১৮১২ সালের বসন্তে রাশিয়া বড় যুদ্ধের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল. ততদিনে প্রায় গোটা ইউরোপ জয় করা ফরাসী সম্রাট নেপোলিয়ন পূর্ণোদ্যমে রাশিয়া আক্রমণের তোড়জোর শুরু করেছিলেন আমাদের দেশের পশ্চিম সীমান্তে. রাশিয়া প্রতিরক্ষার আয়োজন করছিল. এই অশান্ত সময়ে জেনারেল আলেক্সান্দর তুচকোভের সাথে দেখা করতে এলেন তার অর্ধাঙ্গিনী মার্গারিতা. সুদীর্ঘ ও দুর্গম পথযাত্রায় ক্লান্ত হয়ে মার্গারিতার ঝিমুনি এসেছিল. ঘুমের ঘোরে তিনি প্রত্যক্ষ করলেন লিখন - "তোমার ভাগ্য নির্ধারিত হবে বরদিনোয়".  উজ্জ্বল লাল অক্ষরগুলি থেকে রক্ত ঝরে পড়ছিল. ভদ্রমহিলা আতঙ্কে তারস্বরে চিত্কার করে উঠলেন ও তার ঘুম ভেঙে গেল.

     সশঙ্কচিত্তে মার্গারিতা তুচকোভা তার উদ্বিগ্ন স্বামীর কাছে জিজ্ঞাসা করলেন - বরদিনো, কোথায় এই বরদিনো?  তোমাকে ওখানে মেরে ফেলবে.

     জেনারেল এই প্রথম এরকম জায়গার নাম শুনলেন. মার্গারিতা তার স্বপ্নে দেখা বৃত্তান্ত স্বামীকে জানালেন, তুচকোভ তাকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করলেনঃ "এটা দুঃস্বপ্ন মাত্র, বাস্তবে কোনো বরদিনোর অস্তিত্বই নেই. আর কেনই বা তিনি অজ্ঞাত কোনো বরদিনোয় মারা যাবেন, যখন লেখনীতে সে সম্পর্কে কোনো বিশেষ আভাষ নেই?"  খানিকটা স্থিতধী হয়ে ভদ্রমহিলা আবার ঢলে পড়লেন ঘুমে. কিন্তু দুঃস্বপ্নের পুনরাবৃত্তি হল - সেই একই লিখন, ঝরা রক্তের ফোঁটা. শুধু এবারে ম্যাডাম তুচকোভা লিখন ছাড়াও দেখলেন তার দুয়ারের সামনে উপবীত খ্রীশ্চান সাধুকে, তার বাবাকে এবং ভাই কিরিলকে. ভদ্রমহিলা এতটাই আতঙ্কে আবার জেগে উঠলেন, যে তার দয়িত তুচকোভ বাস্তবিকই ঘাবড়ে গিয়ে রাতবিরাতে সহকারীকে পাঠালেন সদর দফতরে রাশিয়ার বিষদ মানচিত্র আনার জন্য.

     জেনারেল তার স্ত্রীকে প্রশমিত করার চেষ্টা করলেন. বললেন - "সুরেলা নামটা শুনে মনে হচ্ছে, যে জায়গাটা ইতালির কোথাও হয়তো হবে. ইতালি অনেক দূর, ফরাসীদের সাথে ইতালিতে যুদ্ধ করার কোনো সম্ভাবনাই আমাদের নেই".

     কিন্তু ভদ্রমহিলা কিছুতেই ভুলতে পারলেন না তার দেখা স্বপ্ন. শীঘ্রই তিনি ফিরে গেলেন তাদের পারিবারিক জমিদারী এস্টেটে.

     জুন মাসে শুরু হল যুদ্ধ নেপোলিয়নের ফৌজের সাথে, ফরাসী বাহিনী ক্রমশঃ মস্কোর দিকে অগ্রসর হতে লাগলো. উদ্বেগে এবং হৃদয়ে আশার বাতি জ্বেলে মার্গারিতা তুচকোভা স্বামীর কাছ থেকে বার্তার প্রতীক্ষায় থাকতেন. সেপ্টেম্বরে চিঠি আসা বন্ধ হয়ে গেল, ভদ্রমহিলা ছটফট করতে লাগলেন. একদিন সকালে অকস্মাত্ তার শয়নকক্ষের দুয়ার খুলে গেলঃ চৌকাঠে দাঁড়িয়ে ছিলেন খ্রীশ্চান সাধু ও তার বাবা. মার্গারিতা অস্ফূটে জিজ্ঞাসা করলেন - কিরিল কোথায়?  সেই মুহুর্তে ভাই কিরিলও ঘরে প্রবেশ করলো. মস্কোর উপকন্ঠে নেহাত্ই ছোট্ট বরদিনো গ্রামে ফরাসীদের সাথে প্রলয়ংকর যুদ্ধে তার ভগ্নিপতির প্রাণহানির মর্মান্তিক দুঃসংবাদ নিয়ে এসেছে কিরিল যুদ্ধক্ষেত্র থেকে. স্বপ্ন বাস্তবের সাথে একেবারে মিলে গেল. হাজার হাজার রক্তাক্ত মৃতদেহের ভীড়ে মার্গারিতা তার স্বামীর মৃতদেহ আগাগোড়া খুঁজেছিলেন, কিন্তু বেকার.

     নেপোলিয়নকে রাশিয়া থেকে তাড়ানোর পরে মার্গারিতা কুচকোভা যুদ্ধক্ষেত্রে তার প্রিয়তম স্বামী সহ যুদ্ধে নিহত সমস্ত রুশী যৌধেয়দের স্মৃতিতে একটি গীর্জা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন যুদ্ধপ্রান্তরে. পরবর্তীকালে সেই মন্দির পরিণত হয় স্পাস-বরদিনো মঠে. মার্গারিতা সন্ন্যাস গ্রহণ করে, মস্তকমুন্ডন করে ঐ মঠের পরিচালিকার দায়িত্ব নিয়েছিলেন. তিনি ছিলেন দীর্ঘজীবি - স্বামীর মৃত্যুর ৪০ বছর পরে, ১৮৫২ সালে তার তিরোধান হয়েছিল. তার নির্মিত গীর্জাতেই মার্গারিতা তুচকোভাকে সমাধি দেওয়া হয়েছিল.

     স্পাস-বরদিনো মঠ আমাদের দিনেও বিরাজ করছে এবং সাধারণ মানুষ বরদিনোর নাম দিয়েছে -  'রুশী গৌরবের প্রান্তর'. ২০১২ সালের ২রা সেপ্টেম্বর এখানে স্মরণীয় যুদ্ধ জয়ের ২০০-তম বার্ষিকী উপলক্ষে বিশাল অনুষ্ঠানাদির আয়োজন করা হয়েছিল. ঘুমের ঘোরে দেখা মার্গারিতা তুচকোভার স্বপ্ন শুধু তার জন্যই নয়, সারা রাশিয়ার জন্য ছিল ভাগ্য নির্ধারক. ঐ যুদ্ধেই যে গোটা একটা জাতির ভাগ্য নির্ধারিত হয়েছিল!