ্ট্রপতি ওবামার দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতিত্বের মেয়াদের একটি অন্যতম কাজ, যা তাঁর প্রথম চার বছর ধরে হোয়াইট হাউসে থাকার সময়ে, যতদিন পররাষ্ট্র সচিব ছিলেন হিলারি ক্লিন্টন, অনেকটাই নষ্ট হয়ে গিয়েছে, যা এত কষ্ট করে জুনিয়র জর্জ বুশ তৈরী করেছিলেন.

তাই যেমন, জন কেরি ও তাঁর ভারতের সহকর্মী সলমন খুরশিদ সমঝোতা করেছেন সক্রিয়ভাবে পারমানবিক জ্বালানী শক্তি বিষয়ে সহযোগিতা বৃদ্ধি করবেন. গত বছরে পারমানবিক বিদ্যুত কেন্দ্র কুদানকুলাম খোলা নিয়ে স্ক্যান্ডালের পরিপ্রেক্ষিতে এই ঘোষণা কম করে হলেও দ্ব্যর্থক হয়েছে: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যেন পরোক্ষ ভাবে স্বীকার করেছে যে, এই প্রতিবাদ (মনে করিয়ে দিই যে, যার জন্য অর্থ যোগান দেওয়া হয়েছিল বাইরের দেশের এনজিও মাধ্যমে, তার মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও ছিল) পরিবেশ সংরক্ষণ করা ব্যাপারকেই লক্ষ্য করে করা হয় নি, বরং করা হয়েছে প্রতিযোগীদের ঠেলে সরানোর জন্যই.

কিন্তু সব মিলিয়ে ভারতকে খুশী করার চেষ্টা ভাল করে করা হয় নি, এই রকমই মনে করেছেন বরিস ভলখোনস্কি. আর এখানে গুরুত্বপূর্ণ নয় যে, জন কেরি কি বলেছেন বা তাঁর আলোচনা সঙ্গীরা কি বলেছেন, বরং অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ হল তাঁরা কি ব্যাপার নিয়ে চুপ থেকেছেন, তাই ভলখোনস্কি বলেছেন:

““হিন্দু” পত্রিকা এমনকি বিষয়ের এক বিশাল তালিকা তৈরী করেছে, যা এবারে আলোচনা পরবর্তী সম্মিলিত সাংবাদিক সম্মেলনে উচ্চারণ করা হয় নি. সিরিয়ার বিষয় ছাড়াও, আফগানিস্তানের তালিবদের সঙ্গে দোহাতে বৈঠক, ইরানের “পারমানবিক দলিল” নিয়ে চুপ করেই পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয়েছে. রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য দেশ হিসাবে ভারতের পদাধিকারের ইচ্ছা নিয়েও কোনও সমর্থনের কথা মনে করিয়ে দেওয়া হয় নি.

আর এই ক্ষেত্রে আবার কেরি সব রকম ভাবেই উল্লেখ করতে চেয়েছেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ২০১৪ সালের পরে আফগানিস্তানের পরিস্থিতি ঠিক হওয়ার ব্যাপারে ভারতের উপরে ভরসা করে. আর এখানেই প্রশ্নের উদয় হয়, যা অনেক পর্যবেক্ষকই উল্লেখ করেছেন. যে, ভারত – তালিবানের এক সবচেয়ে বিরোধী দেশ. আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই আন্দোলনকেই সমানাধিকার সম্পন্ন অংশীদার হিসাবে আলোচনায় ডাকছে – তাহলে হতে পারে যে, এমনকি তাদেরকে মনে করছে বর্তমানের আফগানিস্তানের সরকারের চেয়েও বেশী গুরুত্বপূর্ণ বলেই”?

এই ভাবেই, দক্ষিণ এশিয়ার কোন না কোন দেশের বিরক্তির কারণ হতে পারে এমন প্রকাশ্যে ঘোষণা থেকে নিরস্ত হয়ে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কার্যক্ষেত্রে এই এলাকায় চাইছে দুটি নেতৃস্থানীয় দেশে – ভারত ও পাকিস্তানের বিরোধকে নিয়েই খেলতে, যার ভিত্তি সেই পুরনো ব্রিটিশ নীতি – “ভাগ করে দাও আর শাসন করো”.